মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় পদ্মা নদীর বুকে জেগে ওঠা বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলগুলোতে বসবাসকারী মানুষের জীবন যেন এক অন্তহীন সংগ্রামের নাম। নদীভাঙন, দারিদ্র্য, অবকাঠামোর অভাব এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করেই প্রতিদিন বেঁচে থাকতে হচ্ছে তাদের।
‘নদীর একুল ভাঙে, ওকুল গড়ে’ এই বহুল প্রচলিত প্রবাদটি এখানে কেবল কথার কথা নয়, বরং বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি। সর্বনাশা পদ্মার ভাঙনে ভিটেমাটি, বসতঘর, ফসলি জমি সব হারিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ে। তারপর বছরের পর বছর অপেক্ষা কবে আবার নদীর বুকে নতুন চর জেগে উঠবে, কবে গড়ে উঠবে নতুন বসতি। অনেকের এই অপেক্ষা ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ হয়। যখনই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটে এবং পদ্মার পাড়ে নতুন চর জেগে ওঠে, তখনই শুরু হয় আবার নতুন সংগ্রামের পর্ব।
অন্যদিকে জীবিকার প্রধান উৎস কৃষি ও মৎস্য হলেও প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় আয় অনিশ্চিত। বন্যা, খরা কিংবা আকস্মিক ভাঙনে মুহূর্তেই নিঃস্ব হয়ে পড়েন অনেক পরিবার। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগও প্রায় নেই বললেই চলে।
এই নতুন চরগুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থা চরম ভোগান্তির সৃষ্টি করেছে। অনেক এলাকায় নৌকাই একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। বর্ষাকালে প্রবল স্রোত এবং অনেক সময় নৌকার অভাবে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। রোগী পরিবহন, শিক্ষার্থীদের যাতায়াতসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজকর্ম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বিচ্ছিন্ন চরগুলোতে প্রতিবছর নৌকাডুবির ঘটনাও ঘটে, ফলে প্রাণহানির শঙ্কা সবসময় থাকে।
প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়। চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। ঘরবাড়ি ভেসে যায়, নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট দেখা দেয়। অনেকেই বাধ্য হয়ে অস্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে যান।
পদ্মা নদীর পাড়ে সারি সারি বাঁধা জেলেনৌকা, পানির ওপর আলতো করে ভেসে বেড়ানো গাঙচিল, জেলের জাল টেনে তোলার দৃশ্য পাড়ে দাঁড়িয়ে যতটা মুগ্ধকর মনে হয়, ঠিক ততটাই ভিন্ন চরে বসবাসরত মানুষের জীবন। মাথার ওপর প্রখর রোদ, রোদে পোড়া প্রান্তর কিংবা হঠাৎ ধেয়ে আসা কালবৈশাখী ঝড় সবই এখানে নিত্যসঙ্গী।
আবার কখনো বন্যায় চারপাশ ডুবে যায়, কখনো প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়, আবার তীব্র শীতে বইতে থাকে শীতল বাতাস। চরের বাস্তব চিত্র এমনই। আবহাওয়ার বৈরিতার মধ্যেই সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয়। পদ্মা নদীর বুকজুড়ে জেগে ওঠা এই বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলগুলো যেন বাংলাদেশের এক অদেখা বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এখানে প্রতিটি দিন শুরু হয় অনিশ্চয়তা ও সংগ্রামের গল্প নিয়ে, আর শেষ হয় টিকে থাকার লড়াইয়ে ক্লান্ত এক নিঃশ্বাসে। এখানে রাস্তাঘাট ও বিদ্যুৎ সুবিধার অভাব এবং রয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট।

মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার পদ্মা নদীর বুকে জেগে ওঠা নতুন চরের তিনটি ইউনিয়ন চরজানাজাত, কাঠালবাড়ি ও মাদবরের চর এর বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডের সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের গল্পও এমনই।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) পদ্মার চর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের চিত্র। চরাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকায় কোনো পাকা রাস্তা নেই। নদী পারাপারের জন্য নৌকাই একমাত্র ভরসা। ফলে অনেক সময় রোগী পরিবহন, শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাতায়াত এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজকর্ম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
কাঠালবাড়ি ইউনিয়নের লেদু চৌকিদারের কান্দি এলাকার রাজা মিয়া বলেন, আমাদের চরাঞ্চলের মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। অনেক এলাকায় নৌকাই একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। ফলে জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। চিকিৎসাসেবার অভাবে সাধারণ রোগও অনেক সময় মারাত্মক আকার ধারণ করে।
রাজা মিয়া আরো বলেন, চরাঞ্চলের অধিকাংশ শিশুই নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। বর্ষা মৌসুমে বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলে তাদের পড়াশোনা কার্যত থেমে যায়। এতে ঝরে পড়ার হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ে। প্রতি বছর বর্ষা এলেই আমাদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে। ঘরবাড়ি, গবাদিপশু ও ফসল রক্ষায় হিমশিম খেতে হয়। অনেক সময় নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে খোলা আকাশের নিচে বা অস্থায়ী ঘরে বসবাস করতে বাধ্য হই।

একই এলাকার আজিজ মিয়া বলেন, আমাদের কষ্ট দেখার কেউ নেই। রাস্তা নেই, পানি নেই, বিদ্যুৎ নেই এইভাবেই জীবন কাটাচ্ছি। এছাড়া নদীভাঙন ও বন্যার কারণে প্রতিবছরই নতুন করে বিপদের মুখে পড়তে হয়। প্রতিবছর ঘরবাড়ি হারিয়ে অনেকেই নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। তবুও জীবিকার তাগিদে এই চর ছেড়ে যেতে পারছেন না বেশিরভাগ মানুষ।
চরজানাজাত ইউনিয়নের সামাদ খাঁর কান্দি এলাকার বাসিন্দা কালাম বেপারী (৫৭) জানান, পদ্মার ভাঙনে ৫ থেকে ৭ বার তার বসতভিটা বিলীন হয়েছে। বর্তমানে তিনি সরকারি জমিতে বসবাস করছেন। জীবিকার তাগিদে মাছ ধরেন এবং অন্যের জমিতে চাষাবাদ করেন। একসময় নিজের ফসলি জমি থাকলেও এখন সবই নদীগর্ভে বিলীন। তিনি বলেন, আমরা যেন বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপে বাস করি। বিদ্যুৎ নেই, রাস্তা নেই, গাছপালা কম। গরমে ঘরে থাকা যায় না। পদ্মার ভাঙা-গড়া দেখতে দেখতে জীবন চলে যাচ্ছে। এখানে বেঁচে থাকাই এক ধরনের সংগ্রাম। আমাদের এখানে প্রায় দুই শতাধিক পরিবার বসবাস করছে, যাদের অধিকাংশই নদীভাঙনের শিকার হয়ে ভূমিহীন হয়েছে। মাছ ধরা, কৃষিকাজ ও পশুপালনই আমাদের প্রধান কাজ।
পদ্মার চরে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার চিত্রও অত্যন্ত নাজুক। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া অনিয়মিত হয়ে পড়ে। অনেক শিশু প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোতে পারে না। ছেলে শিশুরা অল্প বয়সেই জীবিকার তাগিদে জেলে হিসেবে নদীতে নেমে পড়ে। চরে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় সাধারণ রোগীদের ভোগান্তি অনেক সময় মারাত্মক হয়ে ওঠে।
এ সময় কলেজছাত্রী মিম আক্তার বলেন, চর থেকে শিবচর সদরে গিয়ে ক্লাস করা খুবই কঠিন। নিয়মিত যেতে পারি না। পরিবারে সামর্থ্য থাকলে এখানে থাকতাম না। এখানে রাস্তা, বিদ্যুৎ ও চিকিৎসাসেবা খুব জরুরি। প্রতি বছর বর্ষা এলেই আমাদের চরাঞ্চলের মানুষের দুশ্চিন্তা বাড়ে। বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়, ঘরবাড়ি ভেসে যায়, নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট দেখা দেয়।
পদ্মা নদীর মাঝের নতুন চরাঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বিষয়ে জানতে চাইলে কাঠালবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাইদ আহমেদ সৈয়দ বেপারী বলেন, পদ্মা নদীর ভাঙন আমাদের চরাঞ্চলের মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় দুর্ভোগ। প্রতিবছরই মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। চরাঞ্চলের মানুষদের আমরা স্থানীয়ভাবে কিছু সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। চরাঞ্চলের মানুষের জন্য টেকসই বাঁধ নির্মাণ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
তবে শিবচরের সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, পদ্মা নদীর মাঝে নতুন চরের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, টেকসই অবকাঠামো, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবার সম্প্রসারণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা জরুরি। অন্যথায় পদ্মার এই চরাঞ্চলের মানুষের দুর্দশা আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে। পদ্মার বুকে জেগে ওঠা এসব চর যেন বাংলাদেশের এক অদেখা বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে প্রতিটি দিন শুরু হয় অনিশ্চয়তায় আর শেষ হয় টিকে থাকার ক্লান্ত লড়াইয়ে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

