মন্দা শেয়ারবাজারে মার্জিন ঋণ সমন্বয়ের চাপ

অর্থনৈতিক রিপোর্টার

মন্দা শেয়ারবাজারে মার্জিন ঋণ সমন্বয়ের চাপ

শেয়ারবাজারে চলমান মন্দার মধ্যে মার্জিন ঋণ সমন্বয়ের চাপের মুখে পড়েছে মার্জিন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলো। নতুন মার্জিন বিধিমালা অনুযায়ী, আগামী ৩০ এপ্রিলের মধ্যে মার্জিন ঋণ সমন্বয় করতে হবে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

চলমান মন্দার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরাইলের ওপর আক্রমণের ফলে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে শেয়ারবাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং পাকিস্তানে শান্তি আলোচনাকে ঘিরে স্বস্তি ফিরে এলেও কোনো ধরনের চুক্তি ছাড়া আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে মার্জিন ঋণ সমন্বয় করতে গেলে দেশের পুঁজিবাজারে আরো বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

বিজ্ঞাপন

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মার্জিন ঋণ সমন্বয়ের জন্য আরো তিন মাস সময় বাড়ানোর জন্য পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন জানিয়েছে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ)। বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে মার্জিন লোন সমন্বয়ে আরো তিন মাস সময় বৃদ্ধি করে তা ৩১ জুলাই পর্যন্ত বাড়ানোর জানিয়েছেন ডিবিএ প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম।

চিঠিতে বিরাজমান বর্তমান মন্দা পরিস্থিতিতে ঋণ সমন্বয় করতে গেলে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের বিক্রি চাপ তৈরি এবং লেনদেনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছে ডিবিএ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১ নভেম্বর থেকে নতুন মার্জিন বিধিমালা ২০২৫ কার্যকর হয়। নতুন বিধিমালায় মার্জিন লোনসংক্রান্ত ইস্যুতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। এতে শুধু স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বোর্ডে তালিকাভুক্ত ‘এ’ এবং ‘বি’ ক্যাটাগরির (ন্যূনতম পাঁচ শতাংশ লভ্যাংশ দিতে হবে) কোম্পানির শেয়ার ক্রয়ে মার্জিন লোন সুবিধা দেওয়া যাবে। মার্জিন লোন সুবিধা পেতে বিনিয়োগকারীর পাঁচ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ থাকতে হবে। যাদের বিনিয়োগ পাঁচ লাখের বেশি কিন্তু ১০ লাখের কম তারা নিজস্ব বিনিয়োগের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ঋণ নিতে পারবেন। তবে এর বেশি হলে সর্বোচ্চ সমান অনুপাতে ঋণ পাবেন। আবার যার যত বিনিয়োগই থাকুক না কেন, লাইফ ইনস্যুরেন্সের শেয়ার কিনতে নিজ বিনিয়োগের ৫০ শতাংশের বেশি ঋণ মিলবে না। বাজার পিই অনুপাত ২০-এর বেশি হলে ঋণ অনুপাত ২৫ শতাংশে নামবে। আবার ইতোমধ্যে কেনা শেয়ারের বাজার মূল্য বৃদ্ধি বিবেচনায় নতুন ঋণ মিলবে না। আরো ঋণ চাইলে আগে শেয়ার বিক্রি করে নগদায়ন করতে হবে। লাইফ ইনস্যুরেন্সের হালনাগাদ একচুরিয়াল ভ্যালুয়েশন না থাকলে ঋণ মিলবে না।

নতুন বিধান অনুযায়ী ঋণগ্রহীতার পোর্টফোলিওতে নিজস্ব বিনিয়োগ মূল্য ৫০ শতাংশ নামলেই ‘ফোর্স সেল’ বা বাধ্যতামূলক শেয়ার বিক্রি হবে। এর আগে ৭৫ শতাংশে নামলেই ‘মার্জিন কল’ হবে।

নীতিমালায় আরো বলা হয়েছে, মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানকে (মার্চেন্ট ব্যাংক বা ব্রোকারেজ হাউস) অবশ্যই বিএসইসির রিস্ক বেইসড ক্যাপিটাল অ্যাডুকেসি বিধিমালা-২০১৯ পরিপালন না করে অর্থায়ন করতে পারবে না বলে বলা হয়েছে। মার্জিন বিধিমালা-২০২৫ কার্যকরের ছয় মাস পর্যন্ত পরিপালনের বাধ্যবাধকতার শিথিলতা থাকবে। অর্থাৎ মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানকেও আগামী ৩০ এপ্রিলের মধ্যে ক্যাপিটাল অ্যাডুকেসির বিধিমালা শর্তাবলি পরিপালন করতে হবে। ক্যাপিটাল অ্যাডুকেসির শর্তাবলির মধ্যে বলা হয়েছে, কোনো মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান কোনো অবস্থায় তার প্রকৃত মূলধনের বা নীট সম্পদের তিনগুণের বেশি মার্জিন অর্থায়ন করতে পারবে না। যদি কোনো অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান তার চেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থায়ন করে থাকে, তাহলে মার্জিন বিধিমালা-২০২৫ কার্যকরের ছয় মাসের মধ্যে সমন্বয় করার জন্য বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আগের মার্জিন বিধিমালা-১৯৯৯ অনুযায়ী যেসব কোম্পানির শেয়ার ক্রয়ে মার্জিন ঋণ দেওয়া হয়েছিল নতুন মার্জিন বিধিমালার কারণে সেসব কোম্পানির শেয়ারক্রয়ে মার্জিন লোন সুবিধা বন্ধ হয়ে গেছে। আবার আগে যে হারে মার্জিন লোন সুবিধা দেওয়া হয়েছে, এখন সেটা কমেছে। তাছাড়া ২০১০ সালে শেয়ারবাজারে ধসের পর বিএসইসির মৌখিক নির্দেশনার কারণে মার্জিন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ফোর্সড সেল বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিল। ফোর্সড সেল বন্ধ থাকার কারণে এখন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছে। দীর্ঘ মন্দার কারণে বিনিয়োগকারীরাও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ফলে নতুন বিধিমালা কার্যকরে মার্জিন লোন সমন্বয় করতে গেলে বাজারে শেয়ারের বড় ধরনের বিক্রি চাপ তৈরি হবে, এতে বাজারের মন্দা আরো তীব্র আকার ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

এদিকে, পাঁচ লাখ টাকার কম বিনিয়োগ করে কোনো বিনিয়োগকারী মার্জিন লোন সুবিধা নিলে তাকে এক বছরের মধ্যে অর্থাৎ চলতি বছরের ৩০ অক্টোবরের মধ্যে বিনিয়োগের পরিমাণ পাঁচ লাখে উন্নীত করতে হবে। অন্যথায় শেয়ার বিক্রি করে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...