তখন সর্বত্র লাল পাগড়ি আর হাফ প্যান্ট পরা পাইক-পেয়াদার ব্রিটিশ শাসনামল। কোথাও নেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সে সময় থেকেই শিক্ষা বিস্তারে পিছিয়ে চলনবিল অধ্যুষিত প্রাচীন জনপদ পাবনার চাটমোহর উপজেলা। মুসলিম ছেলেরা মক্তবে আল কোরআন আর ছিপারা পড়ত।
সে সময়ে এলাকার শিশুদের মাঝে শিক্ষা বিস্তারের বাতিঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘শ্রীশচন্দ্র অ্যান্ড রঘুনাথ প্রাইমারি স্কুল’। চাটমোহরের হিন্দুবর্ধিষ্ণু সনাতন অভিজাত ‘বড়বাড়ি’র (বর্তমান জিরো পয়েন্ট) বাবুরা ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে চাটমোহর মৌজায় নিজস্ব ১৫ শতাংশ জমিতে টিনের ঘর তুলে শুরু করেন পাঠ কার্যক্রম।
চাটমোহরে এ স্কুলের পূর্বে আর কোনো প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না। তবে মুসলিম ছেলেরা মক্তবে পড়াশোনা করত। ইংরেজি শেখার জন্য বাবুদের সন্তানরা এ স্কুলে ভর্তি হয়। তাদের প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করানো হয়। পরবর্তীতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ওই স্কুলে পড়ানো হতো। বাবু সুরেন্দ্রনাথ কুণ্ডু প্রথম প্রধান শিক্ষক হিসেবে স্কুলের হাল ধরেন।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের বছর কলকাতা থেকে মেট্রিকুলেশন পাস করা দীনেশ দত্তকে প্রধান শিক্ষক সুরেন্দ্রনাথ কুণ্ডু স্কুলে যোগদানের প্রস্তাব দেন। এতে দীনেশ দত্ত রাজি হন এবং শিক্ষকতা শুরু করেন।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় রঘুনাথ কুণ্ডুকে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী গুলি করে হত্যা করলে প্রধান শিক্ষক সুরেন্দ্রনাথ ভারতে চলে যান। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্কুলের টিন, আসবাবপত্রসহ সবকিছু লুট হয়ে যায়। পড়ে থাকে শুধু ভিটেমাটি। যুদ্ধ শেষ হলে দীনেশ দত্ত মূলগ্রাম ইউনিয়নের শিবপুরে নিজ বাড়ির টিন এবং স্থানীয়দের কাছ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে স্কুলটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় বাড়ি থেকে পাটি, মাদুর ও চট নিয়ে স্কুলের মেঝেতে বিছিয়ে পড়তে হতো শিক্ষার্থীদের। তারপর থেকে স্কুলটি দীনেশ বাবুর পাঠশালা (দীনেশ স্কুল) হিসেবে পরিচিতি পায়।
শতবছরের প্রাচীন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র সাবেক এমপি ও বিএনপি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ১৯৫২-৫৩ সালে একমাত্র মুসলিম ছাত্র হিসেবে স্কুলে ভর্তি হই। আমার সঙ্গে কমল কুণ্ডু (ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক), অলোক কুমার কুণ্ডু (অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক), সূর্যকান্ত কুণ্ডু (বিশিষ্ট ব্যবসায়ী), রমণী মোহন দত্ত, বিশ্বনাথ দত্ত, কমল কান্ত রায়সহ হিন্দুঅধ্যুষিত চাটমোহরের ছেলেরা পড়ত।
তিনি জানান, এ স্কুলে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশে-বিদেশে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সচিব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রয়েছেন। অনেকে হয়েছেন বনেদি ব্যবসায়ী এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। আমরা কাজী আব্দুর রাজ্জাক (আলফু মাস্টার), তারাপদ সরকার, উদয় কুণ্ডু, কালিপদ গোস্বামীর কাছে লেখাপড়া করেছি।
স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অলোক কুমার কুণ্ডু জানান, আমাদের সময় মুসলিম ছাত্র তেমন ছিল না। তাছাড়া চাটমোহরে তখন হিন্দু বসতি সবচেয়ে বেশি ছিল। এ স্কুলটি শিশুদের শিক্ষার একমাত্র প্রতিষ্ঠান ছিল। তবে সে সময় চাটমোহর ব্যবসাপ্রধান এলাকা হওয়ায় অনেকেই লেখাপড়া শেষ করার আগেই ব্যবসায় মনোনিবেশ করে।
স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী বড়বাড়ির বর্তমান কর্ণধার অবসরপ্রাপ্ত ডিস্ট্রিক্ট রেজিস্ট্রার অসীম কুমার কুণ্ডু জানান, আমার দাদু শ্রীশ চন্দ্র ও রঘুনাথ কুণ্ডু স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৫২ সালে মহান ভাষা আন্দোলনে এবং ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে স্কুলের অনেক শিক্ষার্থী সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন। স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষক কাজী জাকির হোসেন জানান, ১৯৭৩ সালের পহেলা জুলাই তৎকালীন সরকার সারা দেশে ৩৭ হাজার প্রাইমারি স্কুল জাতীয়করণ করলে শ্রীশচন্দ্র অ্যান্ড রঘুনাথ প্রাইমারি স্কুলের নাম বদলে ‘চাটমোহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ নামকরণ করা হয়। বর্তমানে স্কুলে প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ৩১৭ শিক্ষার্থী রয়েছে।
স্কুল প্রতিষ্ঠার পর থেকে অনেক শিক্ষার্থীই বৃত্তিলাভ করে। সবশেষ ২০০০-২২ সাল পর্যন্ত ১৭৬ শিক্ষার্থী এ স্কুল থেকে বৃত্তিলাভ করে। এছাড়া দেওয়া হয় উপবৃত্তিও। তবে শিক্ষার্থীর তুলনায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই। স্কুলের সঙ্গেই রিসোর্স সেন্টার নির্মাণ করার কারণে স্কুলের জায়গা অনেক সংকুচিত হয়ে গেছে।
তিনি আরো জানান, স্কুলের অবকাঠামো সংকট প্রকট। পাঠদানের জন্য ৯টি কক্ষ প্রয়োজন হলেও আছে ছয়টি। লাইব্রেরিতে সহকারী শিক্ষকদের বসার জায়গা থাকলেও প্রধান শিক্ষকের আলাদা কোনো রুম নেই। আলমিরা, বৈদ্যুতিক পাখা, আসবাবপত্র, সোলার সিস্টেম স্থাপন, ইলেকট্রিক সরঞ্জাম মেরামত করা খুবই প্রয়োজন।
উপজেলা শিক্ষা অফিসার আবদুল গণি জানান, উপজেলা সমন্বয় কমিটির সভায় মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে থাকা উপজেলা রিসোর্স সেন্টার স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমরা স্কুলের ক্লাসরুম বাড়ানোর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তবে সারা দেশে প্রতিটি উপজেলা সদরে নানাবিধ ব্যবহারের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে অধিদপ্তরের। ওই বহুতল ভবন নির্মাণ করা হলে সব সমস্যার সমাধান হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


হরমুজ প্রণালিতে ফি আদায় নিয়ে নতুন বার্তা ইরানের