কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমে নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) মেগা প্রকল্পটি দেশের কোনো কাজে আসছে না। ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্মিত এ প্রকল্প এখন সরকারের গলার কাঁটা।
সাগরে অবস্থানকারী বড় ট্যাংকার থেকে পাইপের মাধ্যমে সরাসরি জ্বালানি তেল খালাস করতে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ৮ হাজার কোটি টাকার এই ভাসমান মুরিং এখন সরকারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনীয় স্টোরেজ না থাকা এবং পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণকারী নিয়োগ নিয়ে জটিলতার কারণে এই মেগা প্রকল্প এখন সরকারের গলার কাঁটা হিসেবে দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার ঋণের বোঝা এখন নতুন সরকারের কাঁধে। এখন পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণকারী নিয়োগের দরপত্র নিয়েও চলছে বিতর্ক। একটি পক্ষ পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের পছন্দের লোকদের এ দায়িত্ব দিতে চাইছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৫ সালে মেগা প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল। যথাযথ সমীক্ষা ও উপযোগিতা যাচাই-বাছাই না করেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। কর্ণফুলী টানেলের মতোই এসপিএম প্রকল্পটিকে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের একটি অপরিকল্পিত উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। এটি যাতে ব্যবহারের উপযোগী করা যায়, সে বিষয়ে সরকার নতুন করে ভাবছে। কোনো ধরনের অনিয়ম ও বিচ্যুতি হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা।
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ‘মেগা প্রকল্প’ রোগে আক্রান্ত ছিল। দেশজুড়ে বড় বড় যেসব প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, তার অধিকাংশই জনস্বার্থে নেওয়া হয়নি। কর্ণফুলী টানেল, হাওর এলাকার জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে অলওয়েদার সড়ক, বিভিন্ন এলাকায় আইটি পার্কের মতো এসপিএম প্রকল্পটিও ছিল অনেকটা রাজনৈতিক। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের লুণ্ঠননীতির অংশ হিসেবে হাসিনা সরকার এ প্রকল্প হাতে নিয়েছিল— এমন অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের। শুরুতেই এটি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন বলেও জানান তারা।
এসপিএম প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, এ প্রকল্পের মাধ্যমে সমুদ্রে অপেক্ষমাণ বড় ট্যাংকার থেকে পাইপের মাধ্যমে সরাসরি জ্বালানি তেল খালাস করার মতো উপযোগী করা হয়েছে। প্রকল্পের নির্মাণকাজ করে চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড (সিপিপিইসি)। প্রকল্পের অবকাঠামোতে মহেশখালী দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমে ভাসমান মুরিং স্থাপন করা হয়েছে। সাগরের তলদেশে ১১০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে, যা মহেশখালী স্টোরেজ ট্যাংক থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারি পর্যন্ত পৌঁছেছে। এছাড়া পাম্পিং স্টেশন, তিনটি অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল ট্যাংক, বুস্টার পাম্প এবং জেনারেটরও রয়েছে।
মাথাভারী প্রকল্প এসপিএম
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানিয়েছে, ‘ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপ লাইন’ নামের এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি (ইআরপিএলসি)। প্রকল্পের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়, আমদানিকৃত ক্রুড অয়েল এবং এইচএসডি (ডিজেল) সহজে, নিরাপদে, স্বল্প খরচে এবং স্বল্পতম সময়ে মাদার ভেসেল হতে খালাস নিশ্চিত করা যাবে। ক্রুড অয়েল ও ডিজেল ট্যাংক স্থাপনের মাধ্যমে জ্বালানি তেলের মজুত ক্ষমতা বৃদ্ধি ও জোগানের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা যাবে। প্রকল্পটি বাংলাদেশ ও চীন সরকার জিটুজি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করে।
কর্মকর্তারা জানান, ২০১৫ সালে এসপিএম প্রকল্প নেয় ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড। শুরুতে এর ব্যয় চার হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা ধরা হলেও পরবর্তী সময়ে তা বাড়িয়ে আট হাজার ২২২ কোটি টাকা করা হয়। ২০১৮ সালে এ প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়। অর্থায়ন করে এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব চায়না। চীন প্রিফারেন্সিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট বাবদ ৪৬৭ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন এবং সফট লোন বাবদ ৮২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার দেয়। বার্ষিক দুই শতাংশ সুদে ২০ বছরে এ ঋণ পরিশোধ করতে হবে আর গ্রেস পিরিয়ড হচ্ছে পাঁচ বছর।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং কর্ণফুলী নদীর চ্যানেলের নাব্য কম (আট থেকে ১৪ মিটার) হওয়ায় মাদার অয়েল ট্যাংকারগুলো সরাসরি খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে মাদার অয়েল ট্যাংকারগুলো গভীর সমুদ্রে নোঙর করে ছোট ছোট লাইটারেজ ভেসেলের মাধ্যমে ক্রুড অয়েল খালাস করা হয়। এক লাখ টন ধারণ ক্ষমতার ট্যাংকার খালাস করতে ১১ দিন সময় লাগে। বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে লাইটারেজ পদ্ধতিতে তেল খালাস করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ, ঝুঁকিপূর্ণ, ব্যয়বহুল এবং ভবিষ্যৎ চাহিদার বিবেচনায় ও বাস্তবতার নিরিখে সম্ভবপর হবে না। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে লাইটারেজের মাধ্যমে পরিবহন খরচ ও অপচয়সহ প্রতি বছর সরকারের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে বলেও জানান কর্মকর্তারা।
প্রকল্পের প্রস্তাবনায় বলা হয়, ক্রুড অয়েল ও এইচএসডি (হাই স্পিড ডিজেল) খালাসকরণের সময় অনেক কমে যাবে। এতে দেখানো হয়, এক লাখ ২০ হাজার ডিডব্লিউটি (ডেড ওয়েট টনেজ) ক্রুড অয়েল ট্যাংকার খালাস করতে ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগবে আর ৭০ হাজার ডিডব্লিউটি এইচএসডি ট্যাংকার খালাস করতে সময় লাগবে ২৮ ঘণ্টা। বিদ্যমান নিয়মে খালাস করলে যার সময় লাগবে ১০-১৫ দিন।
এসপিএম প্রকল্পটিকে বিগত সরকারের মাথাভারী প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা জানান, বর্তমানে ইআরপিএলসির বার্ষিক ক্রুড অয়েল প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতা দেড় মিলিয়ন টন। প্রস্তাবিত ইআরপিএলসি ইউনিট-২ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ইআরপিএলসির বার্ষিক ক্রুড অয়েল প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়ে হবে সাড়ে চার মিলিয়ন টন। সেক্ষেত্রে এসপিএম প্রকল্পটি ভালোভাবে কাজে আসত। দ্বিতীয় ইউনিটের কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় আট হাজার কোটি টাকার এসপিএম প্রকল্প বেশিরভাগ সময় অলস পড়ে থাকবে।
রক্ষণাবেক্ষণ ঠিকাদার নিয়োগে জটিলতা
২০২৪ সালের আগস্টে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হলেও পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ঠিকাদার না থাকায় এখনো এটি চালু করা যায়নি। এজন্য আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের দুষছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। আমার দেশকে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েই এ মেগা প্রকল্পটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ঠিকাদার হিসেবে একটি সংস্থাকে বাছাই করে রাখা হয়েছিল। এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনাও এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং জ্বালানি বিভাগের দায়িত্বে থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্টদের পলায়নের পর সে আলোচনা থেমে যায়। তবে ওই সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও সুবিধাভোগী কর্মকর্তারা হাল ধরে রাখেন। তাদের ছক অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের ৩০ এপ্রিল আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে দুটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখালেও প্রস্তাবিত মূলধন বিপিসির অনুমিত ব্যয়ের চেয়ে ৫১ শতাংশ বেশি হওয়ায় কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া যায়নি। এরপর ১৭ সেপ্টেম্বর দরপত্র বাতিল করা হয়।
ওই কর্মকর্তা জানান, প্রথম দফার দরপত্র বাতিল হওয়ার পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় দফা দরপত্রের প্রস্তাব জমা দেওয়ার তারিখ নির্ধারণ করা হয়। এটিকে প্রতারণামূলক হিসেবে দেখছেন ওই কর্মকর্তা। তার মতে, জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে এবং নির্বাচনের মাত্র পাঁচদিন পর ও নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার সময়টিকে বেছে নেওয়া উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দরপত্রের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ওই কর্মকর্তা। তিনি জানান, দ্বিতীয় দফায় ১১টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দরপত্র কেনে। নির্বাচনি প্রচারের সময়ে বাংলাদেশে আসার জন্য অন অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা স্থগিত ছিল। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো তাদের নাগরিকদের চলাচলের ওপর ভ্রমণ সতর্কতা জারি করে। এ কারণে অনেক দক্ষ কোম্পানি প্রস্তাব জমা দিতে পারেনি বলে জানান এ কর্মকর্তা। প্রাক-দরপত্র সভায় নেদারল্যান্ডসের স্মিত ল্যামনালকো ও মিসরের মেরিডাইভ অংশ নিয়েও চূড়ান্ত দরপত্রে অংশ নেয়নি। এ দুই প্রতিষ্ঠানসহ দরপ্রস্তাব ক্রয়কারী অধিকাংশ কোম্পানি নির্বাচনের পর দরপত্র গ্রহণের তারিখ রাখার অনুরোধ করলেও তা বিবেচনায় নেয়নি বিগত সরকারের সুবিধাভোগী এ প্রভাবশালী কর্মকর্তারা।
এসপিএম প্রকল্পের বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে আমার দেশকে তিনি বলেন, আমরা জনগণের সরকার হিসেবে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করছি। এ প্রকল্পের বিষয়েও আমরা অধিক গুরুত্ব দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখব। কোনো ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকলে সেটাও খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জ্বালানি খাতকে লুণ্ঠনকারীদের কবল থেকে বের করার তাগিদ
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লুণ্ঠনকারী অলিগার্কদের হাতে চলে গিয়েছিল। সে ধারা থেকে এ খাত এখনো বের হয়নি। এমন মন্তব্য বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলমের। আমার দেশকে তিনি বলেন, এসপিএম বিগত সরকারের একটি মেগা প্রকল্প। এমন প্রকল্পগুলো নেওয়া হয়েছে মেগা লুটপাটের উদ্দেশে। এসব প্রকল্প নেওয়া হয়েছে রাজনৈতিক কারণে ও লুটপাটের উদ্দেশে। যে প্রক্রিয়ায় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, তার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জনগণের স্বার্থে জরুরি ।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের উচিত এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে সঠিকভাবে ভূমিকা নেওয়া। এক্ষেত্রে সরকারকে জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতা দিয়েছে। আশা করছি, সরকার এ প্রকল্পটিসহ এ ধরনের সব প্রকল্পের অনিয়ম ও দুর্নীতি খুঁজে বের করবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

