বাংলা অঞ্চলের ঋতুচক্রে গরমের উপস্থিতি নতুন কিছু নয়। ‘চৈত্রের খরতাপ’ বা ‘জ্যৈষ্ঠের দাবদাহ’ এই পরিচিত কথাগুলোই বলে দেয় বছরের নির্দিষ্ট একটি সময়ে তাপমাত্রা কতটা প্রভাব ফেলে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।
বাংলা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী চৈত্র মাস পড়ে মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে, আর জ্যৈষ্ঠ পড়ে মে-জুনে। মাঝখানে বৈশাখ। তবে বাস্তবে বাংলাদেশে গরমের শুরুটা ক্যালেন্ডারের সীমায় আবদ্ধ থাকে না। মার্চ থেকেই তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করে এবং অনেক সময় তা শরৎকাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়। চলতি বছরের মার্চে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘনঘন ঝড়-বৃষ্টির কারণে গরম খুব বেশি অনুভূত না হলেও এপ্রিলের শুরুতেই তাপপ্রবাহের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তাপমাত্রা কতটা বাড়তে পারে?
বাংলাদেশে সাধারণত এপ্রিল মাসকেই বছরের সবচেয়ে উষ্ণ সময় হিসেবে ধরা হয়। দীর্ঘমেয়াদি তথ্য অনুযায়ী, এ মাসে গড় তাপমাত্রা থাকে প্রায় ৩৩.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মে মাসে তা কিছুটা কমে ৩২.৯ ডিগ্রি এবং মার্চে থাকে প্রায় ৩১.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এ বছর এপ্রিলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের কাছাকাছি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দেশের কিছু অঞ্চলে, বিশেষ করে রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা, বরিশাল ও খুলনা বিভাগে তাপপ্রবাহের সময় তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, পহেলা বৈশাখের পরদিনই রাজশাহীতে তাপমাত্রা প্রায় ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। এপ্রিলজুড়ে দেশে কয়েক দফা মৃদু থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় এ প্রবণতা বেশি দেখা যেতে পারে। অন্যদিকে, এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে মোট ছয় থেকে আটটি মৃদু এবং তিন থেকে চারটি তীব্র তাপপ্রবাহ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
তাপপ্রবাহের শ্রেণিবিভাগ অনুযায়ী:
৩৬-৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস: মৃদু তাপপ্রবাহ
৩৮-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস: মাঝারি তাপপ্রবাহ
৪০-৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস: তীব্র তাপপ্রবাহ
আগে যেখানে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তাপপ্রবাহ সীমাবদ্ধ থাকত, এখন তা অনেক ক্ষেত্রে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হচ্ছে যার পেছনে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন বড় ভূমিকা রাখছে।
গরম কি তুলনামূলক কম লাগবে?
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, তাপমাত্রা বেশি হলেও এ বছর গরমের তীব্রতা ২০২৪ সালের মতো চরম পর্যায়ে নাও পৌঁছাতে পারে। কারণ, এ বছর বজ্রঝড়ের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৪ সালে বজ্রঝড় কম হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ তৈরি হয়েছিল, যা কয়েক দশকের রেকর্ড ভেঙেছিল। সাধারণত এপ্রিল মাসে গড়ে ৯ দিন এবং মে মাসে প্রায় ১৩ দিন বজ্রঝড় হয়ে থাকে।
কেন বাড়তে পারে বজ্রঝড়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আগত পুবালি বায়ু বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের সময় তুলনামূলক বেশি গতিশীল থাকবে। এতে সাগরের পানির তাপমাত্রা ২৬ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে, যা বাষ্পীভবন বাড়ায়। এর ফলে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়ে, যা মেঘ তৈরি ও বজ্রবৃষ্টির জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করে। এছাড়া বৈশ্বিক আবহাওয়াগত প্রভাব, যেমন এল নিনো, এ ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে। বজ্রঝড় হলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কমে আসে অনেক সময় ২ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত।
আবহাওয়ার পরিবর্তন কি অস্বাভাবিক?
মার্চ ও এপ্রিলের শুরুতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেসব ঝড়-বৃষ্টি হয়েছে, তা আসলে বাংলাদেশের স্বাভাবিক মৌসুমি চক্রেরই অংশ। বজ্রমেঘ থেকে সৃষ্ট এসব বৃষ্টিপাতের সঙ্গে দমকা হাওয়া ও বজ্রপাত থাকে, যা হঠাৎ তাপমাত্রা কমিয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের আবহাওয়া নতুন কিছু নয়। প্রতি বছরই মার্চ থেকে মে পর্যন্ত এমন ওঠানামা দেখা যায়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সময় ও তীব্রতায় কিছুটা অমিল দেখা দিতে পারে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
আগামী কয়েক দিন দিনে ও রাতের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে পারে। তবে কিছু অঞ্চলে চলমান মৃদু তাপপ্রবাহ প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এছাড়া ময়মনসিংহ, সিলেট ও রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দমকা হাওয়া, বজ্রসহ বৃষ্টি এবং কোথাও কোথাও শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে, এ বছরের গরম দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, তবে মাঝেমধ্যে বৃষ্টি ও বজ্রঝড় কিছুটা স্বস্তি এনে দেবে এমনটাই মনে করছেন আবহাওয়াবিদরা।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


ফেসবুক আইডি হ্যাক হবে না যে পদক্ষেপে
এসএসসি পরীক্ষায় ফের আসছে ‘সাইলেন্ট এক্সপেল’