অদম্য ইরানের নৈতিক বিজয়

মাসুম বিল্লাহ

অদম্য ইরানের নৈতিক বিজয়

দানবীয় সামরিক শক্তির অধিকারী ইসরাইল ও তার প্রধান পৃষ্ঠপোষক আমেরিকা ৪১ দিন আগে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর অসম ও অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল। শক্তিমত্তায় ইরান বেশ পিছিয়ে থাকলেও ভড়কে যায়নি। সাহসের সঙ্গে লড়াই করেছে দুই আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি তছনছ করেছে ইরানের ড্রোন আর ক্ষেপণাস্ত্র। মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সেনা অবকাঠামোর ৯৫ শতাংশ ধ্বংসের দাবি করেছে ইরান। ইসরাইলের ভিতও কাঁপিয়ে দিয়েছে। ইহুদি রাষ্ট্রটির গর্ব আয়রন ডোম ভেদ করে একের পর এক ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে তেল আবিবসহ বিভিন্ন শহরে। আরবের রাজতান্ত্রিক ও আমেরিকার গৃহপালিত সরকারগুলোর মসনদও নড়বড়ে করে দিয়েছে ইরান। সামরিক শক্তির চেয়েও শক্তিশালী ছিল তেহরানের নেতৃত্বের নৈতিক শক্তি। অবশেষে ইরানের অকুতোভয় লড়াইয়ের কাছে পরাস্ত হয়েছে আমেরিকা ও ইসরাইল। যুদ্ধবিরতিতে যেতে বাধ্য হয়েছেন আমেরিকার যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বিজ্ঞাপন

এর আগে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানকে দেওয়া ট্রাম্পের সময়সীমার শেষ মুহূর্তে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় দেশ দুটি। এতে মধ্যস্থতা করে পাকিস্তান। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরপরই ইরান এবং আমেরিকা নিজেদের বিজয়ী বলে দাবি করে। তবে আমেরিকা ও ইসরাইলের ইরান আক্রমণের প্রধান যে উদ্দেশ্য ছিলে, তার কোনোটাই বাস্তবায়িত হয়নি। ইরানের সর্বোচ্চ নেতাসহ শীর্ষস্থানীয় নেতাদের আমেরিকা হত্যা করলেও শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে পারেনি। এমনকি ইরানের দেওয়া ১০ দফার ভিত্তিতেই যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। এ ঘোষণার পরপরই ইরানজুড়ে বিজয়োল্লাসে মাতেন সর্বস্তরের নাগরিকরা।

যুদ্ধবিরতি যেভাবে হলো

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই পাকিস্তান সমস্যা সমাধানে চেষ্টা করে যাচ্ছিল। এজন্য সৌদি আরব, মিসর ও তুরস্কের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছিল ইসলামাবাদ। হরমুজ প্রণালি খুলতে ইরানকে দেওয়া ট্রাম্পের আলটিমেটামের শেষের দিকে সবাই যখন আশা হারিয়ে ফেলছিল, তখনও পাকিস্তান আশার কথা শোনাচ্ছিল। যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টা আগে পাকিস্তানের একটি সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছিল, আলোচনা ‘দ্রুতগতিতে’ এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, পাকিস্তানের পক্ষ থেকে খুব ছোট একটি দল আলোচনা পরিচালনা করছে।

মূলত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছিল পাকিস্তান। দুপক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছিল তারা। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ইরান এবং কৌশলগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে।

সমঝোতার বিষয়ে গত মঙ্গলবার রাতে পার্লামেন্টে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, আমরা খুব আশাবাদী ছিলাম যে, বিষয়গুলো ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু গত সোমবার ইরানে ইসরাইলের হামলা আর সৌদি আরবে ইরানের হামলা ওই আশাবাদে পানি ঢেলে দেয়। তারপরও দার বলেন, পাকিস্তান এখনো যতটা সম্ভব বিষয়গুলো সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। মঙ্গলবার মধ্যরাতের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টাগুলো অবিচলিতভাবে, দৃঢ়ভাবে ও জোরালোভাবে এগোচ্ছে।

তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে চূড়ান্ত সময়সীমা আরো দুই সপ্তাহ বাড়ানো যায় কি না এবং ওই একই সময় হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া যায় কি না, তা ইরানকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোকাদ্দাম স্থানীয় সময় রাত প্রায় ৩টার দিকে এক পোস্টে লেখেন, সংকটজনক ও সংবেদনশীল অবস্থা থেকে এক ধাপ অগ্রগতি হয়েছে।

গতকাল বুধবার ভোর ৫টার ঠিক আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, যুদ্ধবিরতির জন্য সমঝোতা হয়েছে। এছাড়া চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আরো আলোচনা করতে দুপক্ষকে আগামীকাল শুক্রবার ইসলামাবাদে বৈঠকের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে যুদ্ধরিবতি হলেও তা স্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। কারণ দুপক্ষ এখনো একে অপরকে বিশ্বাস করে না। তাছাড়া ইসরাইল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করতে পারে।

ইরানের যে ১০ শর্তে যুদ্ধবিরতি

যুদ্ধবিরতির পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আগে ইরানের পক্ষ থেকে তার কাছে ১০টি শর্ত উপস্থাপন করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।

তিনি লেখেন, পাকিস্তান সরকারের অনুরোধ এবং ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া ১০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, এ প্রস্তাব আলোচনার একটি কার্যকর ভিত্তি হতে পারে। ইরানের দেওয়া ১০ শর্তের মধ্যে রয়েছেÑইরান ও তার মিত্রদের ওপর পুনরায় হামলা না হওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকা, ইরানের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিতে বাধা না দেওয়া, ইরানের ওপর থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সব সম্পদ ও সম্পত্তি অবিলম্বে ফেরত দেওয়া, ইরানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তোলা সব প্রস্তাব বাতিল করা, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রস্তাবগুলোও বাতিল করা, ইরানকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার। এছাড়া লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা। ইরানের গণমাধ্যমের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এসব শর্ত মেনে নিয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র সেটি নিশ্চিত করেনি।

তবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে উভয়পক্ষ একমত বলে জানিয়েছে বিবিসি। সেই সঙ্গে ইউরোনিয়াম সমৃদ্ধ করলেও সেটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে তেহরান। ইরানে এখন পর্যন্ত যতটুকু পরমাণু সমৃদ্ধ করা হয়েছে, সেগুলো ‘যথোপযুক্তভাবে দেখভালে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সেটা না হলে আমি মীমাংসা করতাম না। যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পর বার্তা সংস্থা এএফপিকে এ কথা বলেছেন ট্রাম্প।

এর আগে মার্চের শেষ দিকে পাকিস্তানের মাধ্যমে ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা পাঠিয়ে সেগুলো মেনে নেওয়ার জন্য ইরানের শাসকদের প্রতি আহ্বান জানান ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও ইরান তখন সেটি প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্তু যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ইরান সরকারের একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে হোয়াইট হাউস। সেখানে ইরানের ১০ দফা শান্তি প্রস্তাবের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্পের ওই পরিকল্পনা বিস্তারিত জানা যায়নি।

ইসলামাবাদ আলোচনায় থাকছেন যারা

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে আরো আলোচনার জন্য’ আগামীকাল শুক্রবার ইসলামাবাদে বৈঠক ডেকেছে পাকিস্তান। সেখানে উভয়পক্ষের প্রতিনিধিদলকে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন শাহবাজ শরিফ। ওই বৈঠকের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতা’ ফিরবে বলে আশা করছেন তিনি।

এ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলে নেতৃত্ব দিতে পারেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার বাকের কালিবাফের থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

তেহরানে বিজয়োল্লাস

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির খবর ছড়িয়ে পড়লে ইরানের রাজধানী তেহরানের রাজপথে নেমে উল্লাস করেন বাসিন্দারা। স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার ভোরে তেহরানের পথে পথে মিছিল হয়, স্লোগান মুখরিত হয়। যুদ্ধ আপাতত থেমে যাবেÑএমন সম্ভাবনায় উচ্ছ্বাস দেখা গেছে তেহরানের বাসিন্দাদের মধ্যে। তেহরান ছাড়াও দেশের অন্যান্য শহরেও বিজয় মিছিল করেন ইরানিরা।

কোন দেশে কতজন নিহত

ইরান যুদ্ধ শুরুর পর গতকাল পর্যন্ত কতজন নিহত হয়েছে, তা প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। জবাবে পাল্টা হামলা শুরু করে তেহরান। এতে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে হাজার হাজার মানুষ নিহত হন, যার বেশিরভাগই ইরান ও লেবাননের।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানে তিন হাজার ৬৩৬ জন নিহত হয়েছেন। শুধু মেয়েদের বিদ্যালয়ে হামলায় একসঙ্গে নিহত হয় প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী। অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি বলেছে, ইরানে অন্তত এক হাজার ৯০০ জন নিহত হয়েছেন।

লেবানন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় এক হাজার ৫৩০ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১২৯ জন শিশু। এদিকে দক্ষিণ লেবাননে পৃথক দুটি ঘটনায় ইন্দোনেশিয়ার তিনজন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী নিহত হয়েছেন।

ইরাকের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, সংকট শুরুর পর থেকে দেশটিতে অন্তত ১১৭ জন নিহত হয়েছেন। ইরান ও লেবানন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রে ইসরাইলে ২৩ জন নিহত হয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ লেবাননে ১১ ইসরাইলি সেনা নিহত হয়। অন্যদিকে যুদ্ধে ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং তিন শতাধিক আহত হন।

সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে ১৩ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে দুজন সেনাসদস্য রয়েছেন। অন্যদিকে গত ২২ মার্চ কাতারে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একটি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় সাতজন নিহত হন। এছাড়া কুয়েতে সাতজনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় পশ্চিম তীরে চার ফিলিস্তিনি নারী নিহত হয়েছেন। সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সুয়েইদায় একটি ভবনে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে চারজন নিহত হন। বাহরাইনে পৃথক দুটি ইরানি হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন। ১৩ মার্চ ওমানের সোহার প্রদেশের একটি শিল্পাঞ্চলে ড্রোন হামলায় দুজন নিহত হন। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের দক্ষিণ-পূর্বে আল-খারজ শহরের একটি আবাসিক এলাকায় প্রজেক্টাইলের আঘাতে দুজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া উত্তর ইরাকে ড্রোন হামলায় এক ফরাসি সেনা নিহত হন।

যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানাল জাতিসংঘ

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য সব পক্ষকে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মুখপাত্র বিবৃতিতে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে জড়িত সব পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তাদের বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে এবং এ অঞ্চলে একটি স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ শান্তির পথ প্রশস্ত করতে যুদ্ধবিরতির শর্তাবলি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব।

যুদ্ধবিরতির ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজের কার্যালয় বিবৃতিতে বলেছে, অস্ট্রেলিয়া চায় যুদ্ধবিরতি বহাল থাকুক এবং সংঘাতের একটি সমাধান হোক।

নিউজিল্যান্ড যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানালেও সতর্ক করে বলেছে, শান্তি নিশ্চিত করতে এখনো ‘গুরুত্বপূর্ণ কাজ’ বাকি আছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্সের মুখপাত্র বিবৃতিতে এ কথা বলেন।

যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে জাপান বলছে, সংকট নিরসনে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রয়োজন, যার মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌযানের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করাও অন্তর্ভুক্ত।

ইরাকের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা এই যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানাচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ এবং টেকসই সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে দেশটি।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়া সব পক্ষকে অভিনন্দন জানান। যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান চান। একইসঙ্গে সমুদ্রপথ ব্যবহারে আন্তর্জাতিক আইন মানার জন্য ইরানকে আহ্বান জানান।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে বিবৃতিতে বলেছে, এই সংঘর্ষ ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী মানুষকে অনেক ভুগিয়েছে। আমরা আশা করব, হরুমজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। এছাড়া চীন, ফ্রান্স, ইন্দোনেশিয়া, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছে।

যুদ্ধবিরতির মধ্যেও লেবাননে ইসরাইলি হামলা, নিহত ২৫৪

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের দুই সপ্তাহের জন্য হামলা স্থগিত করার সিদ্ধান্তকে ইসরাইল সমর্থন জানালেও এ যুদ্ধবিরতি লেবাননের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে নেতানিয়াহু বলেন, ইসরাইল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সে প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে, যার লক্ষ্য হলো ‘ইরান যেন আর আমেরিকা, ইসরাইল, ইরানের আরব প্রতিবেশী এবং বিশ্বের জন্য পারমাণবিক, ক্ষেপণাস্ত্র ও সন্ত্রাসী হুমকি হয়ে না থাকে।’

তবে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, এ দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়। এর মধ্যে গতকাল লেবাননজুড়ে প্রচণ্ড হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী। লেবাননের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, হামলায় অন্তত ২৫৪ জন নিহত ও এক হাজার ১৬৫ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু রাজধানী বৈরুতেই ৯২ জন নিহত ও ৭৪২ জন আহত হন।

যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ বা যুদ্ধবিরতি বেছে নিতে হবেÑআরাকচি

এদিকে গতকাল ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়েদ আব্বাস আরাকচি টেলিগ্রামে এক বার্তায় বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই ইসরাইলের কারণে যুদ্ধ অব্যাহত রাখা অথবা যুদ্ধবিরতি বেছে নিতে হবে।

তিনি বলেন, ‘ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতির শর্ত পরিষ্কার ও স্পষ্ট। আমেরিকাকে অবশ্যই হয় যুদ্ধবিরতি অথবা ইসরাইলের মাধ্যমে ধারাবাহিক যুদ্ধ বাছাই করতে হবে। দুটো কখনো একসঙ্গে চলতে পারে না।’

আরাকচি বলেন, ‘বিশ্ব লেবাননে হত্যাযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করছে। এখন বল আমেরিকার কোর্টে এবং বিশ্ব সম্প্রদায় প্রত্যক্ষ করছে এ দেশ তাদের প্রতিশ্রুতি রাখবে, কী রাখবে না।’

এছাড়া ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) পক্ষ থেকে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইসরাইল যদি লেবাননে হামলা বন্ধ না করে, তবে এজন্য ‘অনুশোচনাকর জবাব’ দেওয়া হবে।

তেলের দামে বড় পতন

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরপরই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির খবরে মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১৬ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৪.৫৯ ডলারে নেমে এসেছে। একইভাবে ব্রেন্ট ক্রুডের দামও প্রায় ১৫ শতাংশ কমে ৯২.৩৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে এশিয়ার শেয়ারবাজারে বড় উত্থান দেখা গেছে। নিক্কেই সূচক প্রায় পাঁচ শতাংশ বেড়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম কমলেও তা এখনো ফেব্রুয়ারির শেষদিকের তুলনায় অনেক বেশি অবস্থানে রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা অবকাঠামোর ৯৫ শতাংশ ধ্বংস

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তাসনিম নিউজ এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক সম্পদের বিশাল একটি অংশ ধ্বংস হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ৯৫ শতাংশ মার্কিন সেনার অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ঘাঁটি, যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং এ সম্পর্কিত অবকাঠামো।

ইরানে ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা

যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানে ১৩ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ৮০ শতাংশ, প্রচলিত নৌবহরের ৯০ শতাংশের বেশি এবং অস্ত্র কারখানার প্রায় ৯০ শতাংশ ধ্বংস করেছে। তিনি আরো বলেন, ইরানের বড় ধরনের সমুদ্রভিত্তিক যুদ্ধজাহাজ পুনর্গঠন করতে বহু বছর সময় লাগবে।

‘প্রস্তর যুগে প্রত্যাবর্তন’ থেকে ‘সোনালি যুগ’

হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলোতে হামলার হুমকি দিচ্ছিলেন। তিনি এক ভাষণে ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ ফেরত পাঠানোর সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে আমরা তাদের প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেব, যেখানে তাদের থাকা উচিত। তবে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ার পর তার কথা পরিবর্তন করেছেন। তিনি বলেছেন, এটি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য ‘সোনালি যুগ’ হতে পারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন