সংকটে কুমিল্লার বাটিক শিল্প, টিকে থাকার লড়াইয়ে কারিগররা

এম হাসান, কুমিল্লা

সংকটে কুমিল্লার বাটিক শিল্প, টিকে থাকার লড়াইয়ে কারিগররা

কুমিল্লার রসমালাই ও খাদির মতোই এক সময় সমান জনপ্রিয় ছিল বাটিক শিল্প। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প এখন টিকে আছে কেবল সংগ্রাম আর স্বপ্নের ওপর ভর করে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, মৌসুমি চাহিদার ওঠানামা এবং পুঁজি সংকটে ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে কুমিল্লার বাটিক শিল্পের উজ্জ্বলতা।

কুমিল্লা সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের কমলপুর গ্রামে এক সময় শুরু হয়েছিল বাটিক শিল্পের যাত্রা। প্রায় ৫০ বছর আগে লাল মিয়া ও মোহন মিয়া নামে দুই ভাইয়ের হাত ধরে এ শিল্প স্থানীয়ভাবে বিস্তার লাভ করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ বাটিকের সুনাম ছড়িয়েছে সারা দেশে।

বিজ্ঞাপন

কমলপুর ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামে গড়ে উঠেছে প্রায় ২৫টি কারখানা। এসব কারখানায় তৈরি হচ্ছে নান্দনিক নকশার শাড়ি, থ্রি-পিস, শার্ট, লুঙ্গি ও বেডশিট। কুমিল্লা নগরীর মনোহরপুর, কান্দিরপাড় ও রামঘাট এলাকার দুই শতাধিক দোকানে এসব বাটিকপণ্য পাওয়া যায়। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব পণ্য ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হচ্ছে এবং বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।

ভোরের আলো ফুটতেই কারখানাগুলো প্রাণ ফিরে পায়। গরম পানির বাষ্প, রঙের কড়াই আর কারিগরের যত্নে শুরু হয় নতুন দিনের কাজ। কেউ কাপড় পরিষ্কার করছেন, কেউ রঙ মিশিয়ে তৈরি করছেন নান্দনিক ছাপ। এরপর মোমের মাধ্যমে কাপড়ে ফুটিয়ে তোলা হয় ফুল, ঢেউ বা বিমূর্ত নকশা। দীর্ঘ ১২ বছর ধরে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হামিদ চৌধুরী একাই সামলান কাপড়ের বাহারি, ওয়াশ ও ডাইনের কাজ। তিনি বলেন, বাহারি শেষ করে এসে মোম তুলি, এর মাধ্যমে কাপড়টিকে ওয়াশ করা হয়, ফলে কাপড়টি ক্লিয়ার হয়।

অন্যদিকে কারিগর মুশফিকুর রহমান মোন্না বলেন, প্রতিদিন ২০-৩০টি থ্রি-পিসে মোম ব্লক করতে পারি। এরপর নারীরা তুলি দিয়ে রঙের কাজ করেন, যা কাপড়কে আরো আকর্ষণীয় করে তোলে।

মাঠের দিকে তাকালে চোখে পড়ে কয়েকজন কর্মী সারি সারি কাপড় উল্টে দিচ্ছেন, সোজা করছেন, যাতে রোদের তাপে প্রতিটি নকশা আরো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। প্রথম ধাপে রঙ শুকিয়ে গেলে শুরু হয় নতুন শিল্পযাত্রা। নারীরা কাপড়ের ওপর মেখে দেন ভিন্ন ভিন্ন রঙ। সারিবেঁধে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে অসীম মমতায় তারা রঙ ঢেলে দেন কাপড়ে। প্রতিটি আলতো স্পর্শে জন্ম নেয় আরো গভীর সৌন্দর্য, উজ্জ্বল নকশা ও প্রাণবন্ত জীবন।

কুমিল্লা নিউ বাটিক ঘরের স্বত্বাধিকারী আবু সাইদ বলেন, আমার কোম্পানিতে প্রতিদিন ১৫ জন লোক কাজ করেন। কেউ রঙ করেন, কেউ মোম লাগান, কেউ ভাঁজ করে রাখেন। আমাদের সপ্তাহভিত্তিক কাজের হিসাব হয়। আমার এখানে সুতি কাপড়, থ্রি-পিস এবং সিল্কের শাড়ি ও লুঙ্গি পাওয়া যায়।

কমলপুরের এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বিশ্বাস করেন, সরকারি প্রণোদনা, স্বল্প সুদের ঋণ কিংবা সামান্য সহায়তাও যদি পাশে দাঁড়ায়, তাহলে কুমিল্লার বাটিক আবার নতুন করে বিশ্বকে মোহিত করবে। রঙে রঙে ও নকশায় নকশায় বাংলার গর্ব হয়ে দাঁড়াবে এ শিল্প।

কুমিল্লা বাটিক সেন্টারের মালিক রাশেদুল ইসলাম বলেন, আমার বাবা ৩৫ বছর আগে থেকে এ কারখানায় কাজ শুরু করেন। এখন আমি এর দায়িত্বে আছি। আমাদের এ ব্যবসা প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। রোদ না থাকলে কজ বন্ধ হয়ে যায়। গরমকালের তুলনায় শীতকালে চাহিদা কমে যায়। তখন কর্মীদের বেতন-ভাতা দিয়ে টিকিয়ে রাখতে কষ্ট হয়। সরকার যদি স্বল্প সুদে কিংবা সুদহীন ঋণের ব্যবস্থা করত, তাহলে শিল্পটি হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত না।

স্থানীয় উদ্যোক্তারা মনে করেন, সরকারি প্রণোদনা ও সহায়তা পেলে কুমিল্লার বাটিক শিল্প আবার দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...