প্রতিষ্ঠার দুই দশকেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদেশি শিক্ষার্থী টানতে পারেনি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি)। ২০০৬ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়টিতে মাত্র ১২ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে পড়ছেন মাত্র একজন। ভৌগোলিক অবস্থান, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে বিদেশি শিক্ষার্থীরা আগ্রহ পাচ্ছে না বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যমতে, ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত মোট ১২ জন বিদেশি শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠানটিতে ভর্তি হয়েছেন। তাদের সবাই প্রতিবেশী দেশ নেপালের নাগরিক এবং অধ্যয়ন করেছেন কম্পিউটার সায়েন্স, ফার্মেসি, কৃষির মতো নির্দিষ্ট কিছু বিভাগে আর ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হননি।
বর্তমানে কৃষি বিভাগে অধ্যয়নরত একমাত্র বিদেশি শিক্ষার্থী নেপালের নাগরিক রাবি কুমার যাদব ২০২১-২২ সেশনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তার পড়াশোনা শেষ হলে বিশ্ববিদ্যালয়টি একেবারেই বিদেশি শিক্ষার্থীশূন্য হয়ে পড়বে।
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহের জন্য বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতাকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক বৈষম্য, আর্থিক সুযোগ-সুবিধার অভাব এবং ভৌগোলিক অবস্থান অন্যতম। দীর্ঘ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে মাত্র ১২ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়া উচ্চশিক্ষায় আন্তর্জাতিকীকরণে পিছিয়ে থাকার ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে অধ্যয়নরত একমাত্র বিদেশি শিক্ষার্থী রাবি কুমার যাদব জানান, নোবিপ্রবির পরিবেশ তার কাছে ভালো লাগলেও বিদেশি শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশে আসার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অস্থিরতা একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। তিনি জানান, অনেক বিদেশি শিক্ষার্থী বাংলাদেশে মূলত মেডিকেল পড়তে আসে। এর কারণ তুলনামূলক কম খরচে এমবিবিএস সম্পন্ন করা যায়। তবে অন্যান্য বিষয়ে আগ্রহ কম।
বিদেশি শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহের কারণ সম্পর্কে সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও ইন্টারন্যাশনাল কোলাবরেশন অ্যান্ড এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্সের অতিরিক্ত পরিচালক ড. রোকনুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, বিদেশি শিক্ষার্থীরা সাধারণত ঢাকা বা আশপাশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেয়। নোবিপ্রবিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা আবাসন সুবিধা নেই, যা একটি বড় সীমাবদ্ধতা।
তিনি বলেন, এখানে কোনো ইন্টারন্যাশনাল হল নেই। বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে সুযোগ-সুবিধা আছে, তা আমাদের নেই। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা একটি বড় কারণ। পাশাপাশি দীর্ঘসূত্রতা, সেশনজট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো বিষয়গুলোও বিদেশি শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরো বলেন, বিদেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণে নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ জরুরি। দূতাবাসের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচার, বিভিন্ন দেশে সেমিনার আয়োজন এবং সম্ভাব্য দেশগুলো চিহ্নিত করে পরিকল্পিত প্রচার চালানো প্রয়োজন। আমাদের ফার্মেসি, মাইক্রোবায়োলজি এবং ফিশারিজ বিভাগ অনেক ভালো। এসব বিষয় আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরতে হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, অনেক দেশ তাদের দূতাবাসের মাধ্যমে নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রচার করে। বাংলাদেশকেও সম্ভাব্য দেশ যেমন পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা আফ্রিকার কিছু দেশ টার্গেট করে কূটনৈতিক পর্যায়ে উদ্যোগ নিতে হবে।
তবে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়ে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন। গত বছর বিশ্বের ২১টি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছে নোবিপ্রবি। এসব চুক্তির মাধ্যমে যৌথ গবেষণা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময় এবং একাডেমিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এর মাধ্যমে নোবিপ্রবিতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়বে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
এ বিষয়ে নোবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইল বলেন, এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে বাইরে থেকে অনেক শিক্ষক আসছেন। আগামী মে মাসেও চারজন শিক্ষক আসবে আমাদের এখানে। আমাদের অনেক শিক্ষার্থীও বাইরে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধির একটা সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
বিদেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণে উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আগে বিদেশে শিক্ষার্থীর জন্য টিউশন ফি ছিল ৪৫ হাজার টাকা, আমরা কমিয়ে ২০ হাজার টাকায় নিয়ে এসেছি। নতুন প্রকল্পে চারটা হল দিয়েছি, যেখানে একটি হলে ইন্টারন্যাশনাল ব্লক ও পিএইচডি ব্লক রেখেছি। সেগুলো বাস্তবায়ন হলে তখন হয়তো নেপাল অথবা আশপাশের দেশ থেকে শিক্ষার্থী আসবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত তেওতা জমিদার বাড়ির বেহাল দশা