ইরান যুদ্ধে ডলার-ইউয়ান প্রতিযোগিতা

আমীর খসরু

ইরান যুদ্ধে ডলার-ইউয়ান প্রতিযোগিতা
আমীর খসরু

পারস্য সভ্যতা, যা বর্তমানের ইরান রাষ্ট্র, তার ইতিহাস অন্তত পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো। ১৯৩৫ সালের আগে পর্যন্ত পশ্চিমা দুনিয়ার কাছে ইরানের ডাকনাম ছিল পার্স বা পারস্য। তবে অধিবাসীরা ইরান নামেই জানে, চেনে এবং পরিচয় দেয়। পারস্য এমন এক সভ্যতা, যা বহিঃশক্তির অধীনে ছিল খুব কম সময়। পার্স প্রদেশের নামে পরিচিত হলেও পারস্য অভিযানে এসেছিলেন মহামতি আলেকজান্ডার। ধারণা করা হয়, তার মৃত্যুও হয় এ অঞ্চলে। ধন-সম্পদের বাইরেও আভিজাত্যে, তৎকালীন কৌলিন্যে, সংস্কৃতিতে এতই সমৃদ্ধ ছিল যে, সপ্তম শতাব্দীতে যখন আরবরা পারস্য দখল করল, তখন তারা ছিল অনেক অনেক গুণে বর্বর এবং পিছিয়ে পড়া। তিউনিসিয়ায় ১৩৩২ সালে জন্মগ্রহণকারী বিশ্বখ্যাত ইবনে খালদুন ইতিহাসবিদ এবং পণ্ডিত, তার আল-মোকাদ্দিমায় বর্ণনা করেন, আরবরা পারসীয় মিহি রুটিকে দামি কাপড়ের টুকরো এবং কর্পূরকে লবণ ভেবেছিল। এভাবে নানা বর্ণনা রয়েছে পারস্য জনগোষ্ঠীর। (আল-মোকাদ্দিমা, বাংলা ভাষান্তর—পৃষ্ঠা ৩২১)

বিখ্যাত বহু জ্ঞানবিষারদ আবু রাইহান আল বিরুনি এক হাজার সাল নাগাদ তার বিখ্যাত বইয়ে কিতাব আল-আহতার বাকাইয়া আন আল-কুরুন আল-খিলাফাহ (অতীত শতাব্দীর অবশিষ্ট নিদর্শনগুলো) পারস্য সভ্যতার গৌরবগাথার উল্লেখ করেছেন। আল-বিরুনি আমাদের অঞ্চলে তার ‘ভারততত্ত্ব’ বইয়ের জন্য বিখ্যাত। আল-বিরুনির সময় বা আগে-পরে উচ্চতর গণিত, জ্যোতির্বিদ্যাসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের পীঠস্থান ছিল এই পারস্য। প্রখ্যাত কবি, জ্যোতির্বিদ, গণিতবিদ, দার্শনিক ওমর খৈয়ামের জন্মস্থান এই পারস্যের নিশাপুরে ১০৪৮ সালে। এভাবে অসংখ্য বিখ্যাত সন্তান জন্ম দিয়েছে তৎকালীন বিশ্বের খ্যাতনামা পারস্য।

বিজ্ঞাপন

মোঙ্গলরাও আক্রমণ করেছিল পারস্য সাম্রাজ্য ১৩ শতকে। ধ্বংসযজ্ঞ, লুণ্ঠন শেষে তারা পারস্য ত্যাগ করে। এছাড়া ছোটখাটো আক্রমণ হলেও এই ভূখণ্ডে টিকতে পারেনি কেউই।

আগে পারস্য নাম থাকলেও ইরানের সম্রাট রেজা শাহ পাহলভি—অর্থাৎ পাহলভি রাজবংশের সম্রাট ১৯৩৫ সালে দেশটির নাম পরিবর্তন করেন দীর্ঘ ইতিহাসের স্মারক হিসেবে। পণ্ডিত আল-বিরুনি পারস্যকে ইরান বলতে ‘কোনো কিছুর ওপরই নির্ভরশীল নয়’—এমন সাম্রাজ্যের বা অঞ্চলের কথা বলেছেন। এরপর কয়েক দফা অভ্যন্তরীণভাবে রাজবংশ পরিবর্তন হয়। ১৯০৫ সালে ইরানে জাতীয় সংসদ বা পার্লামেন্ট গঠিত হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে পাহলভি রাজবংশ ক্ষমতায় আসে।

১৯৪১ সালে আমেরিকার সমর্থনে ব্রিটিশ এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ইরান আক্রমণ করে এই কারণে যে, দেশটি যাতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পক্ষে না যায়। সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত হন রেজা শাহ পাহলভি। ১৯৫১ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ইরানের তেল সম্পদকে জাতীয়করণ এবং বিদেশি তেল কোম্পানিগুলোকে ইরান ত্যাগে বাধ্য করেন। এরপর ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র সিআইএর মাধ্যমে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে রেজা শাহকে ক্ষমতায় বসান। তেল সম্পদে আবার যোগ দেয় বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটিশ তেল কোম্পানিগুলো।

রেজা শাহ আধুনিকতার নামে পশ্চিমা আচার সংস্কৃতিতে দেশকে পরিচালিত করেন। তবে পশ্চিমা অর্থনীতি দেশকে ক্রমাগত নিম্নমুখী উন্নয়নসহ ব্যাপক জাতীয় ক্ষতি করেন এবং জনবিক্ষোভ বাড়তে থাকে। এই জনবিক্ষোভ দমনে যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শে ১৯৭৮ সালে সামরিক শাসন জারি করা হয়। তখন আন্দোলন ছিল সমাজতন্ত্রী ‘তুদেহ পার্টি’ ইসলামপন্থি ‘ন্যাশনাল ফ্রন্ট’। রেজা শাহর রাজতন্ত্র গণভোটের আয়োজন করে ১৯৭৯ সালে। জনগণ তখন এতই ত্যক্ত-বিরক্ত ছিল যে, তারা প্যারিসপ্রবাসী আয়াতুল্লাহ রুহুল্লা খোমেনিকে বিপ্লবের নেতা হিসেবে মেনে এগিয়ে যান এবং এটা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত পর্যায়ের বিপক্ষে। তারা এটি সমর্থন করেনি বলে রাজতন্ত্র থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরের পক্ষে-বিপক্ষে ১৯৭৯ সালে আবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পক্ষে ৯৯ দশমিক ৩১ শতাংশ ভোট পড়ে। রেজা শাহ ক্যানসার চিকিৎসার নামে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন। যুক্তরাষ্ট্র ধারণা করেছিল, এই ‘ক্যানসার’ নাটক তাকে আবার ক্ষমতাসীন করতে পারবে। এ কারণে এবং আশঙ্কায় ১৯৭৯ সালেই ইরানি ছাত্ররা তেহরানে আমেরিকান দূতাবাস দখল করে ‘দূতাবাস গুপ্তচরের আস্তানা’ বলে প্রচার চালায়। ৫২ জন জিম্মিকে ১৯৮১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ৪৪৪ দিন জিম্মি—অর্থাৎ আটক করে রাখে। এই চরম আঘাত এবং পরাজয় যুক্তরাষ্ট্র মেনে নিতে পারেনি। এছাড়া আমেরিকান দালাল এবং সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত অসংখ্য ইরানিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় ১৯৮১-৮২ সালের মধ্যে। এই ইরানিরা বাস্তবেই যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে কাজ করছিল। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসবিদরা বলেন, এসব ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র হেন কোনো পথ নেই, যার চেষ্টা চালায়নি।

যুদ্ধ, অবরোধ, নিষেধাজ্ঞার কবলে ইরান

ইরানি ইসলামি প্রজাতন্ত্র যখন পুনর্গঠনে ব্যস্ত, তখন যুক্তরাষ্ট্রের মদতে এবং অর্থায়নে ইরাক হামলা চালায় ইরানে, ১৯৮০ সালে। যুদ্ধে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন ইরানের খুজিস্তানে হামলা চালায়। এতে ইরান অবাক হয়ে যায় এ কারণে যে, ইরাকের পক্ষ থেকে কোন লক্ষ্যে এবং উদ্দেশ্যে হামলা করা হলো। তবে পরে তথ্য বেরিয়ে আসে, ইরাককে গোয়েন্দা তথ্য, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং বিশেষ বাহিনীর প্রশিক্ষণ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে থাকা ২৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ মওকুফ করা ছাড়াও নানাভাবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অর্থ সাহায্য দেওয়া হয়। ইরাক ‘ভাড়াটে দেশ’ হিসেবে—অর্থাৎ ইরানকে আক্রমণ বাবদ আরব দেশগুলো থেকে কমপক্ষে ৫০ বিলিয়ন ডলার চাঁদা উঠিয়ে দেয়। পরে ঘটনা জানাজানি হলে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্র এ বিষয়ে অনেক ভয়ংকর অজানা তথ্য জানায়। যুক্তরাষ্ট্র ওই সময় ইরানের বিরুদ্ধে ইরাকসহ বিভিন্ন পক্ষকে যে অস্ত্র সরবরাহ করে, তা পরবর্তীকালে ‘ইরান কন্ট্রা’ কেলেঙ্কারি হিসেবে কুখ্যাত।

যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কতটা কুৎসিত এবং জঘন্য কৌশল নিতে পারে, তা ভাবনারও অতীত। বিষয়টি উল্লেখ করা প্রয়োজন। ১৯৯০ সালের ২ আগস্ট ইরাক এবং কুয়েতকে ইচ্ছাকৃত বিরোধে জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরাক কমপক্ষে ৫৭০ কোটি ডলার ভাগাভাগি করে। উভয়কে যুদ্ধে জড়ায় আমেরিকা। কুয়েত মুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গঠিত হয় জোট। ব্যয় হয়ে যায় ৬৭৬ বিলিয়ন ডলার। কুয়েতের ১ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ স্বর্ণ এবং ডলারসহ নানা সম্পদ ব্যাংক থেকে লুট করা হয়। এমনকি জার্মানি, জাপানসহ মধ্যপ্রাচ্যের নয়, এমন দেশগুলোকেও কমপক্ষে তৎকালীন ৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলার চাঁদা হিসেবে দিতে হয়। বর্তমান পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্র কুয়েতকে কৌশলে চাপ দিয়ে অর্থ ক্ষতি হিসেবে ৫২ বিলিয়ন পাইয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে নেয় ৫৪ বিলিয়ন ডলার। যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার জন্য তেল কোম্পানিগুলোর আয় এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এ অবস্থাকে স্রেফ ‘বাটপাড়ি’ ছাড়া আর কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। এখানে উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো কত দিয়েছে, তার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। তবে অঙ্কটা যে বিশাল, তাতে সন্দেহ নেই। এবার ইরান প্রসঙ্গে আশা যাক—

হরমুজ-প্রণালী

ইরানের ওপরে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা

১৯৭৯ সালের ইরানি ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং এর প্রভাবে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে শত শতবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে দেশটির ব্যক্তিবিশেষ বা প্রতিষ্ঠানের ওপর। একে বলা হয়, Sanction বা নিষেধাজ্ঞা।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ধরনটা হচ্ছে এমন যে, যুক্তরাষ্ট্র যেহেতু বিশ্বমোড়ল এবং একচ্ছত্র আধিপত্যবাদী শক্তি, সে কারণে নিষেধাজ্ঞা দিলে দীর্ঘ এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়ে ইরান। অর্থাৎ ইরান থেকে কেউ তেল কিনতে পারবে না। আন্তর্জাতিক খোলাবাজার ব্যবস্থা বন্ধ, ডলারের বিপরীতে মুদ্রা হিসেবে ইরানি মুদ্রা চলবে না এবং কেউ পণ্য বিক্রি করতে পারবে না—ইত্যাকার নানা অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম। যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোলের (ওএফএসি) দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চলে নির্বাহী আদেশ এবং কার্যক্রমে। বর্তমানেও ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে। গত বছর ২৮ আগস্ট এই ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়।

বিভিন্ন সময় নিষেধাজ্ঞার কারণ থাকে ভিন্ন ভিন্ন। বর্তমানে চলছে পারমাণবিক কর্মসূচি এবং বৈদেশিক সম্পর্কে সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টির জন্য। এবার তেল, পেট্রো কেমিক্যাল। আর্থিক এবং বাণিজ্যিক খাতকে কালো তালিকাভুক্তি, জাহাজ চলাচল সীমিত এবং ইরানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক লেনদেন স্থায়ীভাবে বন্ধ করার উদ্দেশ্যে। ব্যাংক খাতে আরোপিত হয়েছে ‘শ্যাডো ব্যাংকিং’ প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থায়ীভাবে কালো তালিকাভুক্ত করা।

এ বিষয়গুলো বুঝতে গেলে বুঝতে হবে ‘পেট্রোডলার’ অর্থনীতি। বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে তেল নিয়ে যা ঘটছে, তা এই পেট্রোডলার অর্থনীতিকে ঘিরে।

যুদ্ধটা পেট্রোডলার না, পেট্রো-ইউয়ানের?

ইরানের ওপরে অসংখ্যবার নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে এবং বর্তমানেও ঘটছে। যুদ্ধের প্রকৃত কারণ বিশ্লেষণে দেখা যাবে এটি আসলে কর্তৃত্ব এবং আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই। বিশ্বের এক নম্বর শক্তি কে হবে—তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠার।

এই আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চালু রয়েছে বিশ্বব্যবস্থা বা ওয়ার্ল্ড অর্ডার। এই কথিত ওয়ার্ল্ড অর্ডারের নামে বিশ্বকে প্রধানত দ্বিমেরুকেন্দ্রিক—অর্থাৎ দুটি প্রভাবশালী পরাশক্তি—অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র বলয় বনাম সোভিয়েত বলয়ে বিভক্ত করা হতো। বিশ্বখ্যাত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বব্যবস্থা-সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বব্যবস্থা হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি মৌলিক ধারণা, যার দৃষ্টিতে বৈশ্বিক ঘটনাবলি, পররাষ্ট্রনীতি, বিশ্ব স্থিতিশীলতা এবং বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখা যায়। এর বেশি কিছু নয়। ১৮১৫ সালের ভিয়েনা কংগ্রেসের মাধ্যমেই এই ধারণার জন্ম। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বমোড়ল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে।

যদিও হেনরি কিসিঞ্জার ২০১৪ সালে তার বিখ্যাত গ্রন্থ World order-এ বলেছেন, আসলে বিশ্বব্যবস্থা বলে কখনোই কিছু ছিল না। তিনি চীনা, ইসলাম, ইউরোপ এবং আমেরিকান সভ্যতা বা ব্যবস্থাকে ‍শৃঙ্খলার সংঘাতের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বৈধতার সংকট থেকেই এ ব্যবস্থার সৃষ্টি।

তবে রাজনৈতিক ইতিহাসবিদ জনাথন এম হাউস তার The Military History of the New World Disorder—বইয়ে বলেছেন, বিষয়টি মূলত ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরেই বিশ্ব অব্যবস্থা জোরালো হয়।

ন্যাটোর অনৈক্য

যদিও সোভিয়েত ইউনিয়নের টিকে থাকার সময়ও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যবস্থায় মোড়লিপনা করার জন্য ১৯৪৯ সালে বিশ্বের বৃহৎ শক্তি যেমন যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা, ইতালিসহ প্রথমে ১২টি এবং বর্তমানে ৩২টি দেশ নিয়ে ন্যাটো বা নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন গঠন করে। যুক্তরাষ্ট্র হয় এর প্রধান মোড়ল। ন্যাটো গঠনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে—এই সংস্থার কোনো একটি দেশ যদি যুদ্ধে আক্রান্ত হয়, তাহলে সব সদস্যরাষ্ট্র ওই যুদ্ধে আক্রান্ত হয়েছে বলে গণ্য করে অংশ নেবে ন্যাটো (আর্টিকেল-৫)। আর এ লক্ষ্যে ন্যাটোকে জিডিপির ২ শতাংশ হারে অর্থ দেবেন সদস্যরা।

১৯৫৪ এবং ৫৫ সালে এশিয়ায় সেন্টো, সিয়াটো নামে প্রায় অনুরূপ দুটি সামরিক জোট গঠিত হয়েছিল এবং পাকিস্তানের খুবই সক্রিয় সদস্য ছিল। এগুলো বহু আগেই মৃত।

ন্যাটো নিয়ে আলোচনা এই কারণে যে, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ধরেই নিয়েছিল ন্যাটোভুক্ত সব দেশকে তার পাশে—অর্থাৎ যুদ্ধের সাথি হিসেবে পাবে। কিন্তু ঘটনা ঘটেছে উল্টো। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ন্যাটো সদস্যকে তো পায়ইনি, বরং ২০২৬-এর এপ্রিলের প্রথমেই ৩১টি ন্যাটোভুক্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে আলাদা বৈঠক করেছে। এটি ইরানের জন্য বিশাল এক জয়। যুদ্ধবাজ যুক্তরাষ্ট্র এখন একা এবং একাকী।

প্রাথমিকভাবে ওই বৈঠকে ‘হরমুজ’ প্রণালির সংকট কূটনৈতিকভাবে মোকাবিলার চেষ্টা করছে বলে বলা হয়। তবে ইরান বলছে, ডলারে নয়, হরমুজ প্রণালি পার হতে দিতে হবে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে। যতদূর জানা গেছে, আটটি দেশ ইউয়ানে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার লক্ষ্যে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছে। কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে খুব দ্রুত, ভাঙনের দ্বারপ্রান্তে ন্যাটো। নয়া এক বিশ্বব্যবস্থার পথে বিশ্ব। কারণ ন্যাটোসহ কোনো দেশই এখন আর নিরাপত্তা প্রতিরক্ষা এবং অর্থব্যবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা রাখতে পারছে না। শক্তিশালী হয়ে উঠছে চীনের মুদ্রা ইউয়ান। পেট্রোডলার সিস্টেম কি সে বিষয়ে আলোচনা জরুরি?

পেট্রোডলার কী

১৯৬০-এর শেষ এবং ৭০-এর প্রথমদিকে ডলার ছাপাতে হতো ‘স্বর্ণ রূপান্তর’ যোগ্যতার ভিত্তিতে। ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিক্সন স্বর্ণমান ব্যবস্থার পতনের পর ওই স্বর্ণ রূপান্তর যোগ্যতা ব্যবস্থা বাতিল করেন। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কঠিন সংকটের মুখে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। একে বলা হয় ‘নিক্সন শক’। এ অবস্থায় স্বর্ণের বিপরীতে অর্থাৎ রূপান্তরত যোগ্যতার ভিত্তিতে নতুন কিছু করা দরকার ছিল বলে তারা মনে করে।

এ অবস্থায় ১৯৭৪ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এক ‘ঐতিহাসিক’ চুক্তি করে, যাতে ডলারের বিপরীতে তেল হয়ে যায় রূপান্তরযোগ্য মাধ্যম। ১৯৭৩ সালে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সংস্থা ওপেকের সঙ্গে ইসরাইল ইস্যুতে ঝামেলা সৃষ্টি হয় এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় মিটিয়ে ফেলা হয়। এ অবস্থায় সৌদি আরবসহ ওপেক সদস্যরা ১৯৭৪ সাল থেকেই সিদ্ধান্ত নেয় যে, শুধু ডলারেই তেল বিক্রি হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে তাদের পুরো আয় যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সিকিউরিটিকে আবার বন্ড হিসেবে বিনিয়োগ শুরু করে। শুধু তাই নয়, তেল রপ্তানির মাধ্যম হিসেবে আর স্বর্ণ নয়, ডলার ব্যবহৃত হবে। এভাবেই পেট্রোডলার—অর্থাৎ ডলার বিবেচিত হয় এক অভিন্ন মুদ্রায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিপ্রবাহে বিপুল পরিমাণ ডলার আসা নিশ্চিত হয়। এছাড়া শুধু তেল কেনা নয়, বৈশ্বিক লেনদেনের মাধ্যম হয়ে যায় ডলার।

চীন এখন চেষ্টা চালাচ্ছে ইউয়ানকে ডলারের স্থানে প্রতিস্থাপনের। চীন ইতোমধ্যে ইউয়ানে ইরান থেকে তেল কিনছে। আরো কয়েকটি দেশ হরমুজ প্রণালিতে টোল হিসেবে ইউয়ান ব্যবহার শুরু করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র বাদে ন্যাটোর ৩১টি প্রভাবশালী দেশ যদি গোপনেও ইউয়ান ব্যবহার শুরু করে, তাহলে ধসে যাবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি।

যুক্তরাষ্ট্র তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এমনিতেই অভ্যন্তরীণভাবে ক্ষয়ে পড়ছে। জাতীয় ঋণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার। এ অবস্থায় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং গবেষণা সংস্থা বলছে, ইরানের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম ছয় দিনেই ব্যয় ১২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিজ লন্ডন গার্ডিয়ানের সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যুদ্ধ চললে বা ইতোমধ্যে করা ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সৃষ্টি হতে পারে ‘এক মহামন্দা’। যার ধরন হবে স্ট্যাগফ্লেশন বা নিশ্চলতা স্ফীতি—অর্থাৎ উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, নিম্নগতির প্রবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা। যাকে স্টিগলিজ বলেছেন, অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাববিস্তারী এবং অশান্ত ও করালগ্রাসী।

যুক্তরাষ্ট্র কী এত বড় সংকটের ওপরে আরেকটি যুদ্ধের পরে টিকে থাকার সক্ষমতা রাখে? না, এখানেই শেষ হবে পেট্রোডলারের, উত্থান হবে ইউয়ানের। যুদ্ধ কি এমন বার্তাই দেয়?

লেখক : গবেষক এবং নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাবিশ্লেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন