তরমুজ চাষিদের মাথায় হাত, ঝুঁকিতে শতকোটি টাকার মূলধন

এস এম ইউসুফ আলী, ফেনী

তরমুজ চাষিদের মাথায় হাত, ঝুঁকিতে শতকোটি টাকার মূলধন

অসময়ের বৃষ্টি, জ্বালানী তেলের সংকটে পরিবহন সিন্ডিকেট ও দরপতনের কবলে পড়ে ফেনীতে ‘মূলধন’ হারাতে বসেছে ফেনীর তরমুজ চাষিরা। হয়েছে স্বপ্নভঙ্গ। চলতি মৌসুমে তরমুজের আবাদ বাড়লেও কমে গেছে ফলন। চরম লোকসানে পড়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা। ঝুঁকিতে শতকোটি টাকার মুলধন৷

জেলার উপকূলীয় অঞ্চল সোনাগাজী উপজেলার দক্ষিণ চর চান্দিনায় ৯০ একর জমিতে তরমুজ চাষে স্বপ্ন বুনেছিলেন আবু সায়িদ রুবেলসহ ১০ কৃষক। সমবায়ে ১ কোটি ১৬ লাখ টাকার বিনিয়োগে ফলেছিলো তরমুজের বাম্পার ফলন। কিন্তু পাইকারের অভাবে ফসল পড়ে আছে মাঠেই। পরিশ্রমের সেই ফসল এখন নিজেরাই নষ্ট করছেন, খাওয়ানো হচ্ছে গবাদি পশুকে। স্বপ্নভঙ্গের ভারে দিশেহারা কৃষকরা।

বিজ্ঞাপন

চরাঞ্চলের বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেতে তরমুজের আকার ছোট, অনেক ফলের রং নষ্ট হয়ে গেছে, কোথাও কোথাও বৃষ্টির কারণে নিচের অংশে পচন ধরেছে। তেলের দাম বাড়ায় পরিবহনে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা বাড়তি খরচ হচ্ছে। শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে প্রতিদিন ১শ' টাকা করে।

তরমুজ চাষিরা জানান, প্রতি একশ বিশ শতক জমিতে (এক কানি) তরমুজ চাষে এবার গড়ে খরচ হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। অথচ বাজারে সেই খরচের তিন ভাগের এক ভাগও উঠছে না। আগে একটি বড় ট্রাক ভর্তি তরমুজ আড়তে পাঠালে ৩ লাখ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা পাওয়া যেত। এবার দুই দিন নিজে দাঁড়িয়ে পাইকারদের কাছে খুচরা বিক্রি করেও ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার বেশি উঠছে না।

এর মধ্যে বাড়তি পরিবহন খরচ, বিক্রির ওপর ৬ থেকে ৯ শতাংশ আড়ত কমিশন, অতিরিক্ত শ্রমিক ব্যয়, ভাইরাসের কারণে বারবার সেচ, সার ও বালাইনাশক ব্যবহারের খরচ বাদ দিলে গাড়িপ্রতি হাতে থাকছে মাত্র ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। ফলে মূলধন তুলতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চাষিরা।

রাজু আহমেদ নামের চর চান্দিয়া এলাকার এক তরমুজ চাষি বলেন, এমন লোকসান জীবনে আর কখনোই গুনতে হয়নি। উৎপাদিত ফসল নিজের চোখের সামনেই নষ্ট হচ্ছে। বাজারে নিয়ে গেলেও দাম পাওয়া যাচ্ছে না।

কবির আহম্মদ নামের এক চাষি বলেন, ফল পুষ্ট হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে পড়তে হয়েছে দরপতনে। লাভতো দূরের কথা

এবার পুঁজিও উঠবেনা।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর জেলা ৭৭৪ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হলেও এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৯৯ হেক্টরে। এর মধ্যে সোনাগাজীতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৫০ হেক্টর, কিন্তু আবাদ হয়েছে ১ হাজার ১০৫ হেক্টর জমিতে । গত মৌসুমে ফেনীতে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার তরমুজ বিক্রি হয়েছিল এবং আবাদ ৫২৫ হেক্টর বাড়ায় এবার তরমুজের বাজার ২৫০ কোটি টাকা ছাড়াতে পারে ধারণা করা হচ্ছিল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আশায় গুড়েবালি হলো কৃষকের৷

স্থানীয় কৃষকরা বলছেন- চরের এই ভূমিতে তরমুজসহ নানা ধরনের ফসল ফলান তারা। কোন হিমাগার না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয় তাদের। এছাড়াও ২০২৪ সালের ভেঙ্গে যাওয়া মুসাপুর ক্লোজার পুনর্নির্মাণ না হওয়ায় সৃষ্ট লবণাক্ততায় তৈরি করেছে নতুন সংকট।

রবিউল হক রবি নামের সোনাগাজীর স্থানীয় এক যুবক বলেন, ২০২৪ সালের বন্যার পরে মুসাপুর ক্লোজারটি ভেঙ্গে যায়। দুই বছর অতিক্রম হলেও সেটি পূণ:নির্মাণের কোন ধরণের উদ্যোগ দৃশ্যমান নেই। যার ফলশ্রুতিতে একটু বৃষ্টি হলে কিংবা জোয়ারের পানি বাড়লে লবণাক্ততায় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন কৃষক। এই একটি কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে হাজার কোটি টাকার কৃষি অর্থনীতি।

কৃষকের এই ক্ষতির বিষয়ে অবগত আছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আতিক উল্যাহ। তিনি বলেন, চলতি বছর তরমুজের আবাদ গেলো বছর থেকে দ্বিগুণ বেড়েছে। ফলনও ভালো হয়েছে কিন্তু হঠাৎ তেল নিয়ে বৈশ্বিক সংকট, এবং বৃষ্টি ও ভাইরাসের সংক্রমণে কৃষক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এসব বিষয়ে কৃষি বিভাগ নিয়মিত খোঁজ রেখে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন।

সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিগান চাকমা বলেন, পরিবহনে তেলের সংকটের কারণে যদি তরমুজ পরিবহনে সমস্যা হয়। বিষয়টি যদি প্রশাসনকে জানানো হয় তাহলে প্রশাসন বিশেষ ব্যবস্থাপনায় তেলের ব্যবস্থা করবে এবং কৃষকের সাথে থাকবে।

এছাড়া কৃষকের কষ্টের ফলস চরের এই তরমুজ। কঠোর শ্রম-ঘামের পর কথা ছিলো মুখে হাসি ফিরবে, উল্টো এখন কপালে চিন্তার ভাঁজ। পরিবহনে জ্বালানী তেলের অপ্রতুলতা, অসময়ের বৃষ্টি আর দরপতন- সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এই সংকট৷ উত্তরণে সরকারি-বেসরকারি পদক্ষেপ দাবী করছে ক্ষতিগ্রস্তরা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...