পাঠকমেলার সঙ্গে দেড় যুগ

এমজেএইচ জামিল

পাঠকমেলার সঙ্গে দেড় যুগ

এক-এগারো সরকারের সময়ে ২০০৭ সালের শুরুতে আমার দেশ পাঠকমেলার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। এরপর কেটে গেছে দেড় যুগ। সুখে-দুঃখে আমার দেশ-এর সঙ্গে জীবন মিলেমিশে একাকার এখন। ২০০৯ সালে আমার দেশ পাঠকমেলা সিলেটের পূর্ণাঙ্গ কমিটি হলে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই আমি। এর পর থেকেই দেশে আওয়ামী ফ্যাসিবাদ ডালপালা মেলতে শুরু করে। পর্যায়ক্রমে ফ্যাসিবাদের ভয়াল থাবায় আমার দেশ-এর পাঠকমেলার ঠিকানা হয় রাজপথ।

২০১০ সালের ১ জুন আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার প্রথমবারের মতো জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিক আমার দেশ বন্ধ করে দেয়। রাতের আঁধারে কমান্ডো স্টাইলে সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে। এর প্রতিবাদে দেশব্যাপী নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। শুরু হয় তুমুল আন্দোলন। সারা দেশের মতো সিলেট থেকেও আন্দোলন গড়ে তোলা হয়।

বিজ্ঞাপন

২০১০ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে সিলেটের ঐতিহাসিক কোর্ট পয়েন্টে সচেতন সিলেটবাসীর উদ্যোগে বিশাল মানববন্ধন পালিত হয়। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন গণিত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ড. সাজেদুল করিমের সভাপতিত্বে এবং আমার পরিচালনায় অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক মানববন্ধনে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান। এরপর মাহমুদুর রহমানের মুক্তি ও আমার দেশ-এর প্রকাশনা খুলে দেওয়ার দাবিতে সিলেটে ‘মাহমুদুর রহমান মুক্তি সংগ্রাম কমিটি’ নামে একটি অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হয়। আহ্বায়ক হিসেবে লে. কর্নেল (অব.) সৈয়দ আলী আহমদ এবং সদস্য সচিব হিসেবে আমি নির্বাচিত হই। যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে পাঠকমেলা সিলেটের সভাপতি ডা. হোসাইন আহমদ, সহসভাপতি রুহুল আমীন নগরী, মরহুম হাফিজ আদিল রশীদ হুমায়ুন, জাহেদ আহমদ তালুকদার, সুলায়মান আল মাহমুদ, আলী আকবর রাজন ও আকবর হোসেন নির্বাচিত হন। এর পর থেকে ‘মাহমুদুর রহমান মুক্তি সংগ্রাম কমিটি’ ও ‘আমার দেশ পাঠকমেলা, সিলেট’-এর যৌথ উদ্যোগে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালিত হয়। পর্যায়ক্রমে মানববন্ধন, মানবপ্রাচীর, গণস্বাক্ষর কর্মসূচিসহ জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে একাধিক ঘরোয়া আলোচনা ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।

আন্দোলন যখন তীব্রতর হওয়ার পথে ঠিক সেই সময় ২০১০ সালের ৫ নভেম্বর সিলেট শহীদ মিনারে আমরা একটা মানববন্ধন পালন করি। সেদিন পুলিশ আমাদের বাধা দেয় এবং ব্যানার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে আমরা মানববন্ধন সমাপ্ত করি। এরপর থেকে পুলিশ ও সরকারের বিভিন্ন এজেন্সি আমাকে নজরদারিতে ফেলে। ওই বছরের ১০ নভেম্বর স্থানীয় দৈনিক আলোকিত সিলেট-এর স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত থাকাকালে অফিসের পেশাগত দায়িত্ব পালন শেষে রাত ১টায় বাসায় ফিরে যখন ঘুমাতে যাচ্ছিলাম, সে অবস্থায় রাত আড়াইটায় সরকারের পেটোয়া বাহিনী সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে আমাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। এক দিন আগে একই কায়দায় গ্রেপ্তার করা হয় পাঠকমেলা সিলেট-এর সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল ইসলামকে। তিনিও দীর্ঘ এক মাসের বেশি জেল খেটে মুক্তি পান। দীর্ঘ ২৯ দিন কারাভোগের পর ৯ ডিসেম্বর কারাগার থেকে মুক্তি পাই আমি।

দমে যাইনি। কারাগার থেকে বের হয়েই মাহমুদুর রহমানের মুক্তির দাবিতে আবার রাজপথে নেমে পড়ি। প্রথম দফায় দীর্ঘ ৯ মাসেরও বেশি কারাবরণ শেষে মুক্তি পান আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তারপর সম্পাদক মাজার জিয়ারত করতে সিলেটে এলে আমার প্রতি এবং ‘সিলেট পাঠকমেলা’ ও ‘মাহমুদুর রহমান মুক্তি সংগ্রাম কমিটি’র নেতাদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন এবং তাদের ভূয়সী প্রশংসা করেন। এরপর ঢাকায় আমার দেশ-এর প্রধান কার্যালয়ে আওয়ামী আমলে গুম হওয়া বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর উপস্থিতিতে বুকে জড়িয়ে ধরে ফুল দিয়ে আমাকে বরণ করেন মাহমুদুর রহমান।

২০১৩ সালের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে দ্বিতীয় বারের মতো আবারও সরকারের রোষানলে পরে গ্রেপ্তার হয়ে নির্মম কারা নির্যাতনের শিকার হন মাহমুদুর রহমান। সেদিন রাতে অন্যায়ভাবে সিলগালা করে দেওয়া হয় আমার দেশ-এর ছাপাখানা। এর পর থেকে আবারও মাহমুদুর রহমানের মুক্তি ও পত্রিকার ছাপাখানা খুলে দেওয়ার দাবিতে আমার দেশ পাঠকমেলা সিলেটের উপদেষ্টা ও সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র রেজাউল হাসান কয়েস লোদী এবং জামায়াত নেতা হাফিজ আব্দুল হাই হারুনের নেতৃত্বে আমরা রাজপথে তৎপর হয়ে উঠি। পরবর্তী সময়ে আমাদের সঙ্গে যোগ দেন সজ্জন ব্যক্তিত্ব রাজনীতিবিদ সালেহ আহমদ খসরু।

সিলেটে মাহমুদুর রহমানের মুক্তির দাবিতে গড়ে ওঠে আরেকটি প্ল্যাটফর্ম ‘মাহমুদুর রহমান মুক্তিমঞ্চ, সিলেট’। সালেহ আহমদ খসরুকে আহ্বায়ক ও আমাকে সদস্যসচিব নির্বাচিত করা হয়। এরপর আমার দেশ পাঠকমেলার পাশাপাশি ‘মাহমুদুর রহমান মুক্তি মঞ্চ, সিলেট’ রাজপথে বিশাল মানববন্ধনসহ একাধিক কর্মসূচি পালন করে। এই সংগঠনের নেতৃত্বে সিলেটের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ মানববন্ধন করেছিলাম আমরা। সরকারের সমর্থনপুষ্ট গণজাগরণ মঞ্চের বিপরীতে ‘মাহমুদুর রহমান মুক্তি মঞ্চ, সিলেট’ গঠন ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের। সেই চ্যালেঞ্জ আমরা মোকাবিলা করেছি। শুধু তা-ই নয়, সেই সময়ের কঠিন পরিস্থিতিতে ‘মাহমুদুর রহমান মুক্তি মঞ্চ, সিলেট’ আয়োজিত মানবববন্ধনে প্রায় দু-তিন হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিল। এটিই ছিল সে সময়ে সিলেটের সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘ মানববন্ধন। আল্লাহর অশেষ রহমতে ২০১৬ সালের ২৩ নভেম্বর প্রায় সাড়ে তিন বছর কারাগারে আটক থাকার পর মুক্তি পান আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান।

তবুও থেমে থাকেনি আমাদের আন্দোলন। কুষ্টিয়ায় আদালত চত্বরে মাহমুদুর রহমানের ওপর হামলা, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন আদালতে মামলা, নয়া দিগন্তের অফিসে হামলা এবং দৈনিক সংগ্রাম সম্পাদকের ওপর হামলাসহ সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমার দেশ পাঠকমেলা সিলেট ছিল সোচ্চার। সর্বশেষ ২০১৭ সালে আমরা বিজয় দিবসের আলোচনা সভার আয়োজন করি। এর পর থেকে দেশে চূড়ান্ত ফ্যাসিবাদ কায়েম হলে অনেক সহযোদ্ধা একাধিক মামলায় জর্জরিত হয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। ফলে কার্যক্রম অনেকটা স্তিমিত হয়ে পড়ে।

২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আমার দেশ পাঠকমেলা সিলেটের উদ্যোগে ৭ জানুয়ারি শহীদ ফেলানী দিবস এবং ৩ ফেব্রুয়ারি শহীদ আবু বকর দিবস পালন পালন করা হয়। ২০১৯ সালের ১১ অক্টোবর আমার দেশ পাঠকমেলা সিলেটের দুঃসময়ের কান্ডারি সাবেক সহসভাপতি হাফিজ আদিল রশীদ হুমায়ুন ভাই লন্ডনে ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। আমরা প্রিয় ভাইয়ের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। আমাদের দীর্ঘ পথচলার সহযোগী পাঠকমেলা সিলেট-এর সহ-সাধারণ সম্পাদক সুলায়মান আল মাহমুদ, সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল ইসলাম (অনুক্ত কামরুল) ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক জাহেদ তালুকদার ভাইকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। বর্তমানে যারা প্রবাসে রয়েছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শুভকামনা জানাই।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন