ঋণের ভারে ডুবছে যুক্তরাষ্ট্র

আল আসাদ

ঋণের ভারে ডুবছে যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের বোঝা দিনদিন বেড়েই চলছে। চলতি অর্থবছরের শুরুতে থেকেই মার্কিন অর্থ বিভাগ যে হারে ঋণ নিচ্ছে, তাতে গভীর সংকটের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। গত ১৮ মার্চ এ ঋণের তথ্য সামনে আসে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঋণের এ দ্রুত বৃদ্ধি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের (সিবিও) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসেই দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেট ঘাটতি আরো এক ট্রিলিয়ন ডলার বেড়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির কারণে আগামী এক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ৬৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার গত পাঁচ মাস ধরে প্রতি সপ্তাহে গড়ে পাঁচ হাজার কোটি ডলার করে ঋণ নিয়েছে। সিবিওর বাজেট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শুধু ফেব্রুয়ারিতেই মার্কিন সরকার ৩০৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ইরান যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বড় আর্থিক চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ ঋণ বৃদ্ধির পেছনে যুদ্ধের ব্যয়, কর কমানো, প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে বাড়তি খরচÑসব মিলিয়ে প্রশাসনের নীতিগত অগ্রাধিকারের সংঘাত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নির্বাচনি প্রচারণায় ঋণ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ মাসে ঋণের সুদ বাবদ অর্থ বিভাগকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত তিন হাজার ১০০ কোটি ডলার খরচ করতে হয়েছে। অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে ঋণের সুদ মেটাতেই যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে ৪৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

মাস পাঁচেক আগেও যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ছিল ৩৮ ট্রিলিয়ন ডলার। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আসন্ন নির্বাচনের আগেই ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা। হোয়াইট হাউসের ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিলের পরিচালক কেভিন হ্যাসেট সপ্তাহ দুয়েক আগেই জানিয়েছিলেন, ইরানে হামলা শুরুর পর ইতিমধ্যে ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যেই ট্রাম্প ইরানে স্থল অভিযানের কথা বলছেন, যা দেশটিকে ব্যয়বহুল এক যুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

সরকারি নিরীক্ষা সংস্থা (জিএও) সতর্ক করেছে, এ নজিরবিহীন ঋণ সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলছে। বাড়ছে গৃহঋণ ও গাড়ির ঋণের সুদ, কমছে বিনিয়োগ সক্ষমতা, ফলে চাপ পড়ছে মজুরিতেও। একই সঙ্গে পণ্য ও সেবার দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে ঋণ ও সুদ পরিশোধের চাপ যুক্তরাষ্ট্রকে কঠিন আর্থিক সিদ্ধান্তে ঠেলে দিতে পারে।

মার্কিন অলাভজনক সংস্থা পিটার জি পিটারসন ফাউন্ডেশনের সিইও মাইকেল পিটারসন এক বিবৃতিতে বলেন, আমাদের এ উদ্বেগজনক ঋণ বৃদ্ধির হার স্বীকার করতে হবে। আমরা পরবর্তী প্রজন্মের ওপর বিশাল ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছি, তা উপলব্ধি করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারির আর্থিক ডেটা ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে মোট সরকারি ব্যয় ছিল ৭ দশমিক শূন্য ১ ট্রিলিয়ন ডলার। বিপরীতে রাজস্ব আয় ৫ দশমিক ২৩ ট্রিলিয়ন ডলার। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ১ দশমিক ৭৮ ট্রিলিয়ন ডলার।

কমিটি ফর অ্যা রেসপনসিবল ফেডারেল বাজেটের (সিআরএফবি) প্রেসিডেন্ট মায়া ম্যাকগুইনাস বলেন, চলতি বছরেই ঋণের সুদের পরিমাণ এক লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং ২০৩৬ সাল নাগাদ তা দুই ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে। তিনি আরো বলেন, এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তা হবে বিপজ্জনক। আমাদের আর্থিক সমস্যা নিজেই সমাধান হবে না। নীতিনির্ধারকদের একমত হতে হবে এবং ঘাটতি কমিয়ে আনতে হবে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কুশ দেশাই কিছুটা উল্টো সুরেই বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দায়িত্বে ফেরার প্রথম বছরে ফেডারেল ঘাটতি কমেছে। ব্যক্তিগত কর বৃদ্ধি ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপের কারণে বাজেট ঘাটতি কমছে। এসব উদ্যোগ কার্যকর হতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটতি এবং জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাত ধীরে ধীরে সঠিক পথে অগ্রসর হবে। তবে অনেক বিশ্লেষকের মতে, সামগ্রিক ঋণের ঊর্ধ্বগতি এখনো বড় উদ্বেগ হিসেবেই রয়ে গেছে।

মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল সতর্ক করে বলেছেন, জাতীয় ঋণের যে গতিপথ, তার শেষটা শঙ্কার। পাওয়েল হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া এক লেকচারে বলেন, দেশের ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ তাৎক্ষণিকভাবে বিপজ্জনক না হলেও দেশ যে পথে এগোচ্ছে, তাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। আমরা যদি দ্রুত কিছু না করি, তাহলে এটি অর্থনীতির জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না।

পাওয়েল দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়ে আসছেন। তার মতে, স্বল্পমেয়াদে ঋণের বোঝা সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে এ ধারা উদ্বেগজনক। তিনি এমন সময়ে এ সতর্কতার কথা বললেন, যখন ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে গ্যাসের গড় দাম গ্যালনপ্রতি প্রায় চার ডলারে পৌঁছেছে এবং পরিস্থিতি দ্রুত সমাধানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যদিও ট্রাম্প বরাবরই যুদ্ধ শেষ হওয়ার দাবি করছেন।

এক শিক্ষার্থীর প্রশ্নের জবাবে পাওয়েল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পরিশোধযোগ্য ঋণের সর্বোচ্চ সীমা কত, তা কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে না। তিনি উদাহরণ হিসেবে জাপানের কথা উল্লেখ করেন, যাদের ঋণ-জিডিপি অনুপাত যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বেশি। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আমাদের ঋণ অর্থনীতির তুলনায় অনেক দ্রুত বাড়ছে।

জেরোম পাওয়েল সরাসরি ঋণ পরিশোধ করে ফেলার আহ্বান জানাননি। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে সমাধানের পথ সহজ। আমাদের এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে, যেখানে অর্থনীতি ঋণের চেয়ে দ্রুত হারে বাড়বে। হালকা রসিকতার সুরে তিনি যোগ করেন, তার সতর্কবার্তা ওয়াশিংটনে প্রায়ই উপেক্ষিত হয়।

প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ঋণের ঘাটতি কমাতে হলে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন উল্লেখযোগ্যভাবে রাজস্ব বাড়ানো, মেডিকেয়ার ও সোশ্যাল সিকিউরিটিতে ব্যয় কমানো। একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, যদিও তার সম্ভাবনা ক্ষীণ ।

মার্কিন বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগ্যান তাদের ২০২৬ সালের আউটলুকে সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণের বোঝা কমানোর পথ সহজ নাও হতে পারে। ব্রিজওয়াটার অ্যাসোসিয়েটের প্রতিষ্ঠাতা রে ডালিয়োর মতে, জাতীয় ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ সরকারি বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়, যাকে তিনি অর্থনীতির ‘হার্ট অ্যাটাকের’ সঙ্গে তুলনা করেন।

ফেডারেল রিজার্ভের সাবেক চেয়ারম্যান জ্যানেট ইয়েলেন চলতি বছরের জানুয়ারিতে একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, বাড়তে থাকা ঋণ ফেডের বেকারত্ব ও মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলার সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন যে, আইনপ্রণেতারা এ ঝুঁকিগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে স্বীকার করছেন না।

সিবিওর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের পরিমাণ জিডিপির ১০১ শতাংশ, যা ২০৩৬ সালের মধ্যে বেড়ে ১২০ শতাংশে পৌঁছতে পারে। ফলে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সর্বোচ্চ রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যাবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন