সিডিএ’র শর্ত ভঙ্গ করে কোরাল রীফের বহুতল ভবন

চট্টগ্রাম ব্যুরো

সিডিএ’র শর্ত ভঙ্গ করে কোরাল রীফের বহুতল ভবন
ছবি: আমার দেশ

চট্টগ্রামে রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান কোরাল রীফ প্রপার্টিজের বিরুদ্ধে প্রতারণা, ক্ষতিপূরণ আত্মসাৎ, জাল-জালিয়াতির আশ্রয়সহ নানা অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) আইন ও নকশা তোয়াক্কা না করে ১৫ তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করে জমির মালিককে প্রাপ্য ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দিয়েই লাপত্তা হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, একই ফ্ল্যাট একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি, মালিকের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে ভুয়া চুক্তি তৈরি, কোটি কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ আত্মসাৎ এবং পাওনা চাওয়াতে মালিকপক্ষকে মারধর ও হত্যার হুমকি দেন ডেভলাপার কোম্পানি কোরাল রীফের মালিকরা। এসব ঘটনায় আদালতে পাল্টাপাল্টি মামলা করেন ভুক্তভোগী জমির মালিক ও ডেভলাপার প্রতিষ্ঠানটি। তবে ডেভলাপারের করা মামলায় কোনো ধরনের সততা না মিললেও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের অনুসন্ধানে অভিযোগের সততা পাওয়া গেছে জমির মালিকের করা মামলায়। আর পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনেই ফেঁসে যাচ্ছে কক্সবাজার ভিত্তিক রিয়েল স্টেট কোম্পানিটি।

জানা যায়, ২০১২ সালে নগরীর আগ্রাবাদের খান বাড়িতে ৩৮ শতক জমিতে একটি অত্যাধুনিক ভবন নির্মাণের লক্ষে জমির ৩০ জন ওয়ারিশের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন কোরাল রীফের পরিচালক কামরান দিদার ও মো. সাইফুল ইসলাম। চুক্তির শর্ত ছিল তিন বছরের মধ্যে নির্মাণ কাজ শেষ করে মালিকদের বুঝিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় পার হলেও মালিকরা তাদের ন্যায্য পাওনা বুঝে পাননি। সিডিএ থেকে ২০১৪ সালে ১৫ তলা ভবনের অনুমতি মিললেও ডেভেলপার কোম্পানিটি শুরু থেকেই নানা টালবাহানা শুরু করে।

বিজ্ঞাপন

চুক্তিতে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সেই হিসেবে জমির মালিকরা কয়েক কোটি টাকা পাওনা থাকলেও ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোরাল রীফ কোনো অর্থ পরিশোধ করেনি। উল্টো ২০২৩ সাল থেকে তারা মালিকদের স্বাক্ষর জাল করে নতুন নতুন সম্পূরক চুক্তি তৈরি করে প্রতারণার জাল বিস্তার করেছে। জমির মালিককে না জানিয়ে বিভিন্ন পক্ষের কাছে ফ্ল্যাট হস্তান্তর করতে থাকে ডেভলাপার প্রতিষ্ঠান। এ নিয়ে ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর আগ্রাবাদ ভূমি অফিসে জমির মালিক সামিউল খান, আসিফ খান, আমজাদ খান একটি আপত্তি জমা দেন। এতে ওই ভবনের নামজারি বন্ধ করে দেন আগ্রাবাদ সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি)। এসব ঘটনায় জমির মালিক সামিউল খান তিনজনের পক্ষে কোরাল রীফের বিরুদ্ধে চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রট আদালতে প্রতারণার মামলা করেন। এতে কোরালের পরিচালক সাইফুল ইসলাম, ইনচার্জ জামাল উদ্দিনসহ ১০ জনকে আসামি করা হয়।

মামলা সূত্রে জানা যায়, জমির মালিকরা যখন তাদের প্রাপ্য ফ্ল্যাট বুঝে নিতে চান, তখন তাদের কাছে উল্টো দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয় এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের জুনে এক বৈঠকে জমির মালিক সামিউল খান ও তার বৃদ্ধ পিতাকে মারধর করা হয়। মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিএমপির ডিবি বন্দর-পশ্চিম বিভাগ।

তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মোহাম্মদ মহসীন উদ্দিন রুবেল প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, বাদি সামিউল খানের আনীত অভিযোগের সততা মিলেছে। অন্যদিকে কোরাল রীফ জমির মালিকদের বিবাদী করে মামলা করে। তদন্ত শেষে তার কোনো সততা পাওয়া যায়নি বলে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করে সিএমপির ডিবি বিভাগ।

ভুক্তভোগী জমির মালিক সামিউল খান জানান, এই প্রকল্পটি বর্তমানে এক চরম বিশৃঙ্খলার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আবাসিক ভবন করার কথা থাকলেও সেখানে হোটেল ও সুইটমিট হিসেবে প্ল্যান অনুমোদন করা হয়েছে যা সম্পূর্ণ বিধি বহির্ভূত। ভবনের পার্কিং এরিয়াতে নকশা ভেঙে আটটি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। ডিজিটাল সার্ভেতে দেখা গেছে, একেকটি ফ্ল্যাটের আকার একেক রকম করা হয়েছে যাতে করে গ্রাহক ও জমির মালিক উভয়কেই ঠকানো যায়। বর্তমানে ভবনটির প্রতিটি ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে জমির মালিক ও তৃতীয় পক্ষের ক্রেতাদের মধ্যে চরম দ্বন্দ্ব চলছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কোরাল রীফের প্রতারণার পরিধি কেবল চট্টগ্রামেই সীমাবদ্ধ নয়। পর্যটন নগরী কক্সবাজারেও প্রতিষ্ঠানটি আড়াই হাজার মানুষকে নিঃস্ব করেছে। কলাতলীতে পাঁচতারকা হোটেলের মালিক বানানোর চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে তারা। বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘ সময় পার হলেও কোনো মুনাফা বা আসল টাকা ফেরত না পেয়ে ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন পর্যন্ত করেছেন। যা ইতঃপূর্বে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশ পেয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানটি কার্যত লাপাত্তা। তাদের ঢাকাস্থ প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করেও কোনো সুরাহা মিলছে না। আগ্রাবাদে এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ফ্ল্যাট মালিকানা নিয়ে যে কোনো সময় বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

আরেক জমির মালিক সাকিল খান বলেন, কোরাল রীফ কেবল চুক্তির শর্তই ভঙ্গ করেনি, তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে জমির মালিকদের হয়রানি করতে মিথ্যা মামলাও দায়ের করেছিল। তবে তদন্তে জমির মালিকদের বিরুদ্ধে আনা কোনো অভিযোগের সত্যতা মেলেনি। উল্টো কোরাল রীফের পরিচালক কামরান দিদার ও সাইফুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও শারীরিক লাঞ্ছনার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়াও কক্সবাজারে হোটেল ওয়েস্টিনে মালিক হওয়ার কথা বলে আমার বাবার কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। প্রকৃতপক্ষে তারা কোনো মুনাফা দেওয়া দূরে থাক আসল নিয়েও গড়িমসি করছে। ওই প্রকেল্প আড়াই হাজার মানুষ পথে বসেছে কোরাল রীফের ফাঁদে পড়ে।

এ বিষয়ে কোরাল রীফের পরিচালক সাইফুল ইসলাম খান বলেন, এসব অভিযোগ সত্য নয়। আগ্রাবাদের প্রকল্পে একজনমাত্র মালিক অসৎ উদ্দেশ্যে আমাদের সাথে মীমাংসায় না এসে ঝামেলা সৃষ্টি করে। কক্সবাজারে আমাদের প্রকল্প চলমান। কোরাল রীফের বিরুদ্ধে পুলিশের তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, পুলিশ রিপোর্ট দিতে পারে। এগুলো পক্ষপাতমূলত।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন