ইআরএফের সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা

আইএমএফের ঋণের কাছে দেশের মানুষ জিম্মি হয়ে পড়ছে

স্টাফ রিপোর্টার

আইএমএফের ঋণের কাছে দেশের মানুষ জিম্মি হয়ে পড়ছে

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, পতিত সরকারের সময় দেশের অর্থনীতি সংকটপন্ন থাকলেও জনগণকে জানতে দেওয়া হয়নি। জনগণের কথা চিন্তা না করেই স্বজনতোষী পৃষ্ঠপোষকতা চালু রাখতে আইএমএফ থেকে কঠিন শর্তে বেইল আউট গ্রহণ করেছিল। তাই এখন আইএমএফের কাছে দৌড়ানো লাগছে। আজ দেশের মানুষ আইএমএফের ঋণের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে।

শনিবার রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক সক্ষমতা ও সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এ সেমিনার আয়োজন করা হয়। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেমের সঞ্চালনায় এতে স্বাগত বক্তব্য দেন ইআরএফের সভাপতি দৌলত আকতার মালা।

বিজ্ঞাপন

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বিএনপি যখনই সরকার গঠন করেছে, তখনই সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। প্রতিটি সংকটকেই সরকার সুযোগে পরিণত করেছে এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা হয়েছে। তবে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়া এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি।

তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি পতিত সরকার অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় রেখে গেছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ অর্থনীতিকে প্রাণ দিয়েছে। এটা কোনো প্রথাগত সংস্কারের ফল নয়, বরং মানুষের দেশপ্রেম ও শ্রমের ফল। তাই উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ও ভূ-রাজনৈতিক কারণে সৃষ্ট সংকটকে সৃজনশীল কায়দায় মোকাবিলা করাই হলো আসল সংস্কার। অনেক কেতাবি লোক সংস্কার ও অগ্রগতির প্রকৃত অর্থ বোঝেন না।

তিনি ইশতেহারের পাঁচটি প্রধান স্তম্ভের কথা উল্লেখ করে বলেন, আমাদের সরকারের পাঁচটি স্তম্ভ হলো- রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সংস্কার, সমতাভিত্তিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠন, সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়ন ও সম্প্রীতি, প্রগতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালীকরণ।

বিনিয়োগ নিয়ে তিতুমীর বলেন, দেশে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ নিশ্চিত না হলে কোনো বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে না—এটি বিশ্বের কোথাও ঘটেনি। তাই বাংলাদেশের বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি রাজস্ব নীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনভাবে কাজ করার প্রতি সরকারের আস্থার কথা জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থনীতির পুনর্গঠনের জন্য বিশেষ ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম বা রিফাইনান্সিং প্যাকেজ গ্রহণ করবে।

সম্প্রতি পাস হওয়া ব্যাংক রেজুলেশন সংক্রান্ত এক প্রশ্নে জবাবেবে তিনি বলেন, আইনে সবার জন্য সুযোগ রাখা হয়েছে। যদি এই আইনের সঙ্গে সংবিধান বা অন্য কোনো আইনের সংঘর্ষিক মনে হলে যে কেউ চাইলে আদালতের দারস্থ হতে পারেন।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান সরকারের তিনটি প্রধান অগ্নিপরীক্ষার কথা উল্লেখ করে বলেন, প্রথমটি হলো- উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অর্থনৈতিক সংকটসমূহ মোকাবিলা করা। দ্বিতীয়টি হলো- আইএমএফের শর্তাবলি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি এবং ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করে নীতি গ্রহণের স্বাধীনতা বজায় রাখা। তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং প্রবৃদ্ধিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করা।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও তা ন্যায়বিচারভিত্তিক হয়নি; ২০১০ সালে ধনীদের সঙ্গে দরিদ্রদের আয়ের ব্যবধান যেখানে ৩২ গুণ ছিল, ২০২২ সালে তা বেড়ে ৮১ গুণ হয়েছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়তে তিনি শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় সরকারে দেয়া পরিকল্পনা অনুযায়ী জিডিপির বরাদ্দের প্রস্তাব করেন।

ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে তিনি বলেন, কেবল ঋণের পুনঃতফসিল করে খেলাপি ঋণের সমস্যার সমাধান হবে না, বরং সুশাসন প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। বাংলাদেশ ‘মধ্যম আয়ের ফাঁদ’ এবং ‘ঋণ ফাঁদ’-এর ঝুঁকিতে রয়েছে। বর্তমানে বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধ শিক্ষা খাতের চেয়েও বড় ব্যয় খাত হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা অর্থনীতির জন্য একটি অশনিসংকেত।

বিকেএমইএর সভাপতি হাতেম বলেন, দেশের জ্বালানি সংকট সমাধানে সোলার প্যানেল ভুমিকা রাখতে পারে। তবে এই খাতে এনবিআরের ট্যাক্স বা ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সোলার প্যানেল জনপ্রিয় করা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, কোভিডের পর থেকে দেশের অর্থনীতির নিম্নমুখী গতিধারা। বেশ কিছু মাস ধরে রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি। একইসঙ্গে ব্যাংকগুলোর অসহযোগিতা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতির কারণে পোশাক কারখানাগুলোতে প্রভাব পড়েছে। ফলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, সরকারের উচিত শিল্প খাতের স্থিতিশিলতার জন্য আকস্মিক নীতি পরিবর্তন বন্ধ করা। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় যেকোনো শিল্পনীতি অন্তত পাঁচ বছরের জন্য দীর্ঘমেয়াদী করতে হবে, যাতে বিনিয়োগ ঝুঁকিতে না পড়ে।

এমএস

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...