আবু ফাতেমা মুহাম্মদ ইসহাক

নতুন যুগের আলোয় খুঁজি

বাইজিদ আহমাদ

নতুন যুগের আলোয় খুঁজি

২৩ মার্চ, দুই হাজার ছাব্বিশ। তড়িঘড়ি করে নাশতা সেরে বেরিয়ে পড়ি সকাল সকাল। গন্তব্য মোমেনশাহী জেলার এক নিভৃতপল্লি। ভৈরব থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টা সিএনজি করে পৌঁছাই কিশোরগঞ্জ সদর। তারপর অটোযোগে নান্দাইল নতুন বাজার। সেখানে অপেক্ষায় ছিলেন মুহাম্মদ উমারা হাবীব। জাতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও বিকাশে বৃহত্তর মোমেনশাহী অঞ্চলের মনীষীদের নিয়ে কাজ করার স্বপ্ন লালন করে তিনি গ্রামের পর গ্রাম চষে বেড়াচ্ছেন। আমার সৌভাগ্য—মাঝেমধ্যে তার সঙ্গে জোড়ার সুযোগ হয়ে যাচ্ছে। এর আগে আমি তার সঙ্গে গিয়েছিলাম দেশী সাহিত্য সংগ্রাহক ও গবেষক কবি রওশন ইজদানির গ্রামের বাড়ি; নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া থানার বিদ্যাবল্লভ গ্রামে। উমারা হাবীবও এ গ্রামেরই সন্তান। ইজদানির জীবনচরিত উদ্ধার করতে গিয়ে তিনি আমাকে জানালেন আরেক বিস্মৃত মনীষীর কথা—আবু ফাতেমা মুহাম্মদ ইসহাক। আমাদের গন্তব্য আপাতত তারই গ্রামের বাড়ি।

নান্দাইলে আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন আবু ফাতেমার নাতি পিপুল খন্দকার। পিপুল ভাইয়ের সঙ্গে মোটরসাইকেলে দত্তগ্রাম; সেখান থেকে আবার অটোযোগে ভাঙাচোরা মেঠোপথ পেরিয়ে অবশেষে আমরা লেখকের পৈতৃক ভিটা বড়ইবাড়ি গ্রামে পৌঁছাই। ছবির মতো সুন্দর গ্রাম। চারপাশে সবুজের সমারোহ। বাড়ির পাশেই মসজিদের সামনে গাছগাছালির ছায়ায় ঘেরা কবরস্থান। সেখানে শুয়ে আছেন আবু ফাতেমা মুহাম্মদ ইসহাক। আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন লেখকপুত্র বুলবুল মাস্টার। তিনিও বৃদ্ধ। অসুস্থতায় জর্জরিত। গ্রামে থাকেন না; আজ শহরে চলে যাওয়ার কথা। কেবল আমাদের জন্য রয়ে গেছেন।

বিজ্ঞাপন

প্রাথমিক আলাপের পর আর দেরি করেননি। আমাদের কৌতূহল বুঝে আলমারি খুলে একে একে বের করে আনলেন দুর্লভ সব পাণ্ডুলিপি। আমি বিস্মিত হয়ে দেখি—ধর্ম, দর্শন, ইতিহাস, সমাজ, সাহিত্য, চিঠিপত্র, জীবনচরিত, সমালোচনাসহ সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে তিনি কলম ধরেননি। রচনার ভাষা ও বিন্যাসে যে পরিমিতি লক্ষ করা যায়, তা সমসাময়িক অনেক লেখক থেকে তাকে এগিয়ে রাখে।

আমি ক্রমশ অনুশোচনায় ডুবতে থাকি—এমন সৃজনশীল লেখককে এতদিন চিনলাম না। আমার পাশের জেলার মানুষ। পাণ্ডুলিপির ভেতর মগ্ন হয়ে কখন জোহরের সময় হয় টেরই পাই না। নামাজের পর আমরা আবার বসি। এই ফাঁকে নাশতা আসে। বারবার না না সত্ত্বেও বুলবুল মাস্টার দুপুরে না খেয়ে যেতে দেবেন না। নানা পদের তরকারি দিয়ে আমরা দুপুরে ভাত খাই। খাওয়া শেষে দরকারি কিছু ছবি তুলি। কয়েকটা পাণ্ডুলিপি ফটোকপি করার জন্য আলাদা করি। হঠাৎ উমারা হাবীব বলেন, তার ব্যক্তিগত সংগ্রহটাও দেখা প্রয়োজন। পাশের ঘরে গিয়ে দেখি পুরোনো কাঠের আলমারিতে জমেছে ধুলোর আস্তরণ। কপাট সরাতে গেলে শব্দ করে জানান দেয়, বহু দিন মানুষের হাত লাগেনি। ধুলো ঝেড়ে একে একে আবিষ্কার করি দুষ্প্রাপ্য সব বইপত্র, যার অধিকাংশই বহু বছর ধরে আউট অব প্রিন্ট। এছাড়া প্রখ্যাত অনেক লেখকের অটোগ্রাফসহ কিছু বই।

বেলায় বেলায় কখন বিকাল ঘনিয়ে আসে টের পাই না। আমার এদিকে বাড়ি ফেরার তাড়া। বুলবুল মাস্টারও শহরে চলে যাবেন। আমরা একসঙ্গেই বের হই। বুলবুল মাস্টারের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। প্রগতির নামে ঐহিত্যবিরোধী সমাজ তাকে আড়াল করার চেষ্টা করলেও তিনি যত্ন করে তুলে রেখেছেন প্রতিটি কাজ। আবেগতাড়িত হয়ে তিনি বলছিলেন, যদি এগুলো নতুন করে প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া যেত, মৃত্যুর আগে দেখে যেতে পারলে শান্তি পেতাম। আমরা আশ্বাস দিই—অচিরেই নতুন করে পাঠকসমাজে পৌঁছানোর উদ্যোগ নেব।

২.

অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তার সাহিত্যজীবনের শুরু; প্রারম্ভিক রচনার মধ্যে ‘ধীরা’ (গল্প), ‘নবজাগরণ’ (নাটক) ও কয়েকটি একাঙ্কিকা উল্লেখযোগ্য। পরে তিনি কবিতা, প্রবন্ধ, সমালোচনা, ইতিহাস ও জীবনচরিতসহ নানা বিষয়ে লেখালেখি করেন। ‘বিতর্ক বিচিত্রা’ গ্রন্থের মুখবন্ধে তিনি সাহিত্যচর্চার প্রেরণা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘সত্য ও সুন্দর অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে সাহিত্যজগতে প্রবেশ করলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ভিত্তিক সংকীর্ণতার চিত্র প্রত্যক্ষ করি। বইপুস্তকাদি পাঠ করতে করতে ক্রমশ লেখক-লেখিকাদের মনমানসিকতার সঙ্গে পরিচিত হতে থাকি এবং আমার পূর্বধারণাও ক্রমশ বদলে যেতে থাকে। দেখতে পাই যে, কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীরা সাধারণত স্ব স্ব সম্প্রদায়ের গণ্ডিরেখার মধ্য থেকে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিকাশে ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশে খুবই তৎপর। শুধু তা-ই নয়, অপর সম্প্রদায়ের শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে ছোট করে দেখার এবং অপর সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হেয় প্রতিপন্ন করার একটা প্রবণতাও তাদের সাহিত্য শিল্পকর্মের মধ্যে সুস্পষ্ট রয়েছে। সাম্প্রদায়িক গণ্ডিরেখা অতিক্রম করে দুনিয়ার সব সম্প্রদায়ের, সব জাতির সব মানুষকে আপন করে দেখার কোনো বিশেষ পরিচয় তাদের অনেকের সাহিত্যকর্মের মধ্যে লক্ষ্যগোচর হয় না, বরং লক্ষ্যগোচর হয় বিদুষ্ট মনের। এসব দেখেশুনে আমার মনে কবি-সাহিত্যিকদের এরূপ মনোবৃত্তির বিরুদ্ধে কথা বলার স্পৃহা জেগে ওঠে।’

১৩৬১ বঙ্গাব্দে ‘দৈনিক আজাদ’-এ তার প্রথম রচনা প্রকাশিত হয়; পরবর্তী সময়ে ‘মাসিক মদীনা’-সহ বিভিন্ন পত্রিকায় তার গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। বিশেষভাবে ১৯৬৭-৬৯ সালে ‘মাসিক মদীনা’য় মুসলিম রেনেসাঁ ও নজরুল-বিষয়ক তার প্রবন্ধগুলো ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় এবং ১৯৬২-৬৫ সালে রবীন্দ্রনাথ, হিন্দু ধর্ম ও জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে তার গবেষণামূলক লেখা ‘দৈনিক আজাদ’, ‘দৈনিক ইত্তেফাক’, ‘মোহাম্মদী’ ও ‘আল-ইসলাহ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়—যে সময় বাংলা সাহিত্য জগতে মতাদর্শগত বিভাজন তীব্র হয়ে উঠেছিল। দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি ‘দৈনিক আজাদ’, ‘ইত্তেফাক’, ‘সংগ্রাম’, ‘দেশ’, ‘পয়গাম’ প্রভৃতি পত্রিকার পাশাপাশি ‘মোহাম্মদী’, ‘আল-ইসলাহ’, ‘জাগরণ’, ‘মদীনা’, ‘নেদায়ে ইসলাম’ ও ‘নওরোজ’-এ নিয়মিত লিখেছেন। আদর্শনিষ্ঠ ও মননশীল ধারার একজন উত্তরসূরি হিসেবে তার রচনায় ধর্ম, সমাজ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সমন্বিত রূপ স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। যদিও পরবর্তী সময়ে কথিত সাহিত্য সমাজের নানা অবহেলা ও যথাযথ চর্চার অভাবে তার রচনাকর্ম পাঠকচক্ষুর আড়াল হয়ে যায় এবং একটা সময় তার বইগুলোর নামোদ্ধার পর্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

অনুসন্ধানের পর আমরা প্রকাশিত ১৫টি বইয়ের তালিকা পাই এবং একজন জীবনীকার দাবি করেন—সমপরিমাণ গ্রন্থ অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। পরে আমরা লেখকপুত্রের হেফাজতে রাখা যেসব বইয়ের খোঁজ পাই (প্রকাশিত, অপ্রকাশিত), সেগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ পেশ করছি। প্রকাশিত (প্রাপ্ত) গ্রন্থগুলো—

১. ‘রবীন্দ্রনাথ, হিন্দুধর্ম ও হিন্দু জাতীয়তাবাদ’ বইটির প্রকাশকাল ১৪ আশ্বিন, ১৩৭৬ বাংলা, ১ অক্টোবর ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দ। প্রকাশক ডা. মোহাম্মদ ইদ্রিস আলী, সেক্রেটারি, আঠারবাড়ী হাই স্কুল। মুদ্রাকর মো. আবদুল জব্বার বিএ, ইউনিয়ন প্রেস, কিশোরগঞ্জ। মূল্য ছিল দেড় টাকা। উৎসর্গপত্রে লিখেছেন—‘মহত্তম ব্যক্তিত্বের অধিকারী, পরমতসহিষ্ণু ও উদারপ্রাণ সুসাহিত্যিক জনাব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী সাহেব সমীপে— মোহতারেম, আমার এইটুকু জীবনে আমি আমাদের দেশের বহু মশহুর সাহিত্যিকের সোহবতে যেয়ে বহু মূল্যবান কথা শুনেছি, কিন্তু কারো কাছেই আমার নিজের কথা বলতে পারিনি। আপনার কাছে প্রায়ই আমি যেতুম এবং আপনার সারগর্ভ, তত্ত্ব ও তথ্যপূর্ণ আলাপ-আলোচনা হৃদয় দিয়ে শুনতুম, গোগ্রাসে গিলতুম; আর ফাঁকে ফাঁকে আপনার সমীপে আমার নিজের কথাও পেশ করতুম। আমার অনেক হালকা কথাও আপনি ধৈর্যসহকারে শুনতেন। কথা হতো প্রায়ই রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। আমার মতের সঙ্গে আপনি একমত হতে না পারলেও অসীম ধৈর্য ধরে তা শুনে যেতেন। আমি যেন রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আমার মনের কথাটি গুছিয়েগাছিয়ে বলতে পারতুম না। এখনো যে পারছি তা বলা চলে না। তবু আমার এই অগোছালো ছাপানো বলা-কওয়া আপনার দস্ত মোবারকে তুলে দিচ্ছি। গ্রহণ করে আমায় কৃতার্থ করুন। ইতি, বিনীত—আবু ফাতেমা মোহাম্মদ ইসহাক, আঠারবাড়ী, ১/১০/৬৯।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে এ বইয়ে লেখক স্বতন্ত্র, তথ্যসমৃদ্ধ ও বিতর্ক-নিরপেক্ষ পর্যালোচনা উপস্থাপন করেছেন; যেখানে তিনি সমকালীন পক্ষ-বিপক্ষ বিভাজনের বাইরে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রসাহিত্যের গভীর ও বিশ্লেষণধর্মী মূল্যায়ন করেন। পরবর্তী সময়ে বইটির নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘অনুদ্ঘাটিত রবীন্দ্র কবিমানস’।

২. ‘কবি লায়লা রাগিব’—সিলেটের বিস্মৃতপ্রায় মুসলিম নারী কবি লায়লা রাগিবের জীবন ও সাহিত্যের ওপর বইটি প্রকাশিত হয় আশ্বিন ১৩৯৭ বাংলা, রবিউল আউয়াল ১৪১১ হিজরি, অক্টোবর ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে। লায়লা রাগিব ছিলেন কবি সুফিয়া কামালের সমসাময়িক এবং সে সময়ের সৃজনশীল সাহিত্য ঘরানার মেধাবী প্রাণ। কবির হঠাৎ মৃত্যুতে আবু ফাতেমা মুহাম্মদ ইসহাক ভীষণ মর্মাহত হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে লায়লা রাগিবকে নিয়ে তিনি শোকগাথা রচনা করেছেন আরেক বইয়ের উৎসর্গপত্রে। বইটি প্রকাশিত হয় সিলেট থেকে। মূল্য ছিল ৪৫ টাকা মাত্র। বইটির ভূমিকা লিখেছিলেন কবি আল মাহমুদ— ‘কবি লায়লার নাম আমি আমার সিলেটের কবি বন্ধুদের কাছে প্রথম জেনেছিলাম। পরে তার কিছু কবিতা পড়ে বুঝতে পারি এই কবি এমন একটি ঘরোয়া কাব্যভাষা আয়ত্ত করতে চাইছেন, যা কবিরা সাধারণত অভিজ্ঞতায় পূর্ণ না হলে লিখতে পারেন না। পাঠকের সচেতনতা নিয়ে এই কবির রচনার জন্য বলা যায় আমি অপেক্ষমাণ ছিলাম। এর মধ্যে লায়লা আমার পরিচিত এবং প্রিয় লেখক রাগিব হোসেন চৌধুরীকে বিয়ে করলে আমি উৎফুল্ল হই। কারণ রাগিবকে লেখক, কবি ও সমালোচক হিসেবে আমি আমার আত্মীয় এবং অন্তরঙ্গ ভেবে এসেছি। এই সূত্রেই একবার সস্ত্রীক সিলেটে বেড়াতে গেলে লায়লা ও রাগিবের আমন্ত্রণে তাদের বাসায় যাই। সেখানেই লায়লার সঙ্গে আমার প্রকৃত পরিচয় ঘটে। তার অমায়িক ব্যবহারে আমরা মুগ্ধ হয়ে ফিরে আসি। তবে এখানে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন—এর আগেও কবি লায়লার সঙ্গে আমার সিলেটে প্রথম দেখা হয় তার পিত্রালয়ে। যাহোক এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, সিলেটবাসীর মতো আমাদের মনেও লায়লার কবিপ্রতিভা আশা জাগিয়ে তুলেছিল। এই আশার ঝলকানির মধ্যেই সহসা তার মৃত্যু সংবাদ যখন আমার কাছে পৌঁছাল তখন কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়েছিলাম। মৃত্যু যে কতটা বেদনাদায়ক হতে পারে, লায়লার অকাল প্রয়াণ তা আমাদের জানান দিয়ে গেল। আজ লায়লার ওপর যে গ্রন্থটি প্রবীণ সাহিত্যিক আবু ফাতেমা মুহাম্মদ ইসহাক তৈরি করেছেন—এর কিছু অংশ পাঠ করে মনে হচ্ছে, তার মৃত্যুতে আমাদের সাহিত্য সত্যিই ক্ষতিগ্রস্ত। এ ক্ষতি শোক প্রকাশে ঢাকা পড়ার বিষয় নয়। এ হলো হৃদয়ের রক্তক্ষরণের মতো, যার উপশম নেই। লায়লার মতো কবিহৃদয় নিয়ে খুব বেশি নারী বাংলাদেশে জন্মাননি। কোনো কবিরই অকাল মৃত্যুকে আমি সইতে পারি না। আর লায়লা তো ছিলেন আমাদের পরিবারের পরিচিতা আত্মীয়ার মতো। তার কিছু রচনার মধ্যে তিনি থাকবেন অসমাপ্তের মতো, এ কথা মন মানতে চায় না। এ ধরনের কবিরা কেন যে পৃথিবীতে আসেন তা এক রহস্যময় বিষয় বটে। লায়লার ওপর প্রকাশিত এই বইটি এক অসমাপ্ত কবিহৃদয়ের কিঞ্চিৎ পরিচয় হিসেবে অত্যন্ত মূল্যবান দলিল। বইটি আমাদের কাছে থাকলে অন্তত এ কথা অনুভব করতে ভালো লাগবে যে, তিনি আছেন। আমাদের মধ্যেই আছেন। মৃত্যু একজন প্রকৃত কবিকে শেষ পর্যন্ত নিঃশেষে মুছে ফেলার মতো ক্ষমতাশালী নয়। —আল মাহমুদ, ২৮/৫/৯০’

৩. ‘মুজাদ্দিদে তরিকত কুতুবুল আকতাব শাহ ছুফি হজরত মাওলানা আবদুল গফুর (রহ.) (ভোলা, বরিশাল) এবং তরিকা সোপান’—ব্যক্তিগতভাবে আবু ফাতেমা মুহাম্মদ ইসহাক ছিলেন তাসাউফপন্থি মানুষ। খানকাহ ও পীর-বুজুর্গের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ ছিল। জানা যায়, তিনি ফুরফুরা দরবারের মুরিদ ছিলেন। এ বইটি মূলত ‘বরিশালী হুজুর’ খ্যাত মাওলানা আবদুল গফুর (রহ.)-এর জীবনী। প্রকাশকাল ১৪০১ বাংলা, ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দ। প্রকাশক মাওলানা আফজাল হোছাইন। যিনি পীর সাহেবের ছেলে এবং চরফ্যাশন কুচিয়া মোরাছিনিয়া মাদরাসার (ভোলা) প্রভাষক ছিলেন। দাম ৪০ টাকা। উৎসর্গপত্রে লিখেছেন বর্তমান গদ্দীনশীন সাহেবজাদা হুজুর কেবলা শাহসুফি হজরত মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম ছাহেবের দস্ত মোবারকে। তারপর ভূমিকাস্বরূপ উল্লেখ আছে— ‘আচ্ছালামো আলাইকুম, বেরাদরানে ইছলাম, পাক-ভারত-বাংলাদেশ উপমহাদেশের তৎকালের বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ অলি কুতবুল ইরশাদ হাদিয়ে জামান মুজাদ্দিদে তরিকত হজরত মাওলানা আব্দুল গফুর (রহ.) ছাহেবের সংক্ষিপ্ত জীবনী বর্তমান জামানায় আমাদের জনসাধারণের পথের দিশারি হিসেবে আল্লাহ ও তাহার রাসুল (সা.) নৈকট্য লাভের জন্য খুবই জরুরি মনে করিয়া এ কিতাব মুদ্রণ করার প্রয়াসী হয়েছি। আমি মনে করি, এই ক্ষুদ্র কিতাবখানা পড়ে বাংলাদেশের মানুষ আপাতত ভুলে যাওয়া স্মৃতি স্মরণ করে এলমে মারেফাত দীন ও দুনিয়ার সর্বপ্রকারের ভালায়ি হাছিল করতে সক্ষম হবেন। ইহাতে আমার এই নগণ্য শ্রম সার্থক হবে বলে আশা করছি।’

আগামী সংখ্যায় শেষ পর্ব

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন