শ্রীমঙ্গলে বিরল নাগলিঙ্গম বৃক্ষের মোহময় সৌন্দর্য, দর্শনার্থীদের ভিড়

উপজেলা প্রতিনিধি, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)

শ্রীমঙ্গলে বিরল নাগলিঙ্গম বৃক্ষের মোহময় সৌন্দর্য, দর্শনার্থীদের ভিড়
বিরল নাগলিঙ্গম বৃক্ষ

চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যুক্ত হয়েছে এক নতুন বিস্ময়—বিরল নাগলিঙ্গম বৃক্ষ। গাছের কাণ্ডজুড়ে থোকায় থোকায় ফুটে থাকা দৃষ্টিনন্দন ফুল, মনমাতানো সুগন্ধ এবং ব্যতিক্রমী গঠন প্রতিদিনই আকর্ষণ করছে অসংখ্য দর্শনার্থীকে।

জেলার অন্তত দুটি স্থানে বর্তমানে নাগলিঙ্গম গাছে ফুল ও ফল ধরেছে। এর একটি বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট ক্যাম্পাসে এবং অন্যটি মির্জাপুর ইউনিয়নের শহরশ্রী গ্রামে অবসরপ্রাপ্ত নৌ কর্মকর্তা দেওয়ান গউছউদ্দিন আহমদের বাড়িতে। উভয় স্থানেই গাছগুলো এখন ফুলে-ফলে ভরপুর, যা দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা।

বিজ্ঞাপন

নাগলিঙ্গমের বৈজ্ঞানিক নাম Couroupita guianensis। প্রায় তিন হাজার বছর আগে আমাজন অরণ্যে এর সন্ধান মেলে। ‘ক্যানন বল ট্রি’ নামেও পরিচিত এই বৃক্ষ ভারতে ‘শিব কামান’ নামে সুপরিচিত।

এই গাছের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো—ফুল ও ফল শাখা-প্রশাখায় নয়, সরাসরি কাণ্ডে জন্মায়। গাঢ় গোলাপি ও হালকা হলুদের মিশেলে গড়া ফুলগুলো যেমন দৃষ্টিনন্দন, তেমনি এর সৌরভে মিশে থাকে গোলাপ ও পদ্মের ঘ্রাণ। ফুলের পরাগচক্র সাপের ফণার মতো আকৃতির হওয়ায় এর রহস্যময়তা আরও বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল নাগলিঙ্গম গাছটি বর্তমানে ফুল ও ফলে ভরপুর। সকাল-বিকাল পুরো এলাকা ভরে উঠছে এর মাদকতাময় সুগন্ধে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা চা বাগানের সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই বিরল বৃক্ষ দেখেও মুগ্ধ হচ্ছেন।

জানা যায়, ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ চা বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার আব্দুল্লাহ আল হোসেন গাছটির চারা রোপণ করেন। তিন দশকে এটি বিশাল আকৃতি ধারণ করেছে।

অন্যদিকে শহরশ্রী গ্রামের একটি বাড়ির আঙিনায়ও একই দৃশ্য চোখে পড়ে। গাছটির গোড়া থেকে কাণ্ডজুড়ে ফুটে থাকা ফুলে প্রায় পাতাই দেখা যায় না। কুঁড়ি থেকে পূর্ণ প্রস্ফুটন—সব ধাপেই রয়েছে দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য।

স্থানীয় দর্শনার্থীরা জানান, এমন দৃশ্য তারা আগে কখনো দেখেননি। পরিবার-পরিজন নিয়ে এসে অনেকেই এই গাছের সামনে ছবি তুলছেন।

সিনিয়র সাংবাদিক এম ইদ্রিস আলী বলেন, নাগলিঙ্গম আমাদের দেশে এক বিরল প্রজাতির গাছ। যেমন বসন্তকালে শিমুল গাছের নিচে ঝরে পড়া ফুলে চারপাশ ভরে ওঠে, তেমনি নাগলিঙ্গম গাছের তলাও অসংখ্য পাপড়িতে তৈরি করে অপূর্ব এক দৃশ্য।

ইনস্টিটিউটের উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ড. ইসমাইল হোসেন জানান, নাগলিঙ্গম বর্তমানে বিশ্বে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত বর্ধনশীল এই বৃক্ষ ৩৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে এবং চারা রোপণের ১২–১৪ বছর পর ফুল ফোটা শুরু হয়। গাছের কাণ্ড ভেদ করে বের হওয়া মঞ্জুরিতে একসঙ্গে ১০–২০টি ফুল ফোটে—প্রকৃতির এক অনন্য চক্র।

প্রকৃতির এই বিস্ময় শ্রীমঙ্গলের সৌন্দর্যে যুক্ত করেছে নতুন মাত্রা। দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্যের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক ও ঔষধি গুরুত্বেও সমৃদ্ধ এই বৃক্ষ দিন দিন হয়ে উঠছে প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের অন্যতম আকর্ষণ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন