সরকারের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। গত জানুয়ারি শেষে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের নেওয়া পুঞ্জীভূত ঋণ ১০ লাখ ৯৪ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৯ লাখ ৪২ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৫১ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা।
গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে সরকারের নেওয়া অভ্যন্তরীণ ঋণের তথ্য তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নিয়েছে ৭২ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছিল ৪০ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের ঋণ বেড়েছে ৭ দশমিক ১০ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ব্যাংক খাত থেকে ৬৪ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা এবং ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে ৭ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। গত অর্থবছরের একই সময়ে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিয়েছিল ১৫ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা এবং ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে নিয়েছিল ২৪ হাজার ৬১২ কোটি টাকা।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এসব ঋণ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আয়োজিত নির্বাচনি ব্যয়, নতুন ব্যাংকে বিনিয়োগ এবং পরিচালন ব্যয় মেটাতে এ ঋণ নেওয়া হয়েছিল। মূলত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আয় না হওয়ায় সরকারকে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নিতে হয়েছিল। তাই আগের তুলনায় ঋণের পরিমাণ বেড়েছে।
প্রতি বছরই বড় অঙ্কের ঘাটতি রেখে বাজেট পেশ করে আসছে সরকার। এ ঘাটতি মেটানো হয় মূলত দুটি উৎস থেকে—অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক খাত। বৈদেশিক খাত থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ সহায়তা পাওয়া না গেলে অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপরই বেশি নির্ভর করতে হয় সরকারকে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে রয়েছে—ব্যাংকব্যবস্থা, নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানি এবং সঞ্চয়পত্র খাত।
দায়িত্বে থাকাকালে অন্তর্বর্তী সরকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার যে বাজেট দিয়েছে, সেখানে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয় (অনুদানসহ) ২ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির সাড়ে ৩ শতাংশ। তবে অনুদান বাদে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এবার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। আর ননব্যাংকিং উৎস থেকে ২১ হাজার কোটি টাকার ঋণ পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। এর মধ্যে সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া হবে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। তবে এখন পর্যন্ত সরকার বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছে, তার সিংগভাগই নিয়েছে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে।
তথ্যানুযায়ী, সরকারের অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে গত জানুয়ারি পর্যন্ত পুঞ্জীভূত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ১০ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা আর ব্যাংকবহির্ভূত খাতে পুঞ্জীভূত ঋণ ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরেকটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে গত ৩০ মার্চ পর্যন্ত সরকার ঋণ নিয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তিন মাস বাকি থাকতেই পুরো অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ঋণ নিয়ে ফেলেছে সরকার। সব মিলিয়ে ব্যাংকব্যবস্থায় সরকারের মোট ঋণ স্থিতি ৬ লাখ ৫৬ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
এদিকে, সরকারের বিদেশি ঋণ গত জুন পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৪৯ হাজার ১১ কোটি টাকা। যদিও ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের বিদেশি ঋণ ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার (১৩ লাখ ৯২ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা, প্রতি ডলার ১২২ দশমিক ৭০ টাকা হিসাবে)।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

