সাইমন স্পিকম্যান কর্ডালের বিশ্লেষণ

নির্বাচনে নেতানিয়াহু হারলে ইসরাইলে কী পরিবর্তন আসবে

নির্বাচনে নেতানিয়াহু হারলে ইসরাইলে কী পরিবর্তন আসবে

ইসরাইলে আজ মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে জাতীয় নির্বাচন। দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনে আবারও ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করছেন দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে তার নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি জোটের সঙ্গে বিরোধী শিবিরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ কঠিন হয়ে উঠেছে। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত জরিপে দুই পক্ষের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলেছে। এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষেরই স্পষ্ট এগিয়ে থাকার চিত্র পাওয়া যায়নি।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলার পর এটিই দেশটির প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ওই হামলার পর গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান এবং পরবর্তী সময়ে লেবানন, ইরান, ইয়েমেন, সিরিয়া ও কাতারে ইসরাইলি হামলাকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। এসব ঘটনার প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা, সরকারের জবাবদিহি, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরাইলের নীতি নির্বাচনি আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

এই নির্বাচন শুধু নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; বরং ইসরাইলের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে নীতি এবং দেশটির রাজনৈতিক গতিপথ সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেবে।

ক্ষমতা ধরে রাখতে চান নেতানিয়াহু

ইসরাইলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবারও ক্ষমতায় থাকার লড়াইয়ে নেমেছেন। তার নেতৃত্বাধীন লিকুদ পার্টি ও ক্ষমতাসীন জোটে কট্টর ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী এবং অতি-গোঁড়া ইহুদিধর্মীয় দলগুলো রয়েছে।

তবে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখেও রয়েছেন নেতানিয়াহু। গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখে রয়েছেন তিনি। এ ছাড়া ঘুষ, জালিয়াতি ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতির বিচারও রাজনৈতিক বিতর্কের অন্যতম বিষয়। নেতানিয়াহু এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে ও পরে নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে তার সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন রয়েছে। নির্বাচনি প্রচারে এসব ব্যর্থতার দায়, অতি-গোঁড়া ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ এবং আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোকে সম্ভাব্য সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।

ইসরাইলের রাজনীতিতে ডানপন্থিদের প্রভাব বাড়ছে

ইসরাইলের রাজনীতিতে ডানপন্থিদের উত্থান শুধু নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক সরকারের সময় শুরু হয়নি। ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়ার ভাঙন এবং কয়েক দশকের নিরাপত্তা সংকট দেশটির মধ্যপন্থি ও বামপন্থি রাজনৈতিক শক্তিকে ক্রমেই দুর্বল করেছে।

২০১৮ সালে পাস হওয়া ‘জাতিরাষ্ট্র আইন’ এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আইনটিতে ইসরাইলকে ইহুদি জনগণের জাতিরাষ্ট্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। একই সঙ্গে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে বিতর্ক আরো গভীর হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর সর্বশেষ সরকারের আমলে এই ডানমুখী প্রবণতা আরো দ্রুত হয়েছে। সরকারের বিচার বিভাগ সংস্কার পরিকল্পনা সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা সীমিত করার চেষ্টা হিসেবে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে। এ নিয়ে ২০২৩ সালে ইসরাইলে বড় ধরনের বিক্ষোভও হয়েছিল।

সরকারে কট্টর ডানপন্থি নেতা ইতামার বেন-গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচের প্রভাবও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বিচার বিভাগ সংস্কারের প্রতি তাদের সমর্থন নেতানিয়াহুর জোটকে শক্তিশালী করেছে। একই সঙ্গে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বৃদ্ধি নিয়েও তাদের ভূমিকা সমালোচিত হয়েছে।

নেতানিয়াহু হারলে কী পরিবর্তন আসতে পারে?

নেতানিয়াহু নির্বাচনে পরাজিত হলে ইসরাইলের রাজনৈতিক পরিবেশে পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন কিছু বিশ্লেষক। লন্ডনের কিংস কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ও ইসরাইল বিষয়ক বিশ্লেষক আহরন ব্রেগম্যানের মতে, নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিলে শুরুতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হতে পারে রাজনৈতিক পরিবেশ ও নেতৃত্বের ধরনে।

নেতানিয়াহু ইসরাইলের রাজনীতিতে অত্যন্ত বিভাজন সৃষ্টিকারী ব্যক্তিত্ব। তাঁর সমর্থক ও বিরোধী—দুই পক্ষের মধ্যেই তাকে ঘিরে তীব্র আবেগ রয়েছে। ফলে তার বিদায়ের পর রাজনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করেন ব্রেগম্যান।

তবে নেতৃত্ব বদলালেই ইসরাইলের সামগ্রিক নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে, এমনটা মনে করেন না তিনি। তার মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরাইলি সমাজ আরো ডানপন্থি হয়েছে। নতুন সরকার গঠিত হলেও সেই রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন থাকবে।

চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ গবেষক ইয়োসি মেকেলবার্গের মতে, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকার বহাল থাকবে, নাকি বিরোধীরা ক্ষমতায় আসবে—সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে ইসরাইলের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎও জড়িত।

ফিলিস্তিনিদের অধিকার কি নির্বাচনের কেন্দ্রে?

ইসরাইলের নির্বাচনে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকলেও ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও গাজায় যুদ্ধের দায় নিয়ে মৌলিক নীতিগত পরিবর্তনের প্রত্যাশা কম। বিশ্লেষকদের মতে, মূলধারার প্রার্থীদের মধ্যে নেতানিয়াহুর বিরোধীরা সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্বের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও ফিলিস্তিনিদের প্রতি রাষ্ট্রীয় নীতির মৌলিক পরিবর্তনের দাবি জোরালোভাবে সামনে আনেননি।

গাজায় এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটছে। একই সময়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও সেনা অভিযান বেড়েছে।

ইসরাইলি সমাজবিজ্ঞানী ইয়েহুদা শেনহাভ-শাহরাবানির মতে, দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থা এমন একটি কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে ইহুদিদের আধিপত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। তার বক্তব্য, নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে যারা নিজেদের উপস্থাপন করছেন, তাদের কাউকেই প্রকৃত বামপন্থী বলা কঠিন।

তার মতে, ইহুদি ও ফিলিস্তিনিদের সমান রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার মতো দ্বিজাতিক রাষ্ট্রের কোনো বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠিত না হলে ফিলিস্তিনিদের অধিকার সীমিত করার প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।

আরব দলগুলোকে সরকারে নেওয়ার প্রশ্ন

ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক। কিন্তু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মূলধারার নেতারা সম্ভাব্য সরকারে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেননি।

ইসরাইলের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যমে রা'আম ও জয়েন্ট লিস্টের নেতাদের সঙ্গে সম্ভাব্য জোটের বিষয়টি প্রায়ই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের একে অপরকে আক্রমণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

শেনহাভ-শাহরাবানির মতে, সরকার গঠনের ক্ষেত্রে অতি-গোঁড়া ইহুদি দলগুলোর অংশগ্রহণ গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হলেও ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী আরব দলগুলোকে বাইরে রাখার প্রবণতা দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বৈষম্যের প্রতিফলন।

অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর বিরোধীরা মূলত সরকারের দক্ষতা, নিরাপত্তা ব্যর্থতা এবং জবাবদিহির প্রশ্নে তার সমালোচনা করেছেন। গাজায় যুদ্ধের বৈধতা বা ফিলিস্তিনিদের প্রতি রাষ্ট্রীয় আচরণকে কেন্দ্র করে নির্বাচনকে সরাসরি গণভোটে পরিণত করার মতো অবস্থান তাদের প্রচারে দেখা যায়নি।

ইসরাইল সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড্যানিয়েল লেভির মতে, গাজায় যুদ্ধ ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি আচরণ নিয়ে মূলধারার জায়নবাদী দলগুলোর মধ্যে মৌলিক ঐকমত্য রয়েছে। তাদের মতপার্থক্য মূলত ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়নের ধরন ও দায়িত্ব কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে।

নির্বাচনের ফল কী বার্তা দেবে?

ইসরাইলের এই নির্বাচনকে শুধু নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকা বা বিদায়ের প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি নীতির ভবিষ্যৎ।

তবে নেতানিয়াহুর বিরোধীরা ক্ষমতায় এলেও ইসরাইলের সামগ্রিক পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, দেশটির রাজনৈতিক পরিসর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরো ডানপন্থি হয়েছে।

ফলে নির্বাচনের ফল সরকার পরিবর্তনের পথ তৈরি করলেও গাজা যুদ্ধ, পশ্চিম তীরে দখলদারত্ব এবং ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে ইসরাইলের অবস্থানে কতটা পরিবর্তন আসবে, সেটিই থাকবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন