বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলে চলতি বছর আলুর বাম্পার ফলন হলেও কৃষক দাম পাচ্ছেন না। লোকসান গুনতে হচ্ছে আলুচাষিদের। আলু বিক্রি করে উৎপাদন খরচই উঠছে না তাদের। বিঘাপ্রতি তাদের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে দুই মৌসুমে এ অঞ্চলের কৃষকের ক্ষতির পরিমাণ দেড় হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি।
গত দুদিন বগুড়ার বৃহত্তর মহাস্থান হাট, শেরপুর বারোদুয়ারি হাট, ফুলবাড়ি বাজার ও জয়পুরহাটের কালাই এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পাইকারি বাজারে রুমানা পাকড়ি ২৪০-২৮০ টাকা, ফাটা পাকড়ি ৩৬০-৪০০, সাদা হলেন্ডার ২৫০, স্টিক বা কাঠি লাল ২৩০-২৭০ এবং অ্যালুয়েট ৩০০-৩৫০ টাকা মণ দরে বেচাকেনা হচ্ছে।
শেরপুরের বাগরার বাদশা, মহাস্থানের ছাইরুল, জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার পুনুট এলাকার ব্যবসায়ী ছানোয়ার হোসেন জানান, আলুর বাজার সস্তা হলেও গাড়ি ভাড়া বেশি হওয়ায় ঢাকা ও চট্টগ্রামে পাঠিয়েও লাভের মুখ দেখছেন না তারা। কাজেই ব্যবসা নিয়ে তারা শঙ্কিত।
দেশে আলু উৎপাদনের বড় অংশ আসে উত্তরাঞ্চল (বগুড়া, জয়পুরহাট, রংপুর) থেকে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, এ অঞ্চলে আলুর আবাদি এলাকা ও উৎপাদন দুটোই বেড়েছে। ফলনও বেশি হয়েছে; কিন্তু বাজারে সে সাফল্যের প্রতিফলন নেই। উৎপাদন বাড়লেও ন্যূনতম মূল্য সুরক্ষা না থাকায় কৃষকের আয় উল্টো কমছে।
শিবগঞ্জের কৃষক আবুল হোসেন ও শেরপুরের কাফুরা গ্রামের সুমন জানান, মাঠ থেকে আলু উঠানো শেষ। কোল্ড স্টোরেজগুলোতে কৃষকদের সিরিয়াল পাওয়া বড়ই কষ্টকর। বাজারেও দাম পড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচই উঠছে না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত পাঁচ বছরে বগুড়া, রংপুর ও জয়পুরহাটে আলুর আবাদ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। কিন্তু বাজারদর উৎপাদন খরচের নিচে নেমে যাওয়ায় কৃষকের হাতে লাভ তো আসেইনি, উল্টো বেড়েছে ক্ষতির অঙ্ক। টাকার অঙ্কে যা দেড় হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়ায় ২০২২-২৩ মৌসুমে প্রায় ৯ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়। ২০২৩-২৪ মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯ লাখ ৮০ হাজার টনে। ২০২৪-২৫ মৌসুমে উৎপাদন ১০ লাখ টন ছাড়িয়ে যায়; কিন্তু গত দুই মৌসুমে পাইকারি দাম অনেক সময় ৮-১২ টাকা কেজিতে নেমে আসে, যেখানে উৎপাদন খরচ গড়ে ১৪-১৮ টাকা কেজি। এতে বিঘাপ্রতি গড়ে ১৫-২০ হাজার টাকা ক্ষতি হয়। আলু চাষে জেলাজুড়ে ক্ষতির পরিমাণ ৪০০-৫০০ কোটি টাকার মতো।
জয়পুরহাটে ২০২২-২৩ মৌসুমে উৎপাদন ছিল প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টন। ২০২৩-২৪ মৌসুমে তা ছয় লাখ টন ছাড়ায় এবং ২০২৪-২৫ মৌসুমে প্রায় ছয় লাখ ৩০ হাজার টনে পৌঁছায়। কিন্তু দাম ৯-১১ টাকা কেজিতে নেমে যাওয়ায় বিঘাপ্রতি কৃষকের ক্ষতি হয় ১৮-২৫ হাজার টাকা। জেলা পর্যায়ে মোট আর্থিক ক্ষতির অঙ্ক ৩০০-৪০০ কোটি টাকার ঘরে।
রংপুর জেলায় ২০২২-২৩ মৌসুমে উৎপাদন ছিল প্রায় সাত লাখ ৮০ হাজার টন। পরের মৌসুমে তা আট লাখ ৬০ হাজার টনে উন্নীত হয়। ২০২৪-২৫ মৌসুমে উৎপাদন ৯ লাখ টনের কাছাকাছি হয়। কিন্তু একইভাবে দাম পড়ায় বিঘাপ্রতি ১৫-২২ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘাটতি হয়েছে। জেলাজুড়ে ক্ষতির পরিমাণ ৫০০-৬০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে কৃষি-সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।
সব মিলিয়ে তিন জেলায় গত দুই মৌসুমে আলুতে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১২০০-১৫০০ কোটি টাকা। উৎপাদন বেড়েছে ১০-১৫ শতাংশ, কিন্তু বাজার সুরক্ষা না থাকায় সেই সাফল্য কৃষকের আয় বাড়াতে পারেনি। ভালো ফলনের পরও লোকসানের বোঝা বেড়েছে
মাঠ পর্যায়ের কৃষক ও স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক বিঘা জমিতে আলু আবাদ করতে এখন গড়ে ৭০-৮০ হাজার টাকা খরচ হয়। এর মধ্যে শুধু বীজেই লাগে ২৫-৩০ হাজার টাকা। সার ও কীটনাশকে যায় আরো ১৫-১৮ হাজার। রোপণ থেকে নিড়ানি ও উত্তোলন পর্যন্ত শ্রম ব্যয় ১২-১৫ হাজার টাকা। সেচ ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনায় লাগে আরো ৮-১০ হাজার টাকা। এরপর পরিবহন, বাছাই ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে যোগ হয় আরো পাঁচ-সাত হাজার টাকা। সব মিলিয়ে খরচের অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ৭০-৮০ হাজার টাকা। ভালো ফলন হলে এক বিঘায় ৭৫-৮৫ মণ পর্যন্ত আলু ওঠে, যা ওজনে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন টন। কিন্তু বর্তমান পাইকারি বাজারদর কেজি ৮-১২ টাকা হিসেবে মোট বিক্রি দাঁড়ায় মাত্র ৫০-৬০ হাজার টাকার মধ্যে। অর্থাৎ, হিসাবের খাতায় বিঘাপ্রতি ১৫-২৫ হাজার টাকা ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
উত্তরাঞ্চলের তিন জেলায় ১০৬টি হিমাগার রয়েছে, যার ধারণক্ষমতা প্রায় সাড়ে ৯ লাখ টন। তবে আলুচাষিদের বড় অংশের পক্ষে সেখানে ফসল সংরক্ষণ করা সহজ নয়। কারণ, মৌসুমে ভাড়া মণপ্রতি ৩০০-৪০০ টাকা পর্যন্ত দাঁড়ায়, সঙ্গে লোডিং-আনলোডিং ও পরিবহন খরচ যুক্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে আগাম নগদ অর্থও পরিশোধ করতে হয়। ফলে দাম কম থাকলেও সব কৃষকের পক্ষে আলু কোল্ড স্টোরেজে রাখা সম্ভব হয় না। এ অবস্থায় অনেকে বাধ্য হয়ে মাঠ থেকেই কম দামে বিক্রি করে দেন।
কোল্ড স্টোরেজ মালিক বগুড়ার মনজুর হোসেন ও জয়পুরহাটের পরিমল প্রসাদ আমার দেশকে বলেন, ইতোমধ্যেই বগুড়াসহ জয়পুরহাটের সব কোল্ড স্টোরেজে আলু সংরক্ষণ শেষের পথে। কৃষকদের অভিযোগ, তারা কোল্ড স্টোরেজে আলু বেশি সংরক্ষণ করতে পারেননি। এ বিষয়ে তিনি বলেন, করপোরেট গ্রাহক, কোল্ড স্টোরেজ মালিক ও ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা অগ্রিম আলুর বুকিং দিয়ে রাখেন। ফলে কৃষকরা আলু সংরক্ষণের সুযোগ কম পান।
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামসুদ্দিন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানান, বাজারদর নির্ধারণ কৃষি বিপণন বিভাগের বিষয়। তবে অনেক আশায় আলু চাষ করে এবারও ভালো নেই কৃষক।
রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক আঞ্চলিক কর্মকর্তা ও গবেষক হোসেন বজলুর রশিদ বলেন, ‘আলুর জন্য ন্যূনতম সহায়ক মূল্য কাঠামো বিবেচনায় আনা উচিত। ধানের মতো সরাসরি ক্রয়ব্যবস্থা না থাকায় আলুচাষিরা পুরোপুরি বাজার ঝুঁকিতে রয়েছেন। ফলন বেশি হলেই দাম পড়ে যায়। এই চক্র না ভাঙলে কৃষকরা ধীরে ধীরে আলু চাষ থেকে সরে যাবেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

