বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলা নিয়ে কুয়ালালামপুরে যাচ্ছে সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। আজ মঙ্গলবার চারদিনের সফরে কুয়ালালামপুর যাবে প্রতিনিধি দলটি। প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসী কল্যাণবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন এ প্রতিনিধিদলে রয়েছেন। সেখানে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক হবে বলে নিশ্চিত করেছে মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র। তবে বাজার খোলা নিয়ে মালয়েশিয়া জনশক্তি রপ্তানি ইস্যুতে জড়িত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে করা মামলার বিষয়ও গুরুত্ব পেতে পারে।
সূত্রমতে, শ্রমবাজারটি খোলা নিয়ে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদবিষয়ক মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক এবং পরবর্তীতে সে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবেন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশি কর্মীদের অন্যতম প্রধান এই শ্রমবাজার বন্ধ থাকায় শ্রম রপ্তানি ও অর্থনৈতিকভাবে বেগ পেতে হচ্ছে সরকারকে। বারবার উদ্যোগ নিয়েও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এ দেশ থেকে খালি হাতে ফিরে আসতে হয়েছে ঢাকাকে। তবে বাজারটি খোলা নিয়ে মন্ত্রণালয়, হাইকমিশনসহ সব চ্যানেল থেকে মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ। কিন্তু মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে এ নিয়ে ধূম্রজাল যেন কাটছেই না।
একাধিক সূত্রের তথ্যানুযায়ী, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে বন্ধ হয়ে যাওয়া এই শ্রমবাজার চালু করতে সরকারে যারা আসেন, তাদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে মালয়েশিয়ার দেওয়া শর্ত ও জটিলতার কারণে শ্রমবাজার খোলা নিয়ে আলোচনা প্রাথমিকভাবে তেমন ফলপ্রসূ না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, শর্ত নিয়ে মালয়েশিয়া এখনো স্পষ্ট কিছু জানায়নি, বরং নানা টালবাহানা করে যাচ্ছে। এছাড়া আলোচনার টেবিলে মালয়েশিয়া জনশক্তি রপ্তানি ইস্যুতে জড়িত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে করা মামলার বিষয়ও গুরুত্ব পেতে পারে। তবে কীভাবে বাজার খোলা যায়, তা নিয়ে বারবার চেষ্টা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত রয়েছে ঢাকা।
এর আগে আটকেপড়া কর্মীদের বোয়েসেলের মাধ্যমে পুনরায় পাঠানোর জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে এসব কর্মী নিয়ে প্রথম ফ্লাইট মালয়েশিয়ায় গেলেও প্রক্রিয়াটি এখনো ধীরগতির।
এদিকে শ্রমবাজার খোলা প্রসঙ্গে মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে দেওয়া ১০ শর্তের মধ্যে তিনটি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল রিক্রুটিং এজেন্সিদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা)। পরে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ও এই শর্তগুলো শিথিলের জন্য মালয়েশিয়া সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছিল। আপত্তিকৃত শর্তগুলো হলোÑগত পাঁচ বছরে অন্তত তিন হাজার কর্মী পাঠানো হয়, সব ধরনের সুবিধাসহ নিজস্ব প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা আছে, অন্তত ১০ হাজার স্কয়ার ফিটের নিজস্ব অফিস আছে ।
জেজি আল-ফালাহ্ ম্যানেজমেন্টের স্বত্বাধিকারী সোহেল রানা আমার দেশকে বলেন, বন্ধ হওয়া মালয়েশিয়া শ্রমবাজার নিয়ে সরকারের উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। কারণ, এ বাজারটি বন্ধ থাকায় জনশক্তি রপ্তানির বড় একটি জায়গা হাতছাড়া হয়ে গেছে বাংলাদেশের।
তিনি বলেন, এক রিক্রুটিং এজেন্সি আরেকটি রিক্রুটিং এজেন্সির ওপর মানব পাচার মামলা করা হাস্যকর। এটা হতে পারে না। এসব কারণে আমাদের সঙ্গে মালয়েশিয়ার সম্মান নষ্ট হয়েছে। তাই আলোচনার টেবিলে মামলা ইস্যু গুরুত্ব পাওয়া স্বাভাবিক।
বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ থাকায় আমদের দেশে জনশক্তি রপ্তানি খাতে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। আর যেন কোনো সিন্ডিকেট তৈরির সুযোগ দেওয়া না হয়। আমরা চাই যাদের সক্ষমতা আছে, যোগ্যতার ভিত্তিতে সেসব রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য বাজার উন্মুক্ত করার আলোচনা হোক।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মসংস্থান অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব শহিদুল ইসলাম চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, মালয়েশিয়া শ্রমবাজার নিয়ে আমরা সব সময় তৎপর। বাজারটি বন্ধ হলে তা খোলার জন্য সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। মালয়েশিয়ায় যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে, তাতে কোন কোন প্রসঙ্গ আসবে, তা এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। আলোচনা যখন হবে, তখন বুঝতে পারব তা কোনদিকে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, মালয়েশিয়া তাদের শর্ত নিয়ে খোলাসা করে কিছুই বলছে না। তাই আমাদের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, আমরা কোনো সিন্ডিকেট বুঝি না। আমরা সব সময় শ্রমবাজার সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার চেষ্টা করি। আমরা মালয়েশিয়া যাচ্ছি, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে ইনশাল্লাহ।
সবশেষে ২০২৪ সালের ৩১ মে মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়। তখন সবকিছু ঠিক থাকা সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তে প্রায় ১৮ হাজার কর্মী যেতে পারেননি। এরপর থেকে একাধিকবার চেষ্টা করলেও বাজারটি চালু করতে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

