ভূমধ্যসাগরের নীল জলে ডুবছে কেন জেনজিরা

ড. মো. ফখরুল ইসলাম

ভূমধ্যসাগরের নীল জলে ডুবছে কেন জেনজিরা

ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশি একসময় ছিল সভ্যতার উত্থানপতনের নীরব সাক্ষী, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির সেতুবন্ধ। অথচ আজ সেই সাগরই পরিণত হয়েছে অসংখ্য তরুণের অচিহ্নিত কবরস্থানে। বিশেষ করে, বাংলাদেশের জেনজি (জেনারেশন জেড) যারা নবীন, স্বপ্নবাজ, প্রযুক্তিনির্ভর এই প্রজন্মের অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছে এবং অনেকে সেই যাত্রাপথেই মৃত্যুবরণ করছে। এপ্রিল ২০২৬-এর প্রথম সপ্তাহে সুনামগঞ্জের কয়েকটি গ্রামে একই বয়সের আটজনের সলিলসমাধি ঘটেছে ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশিতে। তাদের পরিবারগুলোর করুণ কান্নার আহাজারি থামানোর ভাষা কার সাধ্যে আছে? টিভিতে প্রায় প্রতিনিয়ত এসব দৃশ্য দেখে কারো মনে দাগ কাটে বলে মনে হয় না। আবার এই ভয়াবহ বাস্তবতা দুর্ঘটনার মতো মনে হলেও প্রতিবছর বারবার এই করুণ পরিণতির ঘটনা আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নীতিগত ব্যর্থতার বহুমাত্রিক প্রতিফলন।

এসব ঘটনায় আমাদের মনে প্রথমেই প্রশ্ন আসে, আমাদের কোমলমতি জেনজিরা কেন এত ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছে? এর উত্তর খুঁজতে গেলে তাদের মানসিকতা ও সময়ের প্রেক্ষাপট বুঝতে হবে। জেনজি এমন এক প্রজন্ম, যারা ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় পেয়েছে। তারা ইউরোপের জীবনযাত্রা, স্বাধীনতা, উচ্চ আয়ের সুযোগ এবং সামাজিক নিরাপত্তার ছবি প্রতিনিয়ত দেখছে। এই দৃশ্যগুলো তাদের মনে এক ধরনের ‘গ্লোবাল লাইফস্টাইল’-এর আকাঙ্ক্ষা তৈরি করছে। কিন্তু এই ছবির অন্ধকার দিক হচ্ছে, অভিবাসন নীতির কঠোরতা, বর্ণবৈষম্য, শ্রমবাজারের প্রতিযোগিতা-এসব খুব কমই সামনে আসে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে; কিন্তু তাদের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত চাকরি নেই। অনেকেই শিক্ষিত বেকার বা আংশিক বেকার হিসেবে জীবনযাপন করছে। এই হতাশা থেকে জন্ম নেয় এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও আস্থাহীনতা। অনেকে বলেন, এ দেশে কিছু হবে না। ফলে বিদেশে যাওয়াই হয়ে ওঠে একমাত্র বিকল্প।

এই প্রবণতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সামাজিক মানসিকতা। আমাদের সমাজে বিদেশফেরত বা প্রবাসীদের প্রতি এক ধরনের অতিরিক্ত সম্মান ও আকর্ষণ কাজ করে। কেউ ইউরোপে পৌঁছাতে পারলে তাকে সফল হিসেবে দেখা হয়, তার সংগ্রাম বা কষ্টের গল্প আড়ালে চলে যায় এবং বাহ্যিক সাফল্যই বেশি প্রচারিত হয়। এতে অন্য তরুণদের মধ্যেও একই পথ অনুসরণের আগ্রহ তৈরি হয়।

এই চাহিদাকেই পুঁজি করে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী মানব পাচারকারী নেটওয়ার্ক। এই দালালচক্রগুলো অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্থানীয় এজেন্ট এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে তরুণদের প্রলুব্ধ করে। নিরাপদে ইউরোপে পৌঁছে দেওয়া, কাজের নিশ্চয়তা, দ্রুত বৈধ কাগজপত্র, এমন নানা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। অনেক পরিবার তাদের শেষ সম্পদ বিক্রি করে এই স্বপ্নে বিনিয়োগ করে, যা শেষ পর্যন্ত দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।

বাস্তব যাত্রাপথটি অত্যন্ত ভয়াবহ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই তরুণরা প্রথমে উত্তর আফ্রিকার কিছু দেশে পৌঁছায়, যেখানে তারা দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। সেখানে তারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়, অনেক সময় জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য হয়। এরপর একসময় তাদের ঠেলে দেওয়া হয় ছোট, ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে। এই নৌকাগুলোয় থাকে অতিরিক্ত যাত্রী, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকে না এবং সামান্য ঝড় বা যান্ত্রিক ত্রুটিই হয়ে ওঠে মৃত্যুর কারণ।

প্রতিটি দুর্ঘটনা আমাদের সামনে এক নির্মম সত্য তুলে ধরে যা হলো, এই মৃত্যুগুলো দুর্ঘটনা নয়, বরং প্রতিরোধযোগ্য ট্র্যাজেডি। এগুলো আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দুর্বলতা, আন্তর্জাতিক অভিবাসন নীতির সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্যের ফল।

তথ্য বিভ্রান্তিও একটি বড় কারণ। জেনজি প্রজন্ম তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ হলেও সব তথ্য যাচাই করার প্রবণতা সবসময় থাকে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অনেক ভুয়া বা আংশিক সত্য গল্প তাদের বিভ্রান্ত করে। কেউ ইউরোপে গিয়ে সফল হলে তার গল্প ভাইরাল হয়, কিন্তু যারা পথে মারা যায় বা চরম দুর্ভোগে পড়ে, তাদের গল্প সামনে আসে না।

এখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানব পাচার প্রতিরোধে আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ সবসময় নিশ্চিত করা যায় না। দালালচক্রগুলো অনেক সময় প্রভাবশালী হওয়ায় তারা সহজেই আইনের আওতার বাইরে থেকে যায়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বয়ের অভাবও এ সমস্যাকে জিইয়ে রাখে।

এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। সেগুলো যেভাবে করা সম্ভব তা হলো-প্রথমত, দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। বিশেষ করে, তরুণদের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক কাজের ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলোকে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে তারা দেশে থেকেই নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়তে পারে।

দ্বিতীয়ত, সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক তথ্য প্রচার করতে হবে। যারা এই পথে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের অভিজ্ঞতা সামনে আনলে তা অন্যদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।

তৃতীয়ত, বৈধ অভিবাসনের পথ সহজ করতে হবে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে। এতে মানুষ অবৈধ পথ বেছে নেওয়ার প্রবণতা কমবে।

চতুর্থত, মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু আইন প্রণয়ন নয়, তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই চক্রগুলোর কার্যক্রম নজরদারিতে আনতে হবে।

পঞ্চমত, সামাজিক মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। বিদেশে যাওয়াকে একমাত্র সফলতার মানদণ্ড হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। দেশে সফলতার গল্পগুলো তুলে ধরতে হবে, যাতে তরুণরা বিকল্প পথ দেখতে পায়।

তবে এ সমস্যাকে শুধু একটি দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর পরিসংখ্যান হিসেবে দেখা যাবে না। এটি একটি মানবিক সংকট। প্রতিটি তরুণের মৃত্যু মানে একটি পরিবারের স্বপ্নের মৃত্যু, একটি সমাজের সম্ভাবনার ক্ষতি এবং একটি দেশের ভবিষ্যতের ওপর আঘাত।

ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশি যেন আর আমাদের জেনজিদের কবর না হয়, এই লক্ষ্য অর্জনে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এ সংকট থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। তা না হলে, এই সাগরের ঢেউ শুধু পানির ঝাপটা নয় আরো অনেক স্বপ্ন, আশা আর সম্ভাবনাকে চিরতরে গ্রাস করে যাবে।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন

E-mail: fakrul@ru.ac.bd

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...