সমুদ্রঘেঁষা পাহাড়ি প্রাচীন নগরী চট্টগ্রাম। আধুনিকতার মাঝে এখানে আজও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে মোগল আমলের কয়েকটি স্থাপনা, যা অতীতকে যেন থামিয়ে রেখেছে। এগুলো হলো কয়েক শতাব্দী পুরোনো চারটি মসজিদ; যেখানে ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী এবং ধর্মীয় অনুভূতি এক অপূর্ব বন্ধনে মিলিত হয়েছে। এসব মসজিদে আজানের ধ্বনি-প্রতিধ্বনিতে মানুষের হৃদয়ে মোগল আমলের ঐতিহ্যকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।
১৬৬৬ সালে মোগলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের পর এ অঞ্চলে তাদের শাসনের প্রভাবে ইসলামি স্থাপত্যধারা বিকশিত হয়েছিল। এর উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে আজও টিকে আছে ‘আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ’, ‘কদম মোবারক মসজিদ’, ‘চন্দনপুরা মসজিদ’ এবং ‘অলিখাঁ মসজিদ’।
মসজিদগুলো শুধু অতীতের নিদর্শনই নয়; এগুলো চট্টগ্রামের ধর্মীয় ঐতিহ্য, শিল্পরুচি এবং ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রাচীন স্থাপত্যের নান্দনিকতা, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং আধ্যাত্মিক আবহÑসব মিলিয়ে এগুলো আজও মানুষের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র।
আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ
চট্টগ্রাম নগরীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে ‘আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ’। পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত প্রাচীন এ মসজিদ মোগল আমলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন। ধারণা করা হয়, ১৬৬৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলার মোগল সুবেদার শায়েস্তা খাঁ সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে মসজিদটি নির্মাণ করেন। ১৬৬৬ সালে চট্টগ্রাম অঞ্চলে আরাকানি মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের পরাজয়ের পর এ এলাকায় মোগল শাসনের সূচনা হয়। সেই বিজয়ের স্মৃতি হিসেবে আন্দরকিল্লায় এ মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়।
‘আন্দরকিল্লা’ শব্দটির অর্থ হলো দুর্গের ভেতরের অংশ বা অভ্যন্তরীণ দুর্গ। ঐতিহাসিকভাবে এলাকাটি ছিল একটি দুর্গের অংশ, যার ভেতরেই মসজিদটি নির্মিত হওয়ায় এর নামকরণ হয় আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ। উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত হওয়ায় মসজিদটি দূর থেকে সহজেই চোখে পড়ে এবং শহরের দিকে তাকিয়ে থাকা এক নীরব ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে।
মসজিদের স্থাপত্যে মোগল যুগের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনটি গম্বুজ, খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বার এবং শক্ত ইটের গাঁথুনি মসজিদটির প্রধান বৈশিষ্ট্য। দেয়ালের সূক্ষ্ম নকশা ও কারুকাজ সে সময়কার শিল্পরুচি ও নির্মাণশৈলীর নিদর্শন বহন করে। মসজিদের দেয়ালে প্রাচীন ফারসি ভাষায় খোদাই করা শিলালিপি রয়েছে। স্থাপত্যশৈলীতে সিরিয়ার রাক্কা নগরের কিছু প্রভাবও লক্ষ করা যায় বলে গবেষকরা মনে করেন।
বর্তমানে মসজিদটি চট্টগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মসজিদটির সম্প্রসারণ করা হয়েছে। বর্তমানে এখানে প্রায় আট হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসে এখানে বিশাল গণইফতার ও ধর্মীয় কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়, যা শহরের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
চন্দনপুরা মসজিদ
নান্দনিক সৌন্দর্যের প্রতীক ধর্মীয় স্থাপনা হলো ‘চন্দনপুরা মসজিদ’। যদিও মসজিদটির বর্তমান অবয়ব পরে সংস্কার করা হয়েছে, তবুও এর স্থাপত্যে মোগল আমলের প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়।
উঁচু মিনার, খিলানযুক্ত দরজা এবং বহু গম্বুজের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ মসজিদ অনন্য নান্দনিকতা বহন করে। সাদা রঙের দেয়ালে সূর্যের আলো পড়লে মসজিদটি যেন আরো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। চন্দনপুরা এলাকার ব্যস্ততার মাঝেও এটি মানুষকে এনে দেয় প্রশান্তির অনুভূতি, যেখানে কোলাহল থেমে যায় আর মন ধীরে ধীরে নিবিষ্ট হয় প্রার্থনায়।
মসজিদটি চট্টগ্রামের নবাব সিরাজ উদ-দৌলা রোডে অবস্থিত। এটি বহু গম্বুজ এবং মিনার সমৃদ্ধ একটি উজ্জ্বল রঙের মসজিদ, যা স্থাপত্য সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত।
১৮৭০ সালে লখনউ ও বোম্বের স্থপতি ও নির্মাতাদের তত্ত্বাবধানে চন্দনপুরা মসজিদ নির্মাণ করেন মাস্টার আব্দুল হামিদ। প্রাথমিকভাবে এটি হামিদিয়া-তাজ-মসজিদ নামে পরিচিত ছিল। ১৯৪৭ সালে মাস্টার আব্দুল হামিদের বংশধর আবু সৈয়দ দোভাশ সংস্কারকাজ শুরু করেন এবং ১৯৫২ সালে তা শেষ হয়।
মসজিদটি চট্টগ্রামের চকবাজারের পশ্চিম পাশে ঔপনিবেশিক যুগের লাল ইটের দ্বিতল ফায়ার ব্রিগেড স্টেশনের বিপরীতে অবস্থিত। আন্তর্জাতিক ঐতিহাসিক স্থানের অভিধানে এটিকে ‘বিশেষ সুন্দর কাঠামো’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অলিখাঁ মসজিদ
চকবাজারে অবস্থিত ‘অলিখাঁ মসজিদ’ চট্টগ্রামের প্রাচীন মুসলিম স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন। এটি ১৭১৩ থেকে ১৭১৬ সালের মধ্যে মোগল ফৌজদার নবাব ওয়ালী বেগ খাঁ নির্মাণ করেন। মসজিদটি চমৎকার স্থাপত্যের জন্য পরিচিত।
মসজিদটির বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো বিশাল ছয়টি গম্বুজ এবং অত্যন্ত পুরু প্রাচীন দেয়াল। দেয়ালের ভেতরে ছোট খোঁপ রয়েছে, যেখানে কোরআন শরিফ বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখা হতো। গম্বুজ, খিলান এবং ইটের নির্মাণশৈলী স্পষ্টভাবে মোগল যুগের স্থাপত্যকৌশল স্মরণ করিয়ে দেয়। মসজিদের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করে।
দীর্ঘ সময় অযত্নে থাকার কারণে মসজিদটি কিছুটা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ২০১১ সালে স্থানীয় প্রশাসন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন মিলে মসজিদটি সংরক্ষণ করে এবং সামনে একটি নতুন পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করা হয়।
কদম মোবারক মসজিদ
জামালখান ওয়ার্ডের ঝাউতলা এলাকায় মোগল স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত ‘কদম মোবারক মসজিদ’। এজন্য ওই এলাকা ‘কদম মোবারক’ নামে পরিচিত।
মসজিদটি ১৭২৩ সালে মোগল সম্রাট মুহাম্মদ শাহের শাসনামলে ফৌজদার মুহাম্মদ ইয়াসীন খাঁ নির্মাণ করেন। মসজিদে দুটি পদচিহ্নযুক্ত পাথর সংরক্ষিত আছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী, একটি পাথরে মহানবী হজরত মুহম্মদ (স.) এবং অন্যটিতে সুফি সাধক আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর পদচিহ্ন রয়েছে। এ থেকেই মসজিদের নামকরণ করা হয়েছে ‘কদম মোবারক’।
মসজিদটি আয়তকার আকৃতির এবং এতে তিনটি গম্বুজ, দুটি খিলান ও পাঁচটি দরজা রয়েছে। চার কোণায় অষ্টভুজ আকৃতির মিনার রয়েছে এবং ভেতরের দেয়ালে আরবি ক্যালিগ্রাফি ও নকশা দেখা যায়। মসজিদ কমপ্লেক্সে মাদরাসা, কবরস্থান, জানাজার স্থান এবং একটি এতিমখানা রয়েছে, যা প্রতিষ্ঠা করেন মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী।
চট্টগ্রাম নগরীর চারটি প্রাচীন মসজিদ মোগল আমলের ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী এবং আধ্যাত্মিকতার জীবন্ত সাক্ষী। মসজিদগুলো শুধু ধর্মীয় কেন্দ্রই নয়; বরং চট্টগ্রামের সংস্কৃতি, শিল্প ও ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

