দীর্ঘদিনের নীরবতার পর হঠাৎ করেই পাবনার কিছু এলাকায় দেয়ালে দেয়ালে ভেসে উঠেছে কিছু পরিচিত স্লোগান—যেগুলো একসময় এ অঞ্চলের মানুষের মনে আতঙ্কের অন্য নাম ছিল। ‘সর্বহারা এক হও’, ‘ভোটের বাক্সে লাথি মারো’, ‘সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করো’, ‘বন্দুকের নল ক্ষমতার উৎস’—এ ধরনের কথাগুলো শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রকাশ নয়, বরং অতীতের এক সহিংস অধ্যায়ের স্মৃতিও জাগিয়ে তোলে।
সম্প্রতি রাতের অন্ধকারে সাঁটানো পোস্টার ও দেয়াললিখনের মাধ্যমে ‘পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল)’ একটি বিভক্ত অংশ, যাদের ‘লাল পতাকা’ নামে চিহ্নিত করা হয়, নিজেদের উপস্থিতির ইঙ্গিত দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাটি ঘটেছে পাবনার আতাইকুলা উপজেলার বিভিন্ন জনবহুল স্থানে। যদিও সংগঠনটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য এখনো সামনে আসেনি, তবু বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহলের পাশাপাশি এক ধরনের উদ্বেগও সৃষ্টি করেছে। রাজধানীর এক সহযোগী দৈনিক এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। (বণিক বার্তা, ২৮ মার্চ, ২০২৬)
ঘটনাটিকে একমাত্রিকভাবে ব্যাখ্যা করা সহজ নয়। এমন তৎপরতার পেছনে একাধিক সম্ভাবনা থাকতে পারে। প্রথমত, এটি হতে পারে কোনো পুরোনো সংগঠনের ধীরে ধীরে আবার সংগঠিত হওয়ার প্রাথমিক পদক্ষেপ—যা সাধারণত নিম্নমাত্রার প্রচার দিয়ে শুরু হয়। দ্বিতীয়ত, সংগঠনের কেন্দ্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়লেও বিচ্ছিন্ন কিছু পুরোনো সদস্য নিজেদের উদ্যোগে এমন কর্মকাণ্ড চালাতে পারে। তৃতীয় সম্ভাবনা হলো—এটি বিভ্রান্তি সৃষ্টির কৌশলও হতে পারে, যেখানে অন্য কোনো পক্ষ পুরোনো নাম ব্যবহার করে পরিস্থিতিকে অস্থির করতে চাইছে।
বর্তমান বাস্তবতায় এখনো পর্যন্ত কোনো সশস্ত্র তৎপরতা, প্রকাশ্য সমাবেশ বা সংগঠিত নেটওয়ার্কের দৃশ্যমানতা পাওয়া যায়নি। পুরো বিষয়টি সীমাবদ্ধ রয়েছে গোপন প্রচারের মধ্যেই, যা পরিস্থিতিকে আপাতত নিয়ন্ত্রিত রাখছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল—বিশেষ করে পাবনা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা—একসময় চরমপন্থি কর্মকাণ্ডের জন্য কুখ্যাত ছিল। ১৯৯০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ‘লাল পতাকা’সহ বিভিন্ন বামপন্থি গোষ্ঠী এ অঞ্চলে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলে। তাদের কার্যক্রম শুধু আদর্শিক আন্দোলনে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং চাঁদাবাজি, টার্গেট কিলিং, অপহরণ এবং গ্রামভিত্তিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মতো সহিংস কর্মকাণ্ডে রূপ নেয়। বিশেষ করে, ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সময়কে এ অঞ্চলের সবচেয়ে অস্থির সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাধারণ মানুষ তখন নিত্যদিনের জীবনে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগত। অনেক এলাকায় কার্যত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে ২০০৪ সালের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অভিযান শুরু করে। ধারাবাহিক অভিযানে শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার, অস্ত্র উদ্ধারে সফলতা এবং সংগঠনের ভেতরের বিভক্তি—সব মিলিয়ে চরমপন্থি গোষ্ঠীগুলো দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।
পরে আত্মসমর্পণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে অনেক সদস্য স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। ২০১০ সালের পর থেকে সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সময়কে তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ পর্ব হিসেবে ধরা হয়।
সাম্প্রতিক পোস্টারিংয়ের ভাষা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, এটি ঐতিহ্যগত বামপন্থি চরমপন্থার প্রচার। তবে এটিকে এখনই পূর্ণাঙ্গ পুনরুত্থান বলা যাচ্ছে না। বরং এটি একটি ‘সতর্কসংকেত’—যা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য গতিপথ সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য করে। অভিজ্ঞতা বলে, এ ধরনের সংগঠনগুলো সাধারণত কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করে—প্রথমে পোস্টার ও লিফলেট, এরপর গোপন বৈঠক, তারপর অর্থ সংগ্রহ বা চাঁদাবাজি এবং সবশেষ সহিংস কর্মকাণ্ড। বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব ধাপের পরবর্তী কোনো স্পষ্ট প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় পুলিশ ইতোমধ্যে ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। পোস্টারের নমুনা সংগ্রহ করে কারা এর পেছনে জড়িত তা শনাক্তের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি পাশের জেলাগুলোতেও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। পাবনার দেয়ালজুড়ে ভেসে ওঠা এই পোস্টারগুলো আপাতদৃষ্টিতে ছোট ঘটনা মনে হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে বড় কোনো ইঙ্গিত। এটি হয়তো শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু মানুষের উদ্যোগ, আবার এটিই হতে পারে কোনো বৃহত্তর সংগঠনের পুনর্গঠনের সূচনা।
এই মুহূর্তে পরিস্থিতি আতঙ্কজনক না হলেও অবহেলার সুযোগ নেই। অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে—এ ধরনের ক্ষুদ্র ইঙ্গিতকে সময়মতো গুরুত্ব না দিলে তা বড় সংকটে রূপ নিতে পারে। তাই সচেতনতা, নজরদারি এবং যথাযথ পদক্ষেপই হতে পারে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
চরমপন্থা প্রতিরোধে সমন্বিত কৌশল
চরমপন্থি তৎপরতা কখনোই হঠাৎ করে পূর্ণ শক্তিতে আবির্ভূত হয় না; বরং এটি ধীরে ধীরে সমাজের ভেতরে থাকা বিভিন্ন ফাঁকফোকর—সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে শিকড় গেড়ে বসে। এ কারণেই চরমপন্থা প্রতিরোধের প্রশ্নটি শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না; এটি একযোগে রাষ্ট্র, সমাজ এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন সুপরিকল্পিত, বহুমাত্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।
প্রথমত, গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি। চরমপন্থি কার্যক্রম সাধারণত পোস্টারিং, গোপন বৈঠক কিংবা প্রচারের মাধ্যমে সূচনা পায়। তাই স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ বাড়ানো, সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড দ্রুত শনাক্ত ও যাচাই করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি—যেমন ডিজিটাল মনিটরিং ও ডেটা বিশ্লেষণ—ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ, প্রাথমিক স্তরেই হুমকি শনাক্ত করা গেলে বড় ধরনের সংকট সহজেই এড়ানো সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, কমিউনিটি পুলিশিং ও জনসম্পৃক্ততা চরমপন্থা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। শুধু পুলিশি ব্যবস্থার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। গ্রাম ও মহল্লাভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ইমাম ও সুশীল সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি—যাতে তারা নির্ভয়ে তথ্য দিতে পারে—এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবে জনগণই সবচেয়ে কার্যকর ‘প্রথম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা’ হিসেবে কাজ করতে পারে।

তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বঞ্চনা কমানো অপরিহার্য। দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও সামাজিক বৈষম্য চরমপন্থার জন্য উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সহায়তা এবং স্থানীয় শিল্পের পুনরুজ্জীবন—যেমন কুঠিরশিল্প—এসব পদক্ষেপ মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করে এবং চরমপন্থার প্রতি আকর্ষণ হ্রাস করে।
চতুর্থত, পুনর্বাসন ও ডি-র্যাডিক্যালাইজেশন কর্মসূচি চালু রাখা প্রয়োজন। যারা ইতোমধ্যে চরমপন্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বা ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের শুধু দমন নয়, বরং পুনর্বাসনের মাধ্যমে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা জরুরি। মানসিক ও সামাজিক কাউন্সেলিং, বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা এবং সামাজিক পুনঃএকীকরণ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পঞ্চমত, আইনের শাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত, মানবাধিকার রক্ষা এবং বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে তা নতুন অসন্তোষ ও অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে, যা আবার চরমপন্থাকে উৎসাহিত করে।
ষষ্ঠত, শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহনশীলতা, মানবিক মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক চেতনা জাগ্রত করা, ভ্রান্ত মতাদর্শের বিরুদ্ধে যুক্তিনির্ভর আলোচনা এবং তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা—এসব উদ্যোগ দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
সপ্তমত, স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে, গ্রামাঞ্চলে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ বা সামাজিক দ্বন্দ্ব চরমপন্থিদের জন্য সুযোগ তৈরি করে। দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি, সালিশব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং প্রান্তিক মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।
অষ্টমত, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক শূন্যতা, হতাশা বা অংশগ্রহণের অভাব মানুষকে বিকল্প—কখনো অবৈধ—পথের দিকে ঠেলে দেয়। তাই অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় নেতৃত্বকে শক্তিশালী করা অপরিহার্য।
নবমত, মিডিয়া ও তথ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুজব, ভুয়া তথ্য ও অযাচিত আতঙ্ক চরমপন্থিদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তাই দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন, ভুয়া তথ্য প্রতিরোধ এবং ইতিবাচক উদ্যোগগুলোর প্রচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সবশেষে বলা যায়, চরমপন্থা কোনো একক কারণে জন্ম নেয় না; ফলে এর সমাধানও একমাত্রিক হতে পারে না। কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মানসিক পুনর্গঠনের সমন্বিত প্রয়াস প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—প্রতিরোধের সূচনা করতে হবে লক্ষণ প্রকাশের আগেই এবং তা হতে হবে মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সুসমন্বিত। এই ভারসাম্যপূর্ণ প্রয়াসই দীর্ঘ মেয়াদে একটি স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও উন্নয়নমুখী সমাজ গঠনের পথ সুগম করতে পারে।
লেখক : সাবেক উপদেষ্টা, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, অন্তর্বর্তী সরকার
drkhalid09@gmail.com
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


স্বচ্ছ পানির ফয়’স লেক এখন বিষাক্ত জলাধার