ক্যানু ক্রিস্টেলস রিভার যেন রঙধনুর নদী

শাকেরা বেগম শিমু

ক্যানু ক্রিস্টেলস রিভার যেন রঙধনুর নদী

নদী হলো স্বচ্ছ পানির এক স্রোতস্বিনী ধারা, যার উৎস সুউচ্চ পাহাড় বা পর্বত থেকে এবং কোনো অথই সমুদ্রে গিয়ে মিলিত হয় । কিন্তু যদি বলি একটি নদীতে রঙধনুর সাতটি রঙের পানি একই সঙ্গে প্রবাহিত হয়, তবে এটি বিশ্বাস করতে মন চাইবে না। আজ এমনই এক আশ্চর্য নদীর কথা জানব, যেটাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নদী বলা হয়। নদীটির নাম ‘ক্যানু ক্রিস্টেলস’। তবে সাত রঙের পানি বয়ে চলার কারণে কেউ কেউ একে রঙধনু নদীও বলে।

অবস্থান : এ নদীটি উত্তর আমেরিকার একটি দেশ কলোম্বিয়ায় অবস্থিত । কলোম্বিয়ার মেটা প্রদেশের সেরেনিকা অঞ্চলের ডি লা ম্যাকারেনায় এই অসাধারণ সুন্দর নদীটির অবস্থান। সে অঞ্চলের বাসিন্দারা নদীটিকে ‘স্বর্গ থেকে প্রবাহিত নদী’ বলে অভিহিত করে। তাছাড়া এ নদীতে মাছ বা অন্য কোনো জলজ প্রাণীর বাস নেই, সে জন্য পর্যটকরা স্বচ্ছন্দে এই নদীতে সাঁতার কেটে আনন্দ উপভোগ করতে পারে। ক্যানু ক্রিস্টেলস নদীটি যে জায়গায় অবস্থিত, সেটি খুবই দুর্গম স্থান। সেখানে যাওয়ার জন্য অনেক লম্বা পথ হেঁটে পাড়ি দিতে হয়। কিন্তু তবু প্রতিবছর এখানে অনেক ভ্রমণপিপাসু পর্যটক আসেন তরল রঙধনু নামক রঙিন নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য।

বিজ্ঞাপন

উৎপত্তিস্থল : এই ‘ক্যানু ক্রিস্টেলস’ নামের (রেইনবো রিভার) নদীটি আসলে কোনো প্রধান নদী নয়। এটি মূলত ‘গায়াবেরো’ নামে এক নদী থেকে উৎপন্ন শাখা নদী। এ নদী যে জায়গায় অবস্থিত, প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে সে জায়গাটি প্রায় ১০০ কোটি বছরের চেয়েও বেশি পুরোনো। তাই একে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীনতম স্থানগুলোর একটি বলে বিবেচনা করা হয়। যে স্থানটি পার হয়ে এই নদীটির দেখা মেলে, সে স্থানটিকে বলে ‘গায়ানার বর্ম’। তাছাড়া বাহারি রঙের জন্য অনেকে এই নদীকে রঙের স্বর্গও বলে ।

ভিন্ন রঙের কারণ : কলোম্বিয়ার এই রঙিন নদীতে প্রায় রঙধনুর সাতটি রঙই মিশে রয়েছে। এখানে লাল, নীল, বেগুনি, গোলাপি, হলুদ, কালো ও ধূসর রঙের পানি দেখা যায়। এ নদীর নিম্নভাগে রয়েছে একপ্রকার রঙিন জলজ গুল্ম উদ্ভিদ, যার নাম ‘ম্যাকারেনিয়া ক্লাভিগেরা’। আর এই গাছ লাল, নীল, কমলা, হলুদ, সবুজ ইত্যাদি রঙের হয়ে থাকে। নিচের গুল্মগুলো বিভিন্ন রঙের হওয়ার কারণে সূর্যের আলোর ওপর ভিত্তি করে উপরের স্বচ্ছ পানিও নিজ রঙ পরিবর্তন করে সেই রঙ ধারণ করে। কোনো কোনো স্থানে পানির নিচে কোনো জলজ উদ্ভিদ থাকে না। সেখানে পড়ে থাকে শুধু বালু। এই বালুতে সূর্যের আলো পড়ে সেটা হয়ে যায় গাঢ় হলুদ। সে হলুদ বালু থাকার জন্য উপরের স্বচ্ছ পানিও হলুদ বর্ণ ধারণ করে। নদীর স্থানে স্থানে আবার কয়েক মিলিয়ন বছরের পুরোনো বড় বড় খনিজ পাথর থাকায় এর সৌন্দর্য নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। কখনোবা কয়েক মিলিয়ন বছরের পুরোনো এই পাথরগুলো নিজের রঙ পাল্টে ধূসর বর্ণ ধারণ করে আর যার ফলে তার উপরের স্বচ্ছ পানিও দেখতে ধূসর দেখায়। তাই আসলে এই পানির নিজস্ব কোনো রঙ নেই। এটাও অন্যান্য নদীর মতোই স্বচ্ছ পানির নদী। কিন্তু প্রকৃতির এই খেয়ালে পানির নিচের বিভিন্ন রঙের জলজ উদ্ভিদ, পানির নিচের স্বচ্ছ হলুদ বালু ও সূর্যের আলোর সঙ্গে বিক্রিয়া করে এই পানি রঙধনুর সাতরঙে রঙিন হয়ে আমাদের চোখে ধরা দেয়। এসবই প্রকৃতির খেলা ও মহান আল্লাহ পাকের কুদরতের নমুনা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন