ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে সুন্দরবন

এলাহী নেওয়াজ খান

ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে সুন্দরবন

সেদিন সন্ধ্যা পেরিয়ে গভীর আঁধারে ঢেকে গিয়েছিল পশুর নদী। দূরে আলো ঝলমল করছিল রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই প্রথম আমি সেটা দেখলাম। যখন আমরা জাহাজে করে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি অতিক্রম করছিলাম, তখন চোখে পড়ল চিমনি দিয়ে উঠছে কালো ধোঁয়া, যা ওইখানের আকাশে একটি আস্তরণ তৈরি করেছে। ঠিক এর উল্টো দিকে পশুর নদীর ওপারের আকাশ পরিষ্কার ঝকঝক করছিল। রাতে সহজেই পার্থক্যটা বোঝা যায়; দিনের আলোয় তা বোঝা মুশকিল হয়।

যেখানে সারা বিশ্বে, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোয় এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে, সেখানে আওয়ামী শাসনামলে ২০৪১ সালের মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫০ ভাগে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত কতটা ধ্বংসাত্মক ছিল, তা এখন সবাই বুঝতে সক্ষম হচ্ছেন। এখানে উল্লেখ করতে হয়, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকার কেবল ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভারতীয় কোম্পানিকে এই প্রজেক্ট অর্পণ করেছে। অথচ ভারত পরিবেশ রক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। গণচীন এরই মধ্যে অনেক ছোট ছোট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে। সারা বিশ্বেই এখন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কমে যাচ্ছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ ডেনমার্ক তো ২০৫০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে চলে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

বিজ্ঞাপন

শুধু ভারতকে খুশি করে ক্ষমতায় টিকে থাকার লক্ষ্যে এমন পরিবেশ ধ্বংসকারী বিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নেওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। কোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ এভাবে নিজের দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে পারে না, যেটা আওয়ামী লীগ সরকার করেছে। সারা বিশ্ব যখন নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে রূপান্তরিত হচ্ছে, তখন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট হাতে নেওয়ার পেছনে ভারতকে খুশি করার পাশাপাশি বড় ধরনের দুর্নীতির অভিসন্ধিকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ওই সময়ে ২০৪১ সালের মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ ৫০ শতাংশে উন্নীত করার কথা বললেও বিদ্যুৎমন্ত্রী কখনোই নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলেননি। অথচ সেটাই এখন সারা পৃথিবীর প্রধান দাবি।

আন্তর্জাতিক এনার্জি সংস্থা ভবিষ্যদ্বাণী করছে, ২০৩০ সালের মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ আট শতাংশে নেমে যাবে এবং ২০৫০ সালে তা শূন্যতে চলে আসবে। এই যখন পরিস্থিতি তখন বিগত বাংলাদেশ সরকারের ওই সিদ্ধান্ত দেশদ্রোহিতার শামিল ছাড়া আর কিছু নয়। আর এই বিদ্যুৎ প্রকল্পটি এমন এক জায়গায় স্থাপিত হয়েছে, যেটা বাংলাদেশের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ, যা আমাদের নিরাপত্তা ঝুঁকিকে অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সেইসঙ্গে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ধ্বংসের পথ প্রশস্ত হয়েছে।

আমরা ছোটবেলায় কয়লার ইঞ্জিনচালিত ট্রেনে উঠেছি বহুবার। তখন দেখেছি সাদা শার্ট পরে জানালার পাশে বসে থাকলে কীভাবে বরফকণার মতো শার্টের ওপর কয়লার কণা এসে পড়ত; অজান্তে ডলা দিলে শার্টে কালো দাগ পড়ে যেত। তখন আমরা এর ক্ষতিকর প্রভাবের কথা জানতাম না। সে সময় অবলীলায় রেললাইনের দুপাশের বসতবাড়িতে সেই কয়লার কণা ছড়িয়ে পড়ত এবং পরিবেশকে করে তুলত দূষিত। এখন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ঠিক সেভাবেই কয়লার কণা নির্গত হয় এবং তা বাতাসে অনেক দূর ছড়িয়ে দেয়, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের অভিমত থেকে এটা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাস্তুতন্ত্র অর্থাৎ ইকোসিস্টেমের জন্য একটি বড় হুমকি, যা ধারণা থেকেও বেশি বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। এটি থেকে নির্গত সালফার ডাই-অক্সাইড (SO₂), নাইট্রোজেন অক্সাইড (NOₓ) ও অন্যান্য দূষণকারী পদার্থ বায়ু ও পানি দূষণ করছে, যা ম্যানগ্রোভ বনের প্রাণ-প্রকৃতি, জলজ প্রাণী ও আশেপাশের মানববসতির স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় কৃষিভিত্তিক জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এখানে উল্লেখ করতে হয়, সুন্দরবন হচ্ছে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। এটা রক্ষা করা সরকারসহ জনগণের দায়িত্ব। তখন ইউনেস্কো আপত্তি তুলেছিল; কিন্তু সেটা আমলে নেওয়া হয়নি। বরং তৎকালীন কর্তৃত্ববাদী শাসকগোষ্ঠী অর্থ ও ক্ষমতার লোভে পরিবেশবিদ ও জনগণের তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও পরিবেশবিধ্বংসী এই প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। এটি বনের কাছাকাছি হওয়ায় বনের ইকোসিস্টেম, ম্যানগ্রোভ বন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি হুমকি সৃষ্টি করেছে।

কয়লা পোড়ানোর ফলে বিষাক্ত ধোঁয়া, ছাই এবং তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের উপজাতগুলো বায়ুমণ্ডলকে দূষিত করছে। এছাড়া পশুর নদী থেকে পানি গ্রহণ এবং পরিশোধিত ও অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলার ফলে নদী দূষিত হচ্ছে, যা জলজ প্রাণীর জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

এটা নির্মাণে অনেক জমি অধিগ্রহণের ফলে স্থানীয় কৃষকদের অনেকে জীবিকা ও আয়ের উৎস হারিয়েছে। এছাড়া এটি উপকূলবর্তী হওয়ায় যেকোনো প্রবল ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

১৩২০ মেগাওয়াটের রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে। আর ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সঙ্গে নিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উদ্বোধন করে ভেবেছিলেন, তার ক্ষমতা বুঝি চিরস্থায়ী হয়ে গেল। কিন্তু মাত্র পৌনে দুই বছরের মাথায় ছাত্র-জনতার গণবিপ্লবের মুখে তিনি ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন; কিন্তু পিছনে রেখে গেছেন রামপাল নামক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভয়াবহ অভিশাপ।

সে সময় বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়নের সঙ্গী ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত মিশেল ইফায়েল হেনরি উইথনার ডিক্যাব আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বিশেষজ্ঞদের অভিমত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, উন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎ যেমন জরুরি, তেমনি পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও ভাবনা থেকে ছেঁটে ফেলা যাবে না।

সেই অনুষ্ঠানে উইথনার আরো বলেছিলেন, আমরাই বিশ্বের প্রথম দেশ, যারা ২০৫০ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি শূন্যতে এনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার শুরুর লক্ষ্য নিয়েছে। অথচ ওই সময় তৎকালীন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ২০৪১ সালের মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ ৫০ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলেছিলেন। এবার ভাবুন, স্বার্থান্ধ হয়ে কতটা পশ্চাৎপদ অবস্থানে তারা ছিলেন!

পরিশেষে আমি ধন্যবাদ জানাই সেই দুটি সংগঠনের প্রধানদের, যারা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষতিকর প্রভাব দেখা এবং বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল গভীরভাবে অনুধাবন করার অসাধারণ সুযোগটি করে দিয়েছেন। অর্থাৎ আমি পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি ও ইংরেজি দৈনিক নিউ নেশনের সাবেক সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার এবং চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন খানের কথা বলছি। তারা দুজনই দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ নিয়ে কাজ করছেন এবং তাদের রয়েছে আন্তর্জাতিক সুখ্যাতি।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...