সোনারগাঁয়ের পানাম বাজারের যেখানটায় প্রতিদিন সকালবেলা চাষিরা মাঠ থেকে তোলা বহু ধরনের শাক আর তাজা সবজি নিয়ে সারি দিয়ে বসেন, সেখান থেকে একটু পশ্চিমে এগোলে লাল ইটের একটি সেতু দেখা যায়। মানুষ চলাচলের উপযোগী হলেও একধরনের পরিত্যক্ত পড়ে আছে সেতুটি। অযত্ন আর সংস্কারের অভাবে বিভিন্ন স্থান থেকে খসে পড়েছে পলেস্তারা। কোথাও বেড়ে উঠেছে লতানো ঘাসপাতা আর পরজীবী নানা উদ্ভিদ। প্রথম দেখাতেই বোঝা যায়, বয়স হয়েছে সেতুটির। সেতুর নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে পানায় ভরা একটি খাল। খালটির নাম পঙ্খিরাজ। মেঘনার সঙ্গে পানামনগরের সংযোগ রক্ষা করা প্রাচীন বাণিজ্যের অন্যতম রুট ছিল এই পঙ্খিরাজ খাল। অবৈধ দখলদারদের কবলে পড়ে খালটির অস্তিত্বও বিলীন হয়ে যেতে বসেছে।
মোগল সাম্রাজ্যের প্রত্যক্ষ শাসনে আসার পর মোগলরা সোনারগাঁতে বেশ কিছু সড়ক ও সেতু নির্মাণ করে। ফলে সোনারগাঁ ও পানাম শহর নতুন রূপে আলোকিত হয়ে ওঠে। তিনটি সেতুসহ সোনারগাঁ এলাকার বেশ কয়েকটি মোগল স্থাপনা বর্তমানে সময়ে অক্ষত রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো পানাম সেতু। সেতুটির প্রকৃত নির্মাণকাল-সংক্রান্ত কোনো প্রামাণ্য শিলালিপি না থাকলেও স্থাপত্যরীতি বিবেচনা করে ঐতিহাসিকরা এটিকে মোগল আমলেÑঅর্থাৎ সপ্তদশ শতকে নির্মিত স্থাপনা হিসেবে একমত হয়েছেন। সেতুর মধ্যবর্তী খিলানটি অন্য দুটি অপেক্ষা উঁচু এবং প্রশস্ত।
প্রথম অবস্থায় সেতুটি ‘কোম্পানী কে গঞ্জ কা পুল’ (কোম্পানীগঞ্জের সেতু) নামে পরিচিত ছিল। ১৭৩ ফুট দীর্ঘ এবং ১৪ ফুট প্রশস্ত তিন খিলানের এই সেতুর মধ্যবর্তী খিলানটি অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত ও উঁচু। ফলে এর তলা দিয়ে সহজে নৌকা চলাচল করতে পারে। সেতুপথটি বৃত্তাকারে সন্নিবেশিত ইটের গাঁথুনিতে খাঁড়াভাবে তৈরি।
বর্তমানে দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অযত্নে সেতুটি ধীরে ধীরে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। এর উপর দিয়ে এখন আর কোনো যানবাহন চলাচল করে না। পথচারীরাও কালে-ভদ্রে এই সেতুর ওপর পা রাখে। জীর্ণ ও ভগ্নদশায় দাঁড়িয়ে থাকা এই সেতুটি ইতিহাসপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে গভীর বেদনার সঞ্চার করে। ঐতিহাসিক পানামনগরের পাশে পঙ্খিরাজ খালের ওপর নির্মিত এ প্রাচীন সেতুটি চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় কয়েক বছর আগে এর পাশেই একটি বিকল্প সেতু নির্মাণ করা হয়। এর ফলে মোগল আমলের ঐতিহাসিক পানাম সেতুর ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

