হুমকিতে বেড়িবাঁধ ও শত শত পরিবার

সীতাকুণ্ড উপকূলে বেপরোয়া বালুদস্যুতা

সীতাকুণ্ড উপকূলে বেপরোয়া বালুদস্যুতা
ছবি: আমার দেশ

উপকূলরক্ষা বেড়িবাঁধের কাছাকাছি এলাকা থেকে ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও তা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির অভিযোগে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়ছে। সৈয়দপুর থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে এবং সোনাইছড়ির বকতারপাড়ায় মাবিয়া শিপইয়ার্ডসংলগ্ন এলাকায় ব্যাপকভাবে বালু তোলা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের আশঙ্কা, উপকূলের সংবেদনশীল এলাকায় এমন কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় ভাঙনে বিলীন হতে পারে বেড়িবাঁধ, বসতভিটা ও কৃষিজমি।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে জেলা প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়েছে, সীতাকুণ্ড উপকূলে বালু উত্তোলনের কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে দ্রুত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হবে ।

এর আগে গত শুক্রবার বাঁশবাড়িয়া সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন আকিলপুর এলাকায় ‘আকিলপুরের সর্বস্তরের সর্বসাধারণ’-এর ব্যানারে এক মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মানববন্ধনে তাঁরা বালু উত্তোলনের বৈধতা যাচাই, বেড়িবাঁধের অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন এবং অনিয়ম বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থার দাবি জানান।

বাসিন্দাদের বক্তব্য, উপকূলরক্ষা অবকাঠামোর কাছ থেকে বালু তোলার ক্ষতিকর প্রভাব যাচাই না করে এ পরিস্থিতি উপেক্ষা করা অনুচিত। এজন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মাধ্যমে বেড়িবাঁধের বর্তমান অবস্থা পরীক্ষা এবং বালু উত্তোলনের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরূপণে কারিগরি মূল্যায়নের দাবি তুলেছেন তাঁরা।

যোগাযোগ করা হলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল আমার দেশকে বলেন, ‘সীতাকুণ্ড উপকূলে বালু উত্তোলনের কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। অনুমতি রয়েছে বলে যাঁরা দাবি করছেন, তাঁদের তথ্য সঠিক নয়। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে শিগগিরই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এ বিষয়ে সীতাকুণ্ডের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফজলে রাব্বিকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

সোনাইছড়ি ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বকতারপাড়ার মাবিয়া শিপইয়ার্ডের পরিচালক এজাহার মিয়া বলেন, ‘শিপইয়ার্ডটি শ্রমিক দলের নেতা রবিউলের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।’ তাঁর দাবি, ভাড়াটিয়ারাই বালু উত্তোলন করে বিক্রি করছেন এবং এই কাজে সরকারি অনুমতি রয়েছে। সমুদ্রে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়ায় জাহাজ বিচিঙে (তীরে ভেড়ানো) সমস্যা হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন। তবে জেলা প্রশাসন বালু উত্তোলনের অনুমতির কথা পরিষ্কারভাবে অস্বীকার করেছে। এ বিষয়ে কথা বলতে রবিউলের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, প্রতি বর্গফুট বালু উত্তোলনে খরচ হয় প্রায় ৩ টাকা ৫০ পয়সা এবং তা বিক্রিমূল্য দাঁড়ায় ৭ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৮ টাকা। তবে এ হিসাবের ভিত্তি, উত্তোলিত বালুর প্রকৃত পরিমাণ কিংবা মোট আর্থিক লেনদেনের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রতিদিন ঠিক কী পরিমাণ বালু উত্তোলন হচ্ছে এবং কত টাকার লেনদেন হচ্ছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, সীতাকুণ্ড উপকূলে বালু উত্তোলন বন্ধে এর আগেও প্রশাসনিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সৈয়দপুর, কুমিরা, বাঁশবাড়িয়া, বারআউলিয়া ও গুলিয়াখালিসহ কয়েকটি এলাকায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ অভিযানে ড্রেজার জব্দ এবং ১৩ জনকে আটক করা হয়েছিল।

অভিযোগের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক জমির উদ্দিন এবং সীতাকুণ্ডের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফজলে রাব্বির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় বাসিন্দারা জোর দাবি জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে উপকূলে অনুমোদনের নামে চলা বালু বাণিজ্য অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। সেই সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কারিগরি মূল্যায়নের মাধ্যমে উপকূলরক্ষা বেড়িবাঁধ, বসতভিটা ও কৃষিজমির দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

এমএইচ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন