ইতিহাসের ধুলোমাখা পাতায় বাগদাদ যেন এক রূপকথার নগরী। দজলা নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই শহর একসময় ছিল বিশ্বসভ্যতার কেন্দ্রভূমি। যখন ইউরোপ অন্ধকারের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত, চীনের ঐশ্বর্য পৃথিবীর কাছে প্রচ্ছন্ন, ভারতে সবে প্রতিষ্ঠা হচ্ছে গৌরবময় মুসলিম শাসন, তখন আব্বাসী খলিফাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাগদাদে জ্বলছিল প্রদীপ্ত জ্ঞানশিখা। সেই শিখার উজ্জ্বলতম আধারটির নাম মুসতানসিরিয়া মাদরাসা। এটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না, বরং এটি ছিল আরব জাহানের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট
হিজরি সপ্তম শতাব্দীর শুরুর কথা। আব্বাসী খেলাফতের তখন শেষ বিকাল, তবু সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্যে বাগদাদ তখনো বিশ্বের মধ্যে অনন্য। ৬২৩ হিজরিতে খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পরে খলিফা আল-মুসতানসির বিল্লাহ উপলব্ধি করলেন, জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা ও পাঠদানের কার্যক্রমকে সুসংহত করতে বহুমুখী সুবিধা-সংবলিত একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন। খলিফা মুসতানসির বিল্লাহ এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যা হবে জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চার সব শাখা-প্রশাখা বা স্কুল অব থটের সমন্বয়ক। যেখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞানেরও নিরবচ্ছিন্ন চর্চা হবে।
৬২৫ হিজরি (১২২৭ খ্রি.) সনে দজলা নদীর পূর্বতীরে মুসতানসিরিয়া মাদরাসার নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ৬৩১ হিজরিতে (১২৩৪ খ্রি.) নির্মাণকাজ শেষ হয়। উৎসবমুখর আয়োজনে মাদরাসাটির উদ্বোধন করা হয়। ১৬০টি উটের পিঠে চাপিয়ে দুর্লভ পাণ্ডুলিপি ও বইপত্র মাদরাসার লাইব্রেরিতে আনা হয়।
বৈচিত্র্যময় পাঠ্যক্রম
মুসতানসিরিয়া মাদরাসার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এর আধুনিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পাঠ্যক্রম। এটি শুধু ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র না, বরং সেখানে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো বিদ্যমান ছিল। এই প্রতিষ্ঠানে দক্ষ বিচারক, কূটনীতিক, চিকিৎসক, গণিতবিদসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারদর্শী ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলা হতো।
ধর্মীয় বিজ্ঞান ও ভাষা-সাহিত্য : কোরআনের তাফসির, হাদিসচর্চা ও ফিকহ (ইসলামি আইন শাস্ত্র) ছিল ধর্ম-শিক্ষার মূল সাবজেক্ট। এই প্রতিষ্ঠানের অনন্যতা ছিল, ইসলামি আইন শাস্ত্রের চারটি স্কুল অব থটের (মাজহাব) সমন্বিত পাঠদান। আরবি ব্যাকরণ এবং উচ্চতর অলংকার শাস্ত্রও পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
প্রাকৃতিক ও গাণিতিক বিজ্ঞান : পাটিগণিত, জ্যামিতি ও জ্যোতির্বিজ্ঞান মুসতানসিরিয়া মাদরাসার পাঠ্যক্রমের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল।
চিকিৎসাশাস্ত্র : মাদরাসার দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে একটি বিশেষ চিকিৎসা বিভাগ প্রতিষ্ঠিত ছিল ‘বিমারিস্তান’ বা হাসপাতাল নামে। সেখানে হাতে-কলমে শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা পদ্ধতি শেখানো হতো।
এছাড়া আরো অনেক বিষয় মাদরাসার শিক্ষা-কারিকুলামের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আবাসিক ব্যবস্থাপনা
মুসতানসিরিয়া মাদরাসার আবাসিক ব্যবস্থা ছিল সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক। উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্কলারশিপ কর্মসূচির সঙ্গে এর উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য দেখা যায়। খলিফা মুসতানসির বিল্লাহর পৃষ্ঠপোষকতায় এখানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য পূর্ণাঙ্গ সুযোগ-সুবিধার নিশ্চয়তা ছিল এবং পাঠ গ্রহণের পরিবেশও ছিল অত্যন্ত মনোরম।
প্রতিটি শাস্ত্রের শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক ব্লক ও সুসজ্জিত কক্ষের ব্যবস্থা ছিল। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে নির্ধারিত কক্ষ, মাদুর ও গালিচা সরবরাহ করা হতো। মাদরাসার রান্নাঘরে প্রতিদিন উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হতো।
মাদরাসার লাইব্রেরিতে প্রায় ৮০,০০০ দুর্লভ পাণ্ডুলিপি ছিল। সেখানে আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা এবং রাতে পড়াশোনার জন্য পর্যাপ্ত আলোর সুবিধা ছিল।
শিক্ষার্থীদের প্রতি মাসে এক দিনার করে ভাতা দেওয়া হতো। পাশাপাশি সাবান, তেল, লেখার কাগজসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রীর খরচও বহন করা হতো। অসুস্থদের জন্য সার্বক্ষণিক চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থাও ছিল।
মুসতানসিরিয়া মাদরাসা ছিল এতিমবান্ধব একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠান। এখানে এতিম শিশুদের জন্য ছিল আলাদা ‘দারুল কোরআন’। শিক্ষার্থীদের একমাত্র কাজ ছিল রুটি-রুজির চিন্তা না করে জ্ঞানার্জনে নিমগ্ন থাকা।
মুসতানসিরিয়ার প্রাণপুরুষ
মুসতানসিরিয়া মাদরাসা শুধু ইটপাথরের কোনো কাঠামো ছিল না; এর আসল প্রাণ ছিলেন বরেণ্য শিক্ষকরা। মাদরাসার পরিচালক মহিউদ্দিন আবুল মাহাসিন ইউসুফ ইবনুল জাওজি ছিলেন সবচেয়ে আলোচিত এবং আলোকিত ব্যক্তি। মিসরের সুলতান আলকামিল তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা সম্পর্কে বলেছেন, ‘দুনিয়ার মানুষের জ্ঞানবুদ্ধির ঘাটতি থাকলেও মহিউদ্দিনের জ্ঞানবুদ্ধি ছিল অনেক বেশি। এই জিনিসটা তার আরেকটু কম হলেই বরং ভালো হতো।’
শেষ পরিণতি
৬৫৬ হিজরির (১২৫৮ খ্রি.) মোঙ্গল সেনাপতি হালাকু খান বাগদাদ অবরোধ করে, তখন ইবনুল জাওজি খলিফার দূত হিসেবে মোঙ্গল শিবিরে গিয়ে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা করেন। কিন্তু ভাগ্য ছিল নির্মম। তাতাররা শহরে প্রবেশ করে মুসতানসিরিয়ার বিশ্ববিখ্যাত লাইব্রেরির প্রায় ৮০ হাজার দুর্লভ পাণ্ডুলিপি দজলা নদীতে ফেলে দেয়। এই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেই ইবনুল জাওজি ও তার তিন ছেলে নির্মমভাবে শহীদ হন।
আজ দজলা নদীর তীরে মুসতানসিরিয়ার জীর্ণ দেয়ালগুলো সেই হারানো গৌরব ও শৌর্যের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সভ্যতার উত্থান ঘটে জ্ঞানের ভিত্তিতে আর পতন ঘটে তখনই, যখন সেই জ্ঞানকে রক্ষা করার শক্তি ও ঐক্য রাষ্ট্র হারিয়ে ফেলে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

