বিএনপিকে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আহ্বান মামুনুল হকের

বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার

বিএনপিকে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আহ্বান মামুনুল হকের

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেছেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান নতুন রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি তৈরি করেছে। তিনি বিএনপিকে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।

বুধবার (৯ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ১১টায় ডাকসু প্রাঙ্গণে ‘জুলাই সনদ ও সংস্কার: নতুন বাংলাদেশ নাকি পুরোনো ফ্যাসিবাদ’ শীর্ষক সংস্কার আলাপের দ্বিতীয় পর্বে তিনি এ আহ্বান জানান।

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম। এতে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির, সম্মিলিত নারী প্রয়াসের সভাপতি অধ্যাপক ড. শামীমা তাসনিম, গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার এবং দৈনিক সমকালের বিশেষ প্রতিনিধি রাজীব আহাম্মদসহ অনেকে।

সংস্কার আলাপে বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সরকারি দল বিএনপি গণভোটের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত জনমত অস্বীকার করলে জনগণ আবারও রাজপথে নামতে বাধ্য হবে। তারা বলেন, সংবিধান সংস্কার ও রাষ্ট্র কাঠামোর পুনর্গঠনে জনগণের ম্যান্ডেট উপেক্ষা করলে তা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

আলোচনায় অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, সংবিধান শুধু আইনের কাঠামো নয়, এর একটি মৌলিক চেতনা রয়েছে। সেই চেতনা উপেক্ষা করলে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি অভিযোগ করেন, গণভোট ও সংবিধান সংশোধন বিষয়ে বিএনপির দ্বৈত অবস্থান রাজনৈতিক বিভ্রান্তি তৈরি করছে।

তিনি বলেন, ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় প্রস্তাবিত আপার হাউস ও কনস্টিটিউশনাল কাউন্সিলের মতো উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করা গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করে।

অধ্যাপক ড. শামীমা তাসনিম বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংবিধান “সংশোধন” নয়, বরং “সংস্কার” জরুরি। তার মতে, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা একটি ‘ফ্যাসিস্ট চক্র’ তৈরি করছে, যা ভাঙতে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই।

দৈনিক সমকালের বিশেষ প্রতিনিধি রাজীব আহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশের মূল সংকট দুর্নীতি নয়, বরং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের অভাব। তিনি বলেন, নির্বাচন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে গিয়ে বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনকে দলীয়করণ করা হয়েছে। এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য শক্তিশালী সাংবিধানিক কাঠামো ও চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স প্রতিষ্ঠা জরুরি।

গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, সাম্প্রতিক গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ সংবিধান সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন, যা এই প্রক্রিয়াকে নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি দিয়েছে। তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্বের উদ্যোগকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, সংসদ নয়, জনগণই রাষ্ট্রের প্রকৃত সার্বভৌম শক্তি। গণভোটের ম্যান্ডেট উপেক্ষা করা রাজনৈতিক দ্বিচারিতার শামিল। তিনি সতর্ক করে বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা অগ্রাহ্য করা হলে অতীতের মতো আবারও গণআন্দোলন শুরু হতে পারে।

ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে যে সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছিল, তা পরবর্তী সংবিধানে প্রতিফলিত হয়নি। তিনি বলেন, বর্তমানেও গণভোটের ম্যান্ডেটকে উপেক্ষা করা হলে নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে।

আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, সাম্প্রতিক গণভোটে সুস্পষ্ট প্রশ্নের ভিত্তিতে জনগণ মতামত দিয়েছে, যা অতীতের তুলনায় বেশি গ্রহণযোগ্য। তিনি বলেন, সংসদ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নয়; সংবিধান ও জনগণই সর্বোচ্চ। বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।

সভাপতির বক্তব্যে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, ডাকসু একটি অংশগ্রহণমূলক সংস্কার সংলাপ শুরু করেছে, যেখানে সব পক্ষকে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিএনপিপন্থীদের আমন্ত্রণ জানানো হলেও তারা সাড়া দেয়নি। তিনি বলেন, “আমরা বিএনপির বিরুদ্ধে নয়, বরং তাদের অনুরোধ করছি- জনগণের ম্যান্ডেট মেনে সংস্কার প্রক্রিয়ায় অংশ নিন।”

তিনি আরও বলেন, “জুলাই বিপ্লব নতুন বাংলাদেশের পথ দেখিয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে নতুন প্রজন্ম আবারও আন্দোলনে নামবে, কিন্তু জুলাইয়ের চেতনার সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না।”

ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য রায়হান উদ্দীনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর বিভিন্ন সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...