বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে উন্নয়নের নামে অনিয়ম, ভুয়া প্রকল্প ও অর্থ লুটপাটের মাধ্যমে ঢাকা জেলা পরিষদ ‘দুর্নীতির আখড়ায়’ পরিণত হয়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। শত শত একর জমি বেহাত, অর্ধসমাপ্ত মেগা প্রকল্প ও সরকারি সম্পদের অব্যবস্থাপনা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি পরিবর্তনের আশ্বাস দিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছে।
জেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, ঢাকা জেলার পাঁচটি উপজেলা এবং রাজধানীর মোট ২০টি সংসদীয় আসনের আওতায় প্রায় ৪০৫ একর জমি বর্তমানে বেহাত অবস্থায় রয়েছে। এসব জমি অতীতে নামমাত্র মূল্যে লিজ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন উপজেলায় একাধিক ডাকবাংলো ও অডিটোরিয়ামও বেদখল অবস্থায় পড়ে আছে।
কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা ইউনিয়নে প্রায় এক কোটি সাত লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত শহীদ জিয়া অডিটোরিয়াম কাম-কমিউনিটি সেন্টার বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা সেখানে মাছের বাজার বসিয়েছেন। একইভাবে জিনজিরা ইউনিয়নে সাত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত জেলা পরিষদ অডিটোরিয়াম ২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় লুটপাটের শিকার হয়। এরপর থেকে ভবনটি অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে এবং সেখানে মাদক কার্যক্রমের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদিকে, কেরানীগঞ্জের কালিগঞ্জ জেলা পরিষদ মার্কেটে নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ করে ৬৮টি অবৈধ দোকান বিক্রির অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
সবচেয়ে বড় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে জেলা পরিষদের নির্মাণাধীন ২০ তলাবিশিষ্ট অফিস কাম বাণিজ্যিক ভবন ‘ঢাকা টাওয়ার’ প্রকল্পে। ২০১১ সালে পুরান ঢাকার ৪৬-৪৭ জনসন রোডে পুরোনো ভবন ভেঙে নতুন বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১৪৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, কিন্তু টেন্ডার দেওয়া হয় প্রায় ১৬০ কোটি ২৬ লাখ টাকায়। যা এককভাবে দেওয়া হয় আওয়ামী লীগ নেতা মির্জা আজমের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশনকে।
২০১৫ সালে নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ১১ বছর পরও প্রকল্পটি অসমাপ্ত। এ পর্যন্ত আটটি বিলের মাধ্যমে প্রায় ৫৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ঠিকাদারের বিল পরিশোধ করেছে ঢাকা জেলা পরিষদ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে নির্মাণাধীন ঢাকা জেলা পরিষদের ঢাকা টাওয়ার। ভবনের ২০টি ছাদ নির্মাণ ছাড়া তেমন কোনো কাজ এগোয়নি। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, দোকান বরাদ্দের জন্য শতাধিক ব্যক্তি প্রায় ৬০ কোটি টাকা জমা দিয়েছেন, কিন্তু দীর্ঘদিনেও কোনো অগ্রগতি নেই। তারা দীর্ঘ ১১ বছর ধরে অপেক্ষায় আছেন। জমা টাকা কীভাবে ফেরত পাবেন তা নিয়ে তারা সংশয় প্রকাশ করছেন।
জেলা পরিষদের এক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঢাকা জেলা পরিষদের নির্মাণাধীন ২০ তলা ভবনের দুটি বেজমেন্ট (১৬৬টি কার পার্কিংয়ের সুবিধাসহ, প্রথম তলা থেকে অষ্টম তলা পর্যন্ত দোকান, গার্মেন্ট, ইলেকট্রিক, স্বর্ণ, জুয়েলারি, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় ৩৩৫ আসন বিশিষ্ট দুটি কনভেনশন সেন্টার, নবম তলায় ফুড কোট, দশম তলায় জেলা পরিষদের নিজস্ব অফিস, ১১ তলা হতে ১৮ তলা পর্যন্ত বাণিজ্যিক স্পেস বরাদ্দ (ব্যাংক, বিমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান), ১৯ তলায় জেলা পরিষদের রেস্টহাউজ, ২০ তলায় ১০০০ আসন বিশিষ্ট অডিটোরিয়ামসহ আধুনিক সব সুবিধা থাকার কথা ছিল। এছাড়া ভবনটি ব্যবহারের জন্য পাঁচটি লিফট ও এক জোড়া এস্কেলেটর সুবিধা থাকার কথা রয়েছে। ভবনের মোট স্পেস তিন লাখ ৬৮ হাজার বর্গফুট।
তিনি আরো জানান, ঢাকা টাওয়ারের নির্মাণকাজ তমা কনস্ট্রাকশনকে দেওয়া হলেও এর মূল দায়িত্বে ছিল আওয়ামী লীগের সাবেক প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম। রাজউকের অনুমোদন ছাড়া শুধু নকশা তৈরি করে ২০ তলা ভবনের কাজ শুরু করা হয়েছিল। ২০১৭ সালে টাওয়ার নির্মাণে দুর্নীতি ও অনিয়ম সরকারের নজরে আসে। তবে সে সময় ঢাকা জেলা পরিষদ থেকে ঢাকা টাওয়ার ভবন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সব নথি গায়েব হয়ে যায়। এর সঙ্গে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও জেলা পরিষদের একটি কুচক্রী মহল জড়িত রয়েছে।
এ ব্যাপারে নির্মাণাধীন প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশনে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির এইচআর পরিচালক আব্দুল কাদের জানান, মন্ত্রণালয় টাকা ছাড় না দেওয়ায় ২০১৭ সাল থেকে কাজ বন্ধ রয়েছে। জেলা পরিষদের কাছে আমাদের যে পরিমাণ টাকা পাওনা রয়েছে, তা দেওয়া হলে কাজ শেষ করা সম্ভব। তিনি ভবন তৈরিতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও মির্জা আজমের বিরুদ্ধে কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
ঢাকা জেলা পরিষদের বর্তমান প্রশাসক ইয়াসিন ফেরদৌস মুরাদ আমার দেশকে জানান, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। তিনি বলেন, রাঘব বোয়ালদের কাছে বেহাত হওয়া জমি উদ্ধার এবং অসমাপ্ত ‘ঢাকা টাওয়ার’ প্রকল্প দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, বিগত দিনে উন্নয়নের নামে ভুয়া কাজের মাধ্যমে ব্যাপক অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদনে পার্সেন্টেজ বা কমিশনের সংস্কৃতি চালু রয়েছে ঢাকা জেলা পরিষদে। ব্যাপক অর্থ লুটপাট ও সম্পত্তি বেহাত হওয়ার মাধ্যমে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রশাসক আরো বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করা হয়েছে। কোনো ধরনের কমিশন বা পার্সেন্টেজ সংস্কৃতি বরদাশত করা হবে না। প্রতিটি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।
তিনি বলেন, ঢাকা জেলাবাসীর প্রত্যাশা অনেক। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করব। একই সঙ্গে তিনি নাগরিক প্রতিনিধি, শিক্ষক ও ব্যবসায়ীদের মতামত নিয়ে ‘কেমন ঢাকা জেলা পরিষদ চাই’ শীর্ষক উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

