বাঙালি মুসলমানের শিকড়প্রশ্ন

গুলজার গালিব ও মোশাররফ হোসাইন

বাঙালি মুসলমানের শিকড়প্রশ্ন

মুসলমানদের আগমনের আগে একসময় বাংলা অঞ্চলে ছিল বৌদ্ধধর্মের বিশেষ প্রভাব। বাংলায় পাল রাজারা শাসন করেছিলেন ৭৫০-১০৭৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। পাল যুগটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে আর্যপ্রভাবে তৈরি হওয়া জাতিভেদ প্রথার বিলোপ ঘটে। বহিরাগত শাসন থেকে বাংলা স্বাধীন হয়। বৌদ্ধদের বিনয় ও সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়।

পালদের পরে ক্ষমতা দখল করেন দক্ষিণ ভারত থেকে আসা সেন ব্রাহ্মণ রাজারা। সেন বংশ শাসন করে ১০৯৫ থেকে ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। বাংলার মানুষকে স্বধর্মচ্যুত করতে তারা আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক ও কর্ণকুঞ্জ থেকে সংস্কৃত পণ্ডিত এনে বাংলার সমাজ-সংস্কৃতিতে ব্রাহ্মণ্যবাদ চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। বৌদ্ধদের সাম্যের সমাজে জাতিভেদ প্রথার শ্রেণিবৈষম্য প্রতিষ্ঠা করে বৌদ্ধনিধন ছিল বাংলার ইতিহাসের এক নৃশংস-নিষ্ঠুর ঘটনা।

বিজ্ঞাপন

বাংলায় বখতিয়ার খিলজির আগমন ছিল এ দেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে জনমানুষের প্রত্যাশিত প্রতিকার এবং এক নতুন চৈতন্যের সূচনা। সেন আমলে জাতিভেদ প্রথার বৈষম্যের ফলে বাংলার নিম্নবর্গের মানুষের দুঃসহ জীবন থেকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিল মুসলিম শাসন। তাই সেন আমলে জাতিগত নিধনের শিকার বৌদ্ধরা সামাজিক ও ধর্মীয় বৈষম্যবিরোধী মুসলিম শাসনকে স্বাগত জানিয়েছিল। বহিরাগত ব্রাহ্মণ সেনদের জাতিভেদ প্রথার নিপীড়নে পিষ্ট নিম্নবর্গের হিন্দুসমাজ মুক্তি খুঁজেছিল সাম্য ও মানবিকতার উদারদর্শন নতুন এই শাসনে। ফলে বাংলায় রাজনৈতিকভাবে বিকাশ লাভ করেছিল বাংলার মুসলমান জনগোষ্ঠী। প্রথমবারের মতো বিশ্বসভ্যতার নেতৃত্বে আসা একটি নতুন সভ্যতার সঙ্গে বাংলার মানুষ পরিচিত হলো। বাংলার মুসলিম জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে একটি বিশ্ববাংলা নির্মাণের সূচনা হলো।

বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয়ের পর থেকে ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার স্বাধীন শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে পলাশির প্রান্তরে পরাজয়ের আগ পর্যন্ত মোট ৫৫০ বছর অবিচ্ছিন্নভাবে বাংলায় মুসলমান শাসকরা রাজত্ব করেন। মাঝখানে রাজা গণেশ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মহান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহকে হত্যা করে চার বছর (১৪১৪-১৪১৮) বাংলার মসনদ দখলে রেখেছিলেন। সমাজে সেন আমলের জাতিবৈষম্য ও দুঃশাসন ফিরিয়ে এনেছিলেন এবং সেনদের বৌদ্ধ নিধনের মতো ভয়াবহ মুসলিম নিধন চালিয়েছিলেন।

১৭৬৫ সালে মোগল সম্রাট শাহ আলম কর্তৃক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলা অঞ্চলের দেওয়ানি আদায়ের অধিকার দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলা অঞ্চলে বখতিয়ার খিলজি থেকে চলমান মুসলিম শাসনের পতন ঘটে। এরপর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে রাজ্য ও শাসনক্ষমতা হারানো বাংলার মুসলমানদের শুরু হয় বঞ্চনার যুগ। নতুন সমাজ-রাষ্ট্র থেকে তাদের রাখা হয় দূরে। বহিরাগত ব্রিটিশ দখলদার শক্তির আনুকূল্য ও তোষণে তাদের সহকারীর ভূমিকায় আসে হিন্দু জনগোষ্ঠী। আর নতুন করে বিজয়ী ব্রিটিশ শক্তি ও তাদের সহযোগী হিন্দু সমাজের হাতে লেখা হতে থাকে পরাজিত বাঙালি মুসলমানের পরিচয়, ইতিহাস প্রভৃতি।

‘বাঙালি মুসলমান : আত্মঅন্বেষণ’ বইয়ে নৃবিজ্ঞানী অতুল সুর তার ‘বাঙালি মুসলমানের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়’ প্রবন্ধে বাঙালি মুসলমানকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করেছেন—১. আগন্তুক মুসলমান, ২. ধর্মান্তরিত মুসলমান, ৩. উভয়ের মধ্যে সংমিশ্রিত মুসলমান। প্রথম শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে বাংলার মুসলমান শাসকগণ ও পাঠান সুলতানগণ কর্তৃক রাজ্যের উচ্চপদসমূহে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আনীত বিদেশি মুসলমানগণের বংশধরগণ। দ্বিতীয় শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে যারা স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল, বা যাদের বলপূর্বক ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়েছিল, তাদের বংশধরগণ। তৃতীয় শ্রেণি হচ্ছে উপরি-উক্ত দুই শ্রেণির সংমিশ্রণে উৎপন্ন মুসলমানগণের বংশধরগণ। এদের মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণির সংখ্যাই হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

অতুল সুরের দ্বিতীয় দাবি প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়, বাংলায় মুসলমান প্রবেশের আগে হিন্দু-বৌদ্ধের বিরোধিতা চলছিল প্রবলভাবে। হিন্দুরা বৌদ্ধদের মনে করতেন অশুভ। আর সেন রাজারা ছিলেন গোঁড়া হিন্দু। এরা বাংলায় বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বর্ণাশ্রম এবং জাত-প্রথার রীতি। আর সে কারণেই সেন রাজাদের হাতে বৌদ্ধরা হতে থাকেন নিগৃহীত। তাই ধারণা করা হয়, হিন্দু রাজাদের জুলুম থেকে রক্ষা পেতে বৌদ্ধরাই এ দেশে দলে দলে গ্রহণ করেছিলেন ইসলাম। বৌদ্ধদের দলে দলে ইসলাম গ্রহণের এই ঘটনাকে ইতিহাস বিশেষজ্ঞরা সত্য বলে গ্রহণ করেছেন। তাই অতুল সুর ‘বাঙালি মুসলমানের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়’ প্রবন্ধে জোরপূর্বক মুসলমান বানানোর যে দাবি তিনি উত্থাপন করেছেন, তা মূলত বঙ্কিমীয় আনুমানিক ব্যাখ্যা।

ওয়াকিল আহমদ এই গ্রন্থে তার ‘বাঙালি মুসলমান’ প্রবন্ধে বলেন, “বাংলায় তুর্কি রাজনৈতিক ক্ষমতা বিস্তারের আগেই সামুদ্রিক বন্দর চট্টগ্রামে আরব-বণিকদের আগমন ঘটে। পাহাড়পুরের ভগ্নাবশেষ থেকে বাদশাহ হারুনর রশীদের নামাঙ্কিত মুদ্রা পাওয়া গেছে। ঐতিহাসিকগণ মনে করেন, অষ্টম শতকের এই মুদ্রা আরব-বাণিজ্যের ব্যবসায়িক লেনদেনের ফল। বণিকদের জাহাজে চড়ে আরব-ইরানের ধর্মপ্রচারক ওলি-আউলিয়া, পীর-দরবেশ বাংলাদেশে এসেছিলেন, তা আজ নানাভাবে প্রমাণিত হয়েছে। সুফি দরবেশগণ অনেকে আস্তানা, খানকাহ, দরগাহ ও মসজিদ নির্মাণ করে স্থায়ী বসবাস আরম্ভ করেছিলেন, তারও প্রামাণিক নিদর্শন আছে। চট্টগ্রাম শহরে একটি ক্ষুদ্র ‘আরব কলোনি’র অস্তিত্বের কথা অনেকে স্বীকার করেছেন। ইসলাম ধর্ম প্রচারশীল। পীর-আউলিয়া-দরবেশ ধর্ম প্রচারের দায়িত্ব নিয়ে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েন, কেননা ধর্ম প্রচারকে তারা পবিত্র কর্ম বলে মনে করতেন। ইসলাম ধর্মনীতি ও মুসলমান সমাজব্যবস্থায় এমন কতগুলো গুণ ছিল, যা সে যুগের মানুষকে চমকিত করেছিল।”

এতেই স্পষ্ট বুঝতে পারা যায়, বাঙালি মুসলমানরা পীর-আউলিয়াদের সংস্পর্শে এসে তাদের গুণাবলিতে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম কবুল করেছিলেন।

বাঙালি মুসলমানের আত্মঅন্বেষণের এই ধারা চলমান এবং মীমাংসা-সহজ একটি বিষয়। কিন্তু ঐতিহাসিক ধূম্রজাল এটিকে কুয়াশাচ্ছন্ন করে রেখেছে। এই বাস্তবতায় মোহাম্মদ আবদুল হাই সংকলিত ‘বাঙালি মুসলমান : আত্মঅন্বেষণ’ গ্রন্থে বিশেষজ্ঞদের গবেষণালব্ধ প্রবন্ধসমূহে এর উন্মোচনের প্রয়াস রয়েছে।

সংকলনে রয়েছে অতুল সুর, কাজী আবদুল ওদুদ, গোলাম মুরশিদ, সুফিয়া আহমেদ, এস ওয়াজেদ আলী, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, সালাহ উদ্দিন আহমেদ, ওয়াকিল আহমদ, আবুল হুসেন, হুমায়ুন কবির, আমিনুল ইসলাম, আবুল ফজল, যতীন সরকার, ডক্টর এসএম লুৎফর রহমান, এমএ রহিম, অসীম রায়, আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ, শামসুজ্জামান খান, ইসরাইল খান, আবদুল হক, আহমদ ছফা, হাসান মাহমুদ, সলিমুল্লাহ খান ও মোহাম্মদ আজম। আলোচিত হয়েছে বাঙালি মুসলমানের নৃতত্ত্ব, পরিচয়, শিক্ষা, অর্থনীতি, সমাজ-রাজনীতি, ভাষা-সাহিত্য, কালচার, বংশ, ইতিহাসচর্চা, উৎসব প্রভৃতি বিষয়াবলি।

বাঙালি মুসলমান তথা বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বা গণতান্ত্রিক জনগণের পরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে এই বই গুরুত্ব রাখে। নতুন যুগের সত্যসন্ধানী ঐতিহাসিকদের কাছে কোনো কোনো লেখকের বক্তব্য প্রশ্নের আওতায় থাকলেও ইতিহাস চর্চার এই ধারা বেগবান করবে এই বই। মোহাম্মদ আবদুল হাই ভূমিকাংশে বহুমত উপস্থিত করলেও এ বিষয়ে তিনি পাঠককে পরিচয় উপহার দিতে পেরেছেন কি না, সেটা লক্ষ্যযোগ্য। তবে বিশেষভাবে ওয়াকিল আহমদের দীর্ঘ প্রবন্ধটি বাস্তবঘনিষ্ঠ। তিনি ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠার নিরপেক্ষতা রক্ষা করেছেন বলে পাঠক মনে করবেন।

বই : বাঙালি মুসলমান : আত্মঅন্বেষণ

সম্পাদনা ও ভূমিকা : মোহাম্মদ আবদুল হাই

ধরন : নন-ফিকশন, সংকলন

প্রকাশক : সূচীপত্র

পৃষ্ঠা : ৭৩৬

বইয়ের মূল্য : ১৪০০ টাকা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন