নোয়াখালীর জেলা শহর মাইজদী ও বেগমগঞ্জের চৌমুহনীসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও পৌর এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব গ্যাংয়ের তৎপরতা নির্মূলে জেলা জুড়ে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। গত পাঁচ দিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ৪৬৯ জন কিশোরকে আটক করেছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, অপরাধে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায়নি, তাদের অভিভাবকের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অভিযোগ, জেলার শহর, উপজেলা ও পৌর এলাকা, বিনোদনকেন্দ্র, বিভিন্ন সড়কের গলি, পৌর পার্ক, স্কুল-কলেজ, হাটবাজারসংলগ্ন এলাকা ও যাতায়াতের পথে, গ্রামাঞ্চলের রাস্তার মোড়, সেতু-কালভার্ট, চায়ের দোকান, পরিত্যক্ত বাড়ি ও বাগানবাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে কিশোরদের আড্ডা দিতে দেখা যায়। স্কুল ছুটির পর বিদ্যালয়ের মাঠ ও আঙিনাতেও তাদের আড্ডা জমে ওঠে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বিভিন্ন নামে ও ছদ্মনামে এসব কিশোর গ্যাংয়ের গ্রুপ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, NTS, BTR, KTGসহ বিভিন্ন নামে অর্ধশতাধিক গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে।
স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অভিযোগ, এসব গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কিছু কিশোর চুরি-ছিনতাই, সংঘর্ষ, ইভটিজিং, মাদক কারবারসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
তাদের হাতে দামি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন এবং চলাচলের জন্য বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল রয়েছে বলেও স্থানীয়দের ভাষ্য।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নোয়াখালীর নয়টি উপজেলায় প্রায় অর্ধশত কিশোর গ্যাংয়ের গ্রুপ রয়েছে। নোয়াখালী পৌরসভা এলাকায় রয়েছে প্রায় ২৫টি গ্রুপ। এসব গ্রুপের অধীনে ছোট ছোট উপদলও রয়েছে এবং তাদের নিজস্ব নেটওয়ার্ক রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
নোয়াখালী পৌর এলাকার মাইজদী হাউসিং এলাকা, পৌর পার্ক, হাসপাতাল রোড, মুরগির ফার্ম, জহিরুল হক মিয়ার গ্যারেজ, মাইজদী কোট স্টেশন, নাপিতের পোল, খন্দকার পাড়া, বচিরার দোকান, মাস্টার পাড়া, মাইজদী বাজার ও আশপাশের এলাকা, মাইজদী স্টেশন রোড, মাইজদী স্টেশন, দত্ত বাড়ির মোড়, দত্তেরহাট মোরগ হাটা, সোনাপুর কাঠপট্টি, বিসিক শিল্পাঞ্চলের ব্রিজ এলাকা, কৃষ্ণরামপুর বোর্ড অফিস এলাকা, পূর্ব কাদির হানিফ ইসমাইলের মোড়, হরিনারায়ণপুর ও কালিতারা বাজার এলাকায় এসব গ্রুপের অবস্থান রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
গ্রেটার নোয়াখালীর প্রধান বাণিজ্যিক নগরী চৌমুহনী বাজার ও চৌমুহনী পৌরসভা এলাকায় মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের তথ্যমতে, চৌমুহনী পৌর পার্ক, বেগমগঞ্জ স্টেডিয়াম এলাকা, নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ এলাকা, বিসিক শিল্প এলাকা, বেগমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও এর আশপাশ, গণিপুর টক্কা পোল, চৌমুহনী রেলওয়ে স্টেশন এলাকা, চৌমুহনী কলেজ রোড, চৌমুহনী দক্ষিণ বাজার, গোলাবারিয়া, গোলাবাড়িয়া পার্ক, মিয়ার পোল, কিসমত করিমপুর, কনট্রাকটার পোল, দক্ষিণ নাজিরপুর ও উত্তর নাজিরপুর এলাকায় তাদের অবস্থান রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বিভিন্ন নামে কিশোর গ্যাংয়ের গ্রুপ রয়েছে। কিছু গ্রুপ প্রকাশ্যে তৎপর রয়েছে। আবার কিছু গ্রুপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউবেও তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্যাংয়ের সদস্যদের একটি অংশ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, সংঘর্ষ, ছিনতাই, ইভটিজিং ও মাদকসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। হত্যা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ইভটিজিং, মাদক কারবার, মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোন চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধে তাদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের বিরোধকে কেন্দ্র করে গত এক বছরে নোয়াখালীতে প্রায় অর্ধডজন হত্যা ও খুনের ঘটনা ঘটেছে বলেও স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ও দৌরাত্ম্য নির্মূলে গত পাঁচ দিন ধরে নোয়াখালী জেলাজুড়ে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। ধারাবাহিক এই অভিযানে ৪৬৯ জন সদস্যকে আটক করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আটক ব্যক্তিদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকায় অভিভাবকদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে অথবা ইতিপূর্বে মামলা রয়েছে, তাদের জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতারা এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে, তখন সেই দলের ছত্রছায়ায় এসব গ্রুপ ও সদস্যের একটি অংশ থাকে।
বিভিন্ন সূত্রের ভাষ্য, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নোয়াখালীতে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা শুরু হয়। বর্তমানে এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নোয়াখালী কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট শাহাদাত হোসেন বলেন, যেসব কিশোর অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের আটক রাখা প্রয়োজন। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই, তাদের অভিভাবকদের ডেকে কিশোরদের কাউন্সেলিং ও আইনি পরামর্শ দিয়ে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, এ সমস্যা থেকে প্রতিকারের জন্য বাবা-মা, পরিবার ও সমাজের সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, কোনো কিশোর হঠাৎ করে অপরাধী হয়ে ওঠে না। পরিবার থেকে দূরত্ব, খারাপ সঙ্গ, মাদকের সহজলভ্যতা, গ্যাংয়ের প্রভাব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু নেতিবাচক দিক তাকে ধীরে ধীরে ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, যারা কিশোরদের মাদক ও অপরাধে ব্যবহার করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
নোয়াখালী পুলিশ সুপার এনএম নাসিরুদ্দিন বলেন, বর্তমানে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য সমাজে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন থানায় অভিযান চালিয়ে পাঁচ শতাধিক কিশোরকে আটক করা হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, তাদের জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। অধিকাংশকে অভিভাবকের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়েছে। সন্তানদের গুরুত্বের সঙ্গে কঠোর নজরদারিতে রাখতেও অভিভাবকদের বলা হয়েছে।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, কিশোরদের এখন পড়াশোনা করার কথা। কিন্তু তারা তা না করে আড্ডা দিয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে মাদকের দিকে ধাবিত হচ্ছে। কোনো কিশোরকে অযথা স্থায়ী অপরাধী হিসেবে গণ্য করতে চায় না পুলিশ। একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর সমাজ গড়ে তোলাই পুলিশের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, “মাদক, কিশোর গ্যাং, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিসহ সকল অপরাধের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না। আমাদের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

