মাদরাসা থেকে ঢাবির আইন বিভাগে, অতঃপর সিভিল জজ

মাদরাসা থেকে ঢাবির আইন বিভাগে, অতঃপর সিভিল জজ

প্রথমবারেই বিচারক হওয়ার স্বপ্নপূরণ হয়েছে ফজলে রুহানির। ১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। মাদরাসার শিক্ষা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে পড়াশোনা, তারপর প্রথমবারেই বিচার বিভাগে সুপারিশপ্রাপ্তি—তার এই যাত্রা ধৈর্য, পরিশ্রম ও পরিবারের ত্যাগের গল্প। ফজলে রুহানি বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএলএম পড়ছেন।

বিজ্ঞাপন

জুডিশিয়ারিতে আসার প্রেরণা

আইন পড়তে শুরু করার পর থেকেই বিচার বিভাগ সম্পর্কে ফজলে রুহানির আগ্রহ তৈরি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ার সময় বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়। তার কাছে বিচারকের পদ কোনো ক্ষমতা বা মর্যাদার বিষয় নয়; এটি দায়িত্ব, সততা, নিরপেক্ষতা ও জন-আস্থার একটি অবস্থান। একজন বিচারক ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে থেকে উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দেন। মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার এই দায়িত্বই তাকে বিচারক হওয়ার প্রতি আকৃষ্ট করেছে।

শুরুটা যেমন ছিল

ফজলে রুহানির পড়াশোনার শুরু মাদরাসায়। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর ঝিরারপাড় দারুল উলুম দাখিল মাদরাসা থেকে ২০১৮ সালে দাখিল এবং ঢাকার তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা থেকে ২০২০ সালে আলিম সম্পন্ন করেন। দুটিতেই জিপিএ ৫ পেয়েছেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে এলএলবি (অনার্স) সম্পন্ন করেন। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএলএম পড়ছেন।

আইন পড়ার পাশাপাশি তিনি একাডেমিক পড়াশোনাকে বিজেএস প্রস্তুতির ভিত্তি হিসেবে নিয়েছেন। তাই একাডেমিক পড়াশোনাকে অবহেলা না করে সেটিকেই শক্ত ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলেছেন। প্রথমবার বিজেএস পরীক্ষায় অংশ নিয়েই লিখিত ও ভাইভা—দুই ধাপ পার হয়ে সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।

প্রিলিমিনারি প্রস্তুতি

প্রিলিমিনারি প্রস্তুতি মূলত আইনকেন্দ্রিক ছিল তার। প্রথমে পুরো সিলেবাস সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা তৈরি করেছেন এবং বিগত বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ করেছেন। কোন বিষয় থেকে কী ধরনের প্রশ্ন আসে এবং কোন জায়গাগুলোতে তার দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছেন। আইন বিষয়ে মূল আইন, গুরুত্বপূর্ণ ধারা এবং প্রশ্নের প্রয়োগের দিকগুলোকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে বিজ্ঞান ও গণিতে তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিলেন। তাই প্রিলিমিনারি পরীক্ষার পর এসব বিষয়ে বেশি সময় দিতে হয়েছে। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, সাধারণ অংশকে কম গুরুত্ব দেওয়া ঠিক হবে না। শুরু থেকেই আইন ও সাধারণ—উভয় অংশকে সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া ভালো।

লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি

লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি তুলনামূলকভাবে গভীর ছিল। বিশেষ করে আইন বিষয়ে শুধু ধারা মুখস্থ না করে সংশ্লিষ্ট আইন, গুরুত্বপূর্ণ বিধান, মামলার নজির (কেইস ল) এবং আইনের প্রয়োগের বিষয়গুলো বোঝার চেষ্টা করেছেন। একটি প্রশ্নের উত্তর কীভাবে শুরু করবেন, কোথায় শিরোনাম ব্যবহার করবেন, কোথায় আইনগত বিধান বা মামলার নজির উল্লেখ করবেন এবং কীভাবে উত্তর শেষ করবেন—এসব বিষয়ে সচেতন ছিলেন।

তার মতে, লিখিত পরীক্ষায় শুধু জ্ঞান থাকাই যথেষ্ট নয়। প্রশ্নের চাহিদা অনুযায়ী প্রাসঙ্গিক উত্তর দেওয়া, উপস্থাপনা ও সময় ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। কত পৃষ্ঠা লিখলেন, তার চেয়ে উত্তর কতটা প্রাসঙ্গিক ও মানসম্মত হলো, সেটিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

ভাইভার প্রস্তুতি

ভাইভার প্রস্তুতিতে প্রথমে নিজের একাডেমিক পটভূমি ও নিজের সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা তৈরি করেছেন। পাশাপাশি সংবিধান, আইন, গুরুত্বপূর্ণ আইনগত বিষয় এবং সমসাময়িক বিষয়গুলো পড়েছেন। তবে তার কাছে ভাইভার প্রস্তুতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল স্বাভাবিক থাকা। সব প্রশ্নের উত্তর জানা সম্ভব নয়। তাই কোনো প্রশ্নের উত্তর না জানলে তা স্বাভাবিকভাবে স্বীকার করা এবং বোর্ডের সামনে সংযতভাবে কথা বলার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। ভাইভায় বোর্ডের সামনে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেছেন তিনি। প্রশ্নগুলোর উত্তর যতটা সম্ভব পরিষ্কার ও সংক্ষিপ্তভাবে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

নতুনদের উদ্দেশে তার পরামর্শ

রুহানি বলেন, প্রথমত, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে এবং ধৈর্য ধরে এগিয়ে যেতে হবে। বিজেএসের প্রস্তুতি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এ সময় হতাশা কিংবা নিজের দুর্বলতা নিয়ে দুশ্চিন্তা আসতেই পারে, কিন্তু সেখান থেকে থেমে গেলে চলবে না।

সিলেবাস ভালোভাবে বুঝে পড়তে হবে। অনেক বই পড়ার চেয়ে একটি বিষয় ভালোভাবে বোঝা, নিয়মিত পুনরাবৃত্তি করা এবং আগের বছরের প্রশ্ন অনুশীলন করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে জরুরি হলো ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। একাডেমিক পড়াশোনাকে অবহেলা না করে সেটিকেই শক্ত ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

আইনের বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ অংশকেও শুরু থেকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে নিজের দুর্বল জায়গাগুলো আগে চিহ্নিত করে সেগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য নিয়মিত কাজ করতে হবে।

সবশেষে তিনি বলেন, ‘নিজের কাজটুকু আন্তরিকভাবে করে যেতে হবে। পরিশ্রম, ধৈর্য ও ধারাবাহিকতার কোনো বিকল্প নেই। বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন