মাকে বিদায় দিয়ে মিছিলে যান আবদুল মজিদ

উপজেলা প্রতিনিধি, শেরপুর (বগুড়া)

মাকে বিদায় দিয়ে মিছিলে যান আবদুল মজিদ

বগুড়ার শেরপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের দুইশ’ ছররা গুলি শরীরে নিয়ে জীবন পার করতে হবে দিনমজুর আবদুল মজিদকে (২২)। টাকার অভাবে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারছেন না তিনি। আন্দোলন চলাকালে ৪ আগস্ট শেরপুর থানার সামনে গুলিবিদ্ধ এক ছাত্রকে উদ্ধার করতে গিয়ে মজিদ নিজেও গুলিবিদ্ধ হন।

বিজ্ঞাপন

কয়েক দফা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর শরীর থেকে ৩২টি ছররা গুলি বের করা হয়েছে। এখনো দুই শতাধিক গুলি রয়ে গেছে শরীরে। তীব্র ব্যথায় রাতে ঘুমাতে পারেন না। চিকিৎসকরা বলেছেন, এত তাড়াতাড়ি গুলি বের করা সম্ভব নয়।

এদিকে মাজিদের পরিবার মনে করছে, তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিলে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারতেন। কিন্তু পরিবারের সেই আর্থিক অবস্থা নেই। বাড়ি ধুনট উপজেলার চৌকিবাড়ি ইউনিয়নের বিশ্ব হরিগাছা গ্রামে হলেও বছর দুয়েক আগে পৌর এলাকার হাসপাতাল রোডে একটি টিনশেড ভাড়া বাসায় মা, মোজো ভাই ও ভাবিকে নিয়ে তাদের সংসার। তার বাবার নাম মৃত সেলিম উদ্দিন। জমিজমা না থাকায় দুই ভাই দিনমজুরের কাজ করতেন। তাদের আয় দিয়ে চলত সংসার। কিন্তু গুলির ঘটনায় তাদের সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়।

আব্দুল মজিদ বলেন, ৪ আগস্ট সকাল সাড়ে ৯টায় ছাত্র-জনতার একটি মিছিল মহাসড়ক দিয়ে আমার বাড়ির সামনে পৌঁছালে আমি ভাতের থালা রেখে মাকে বিদায় দিয়ে মিছিলে যোগ দেই। সেই মিছিলটি থানার কাছাকাছি পৌঁছার আগেই ২০ থেকে ২৫ জনের আরেকটি মিছিল সেখানে চলে যায়। তখন পুলিশ থানার ছাদ থেকে সেই মিছিলে গুলি

চালায়। এতে ১৬-১৭ বছর বয়সী এক ছাত্র হাতে গুলি লেগে রাস্তায় পড়ে যায়। ছাত্রটিকে উদ্ধার করতে কোলে নিয়ে ফেরার সময় পুলিশ আমাকেও গুলি করে। এ সময় আমি ঘুরে দাঁড়ালে ছররা গুলি আমার পিঠ, কোমর, উরু ও হাতে লাগে। আমি রাস্তায় লুটিয়ে

পড়ি। পরে প্রতিবেশীরা আমাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখান থেকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান (শজিমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়।

মজিদ বলেন, হাসপাতালে প্রথম দিকে অপারেশন করে শরীর থেকে ৩০ থেকে ৩২টি ছররা গুলি বের করেছে। বাকি গুলিগুলো বের না করায় শরীরে অসম্ভব যন্ত্রণা হচ্ছে। ব্যথায় রাতে ঘুমাতে পারছি না।

আবদুল মজিদের বড় ভাই রাকিব বলেন, “শজিমেক হাসপাতালে আমার ভাইয়ের শরীরের এক্স-রে করে প্রায় ৩শ’ গুলির অস্তিত্ব ধরা পড়ে। এরপুর পুনরায় পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে

এমআরআই করলে সেখানেও ৩শ’ গুলির অস্তিত্ব দেখা যায়। অর্থের অভাবে তখন থেকেই তার চিকিৎসা ধীরগতিতে চলছে।”

রাকিব আরো বলেন, চিকিৎসকরা জানিয়েছেন মজিদের মেরুদণ্ডের আশপাশে ২৫-২৬টি ছররা আছে। মাংসের গভীরে অনেক গুলি রয়েছে, সেগুলো কখনোই বের করা সম্ভব নয়। সে পুরোপুরি সুস্থ হতে পারবে না।

আবদুল মজিদ কেঁদে কেঁদে আমার দেশকে বলেন, ‘আমি ২২ বছরের যুবক, অথচ বিছানায় পড়ে আছি। কিছুক্ষণ পর পর প্রচণ্ড যন্ত্রণা হয় আর চুলকায়। ছররা গুলির ব্যথায় চলাফেরা দূরের কথা, ঠিকমত শুয়ে থাকতে পারি না, বসতেও পারি না।’

মজিদের পরিবার আশাবাদী, তাকে উন্নত চিকিৎসা দেয়া হলে দ্রুত সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।

শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাজিদ হাসান সিদ্দিকী লিংকন বলেন, ‘আবদুল মজিদের শরীরে দুই শতাধিক ছররা গুলি রয়েছে। তার উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন