তপ্ত দুপুর! কাঠফাটা রোদ! তাতে কী? ইচ্ছাশক্তি তীব্র হলে কোনো বাধাই কোনো কাজ আটকাতে পারে না। প্রখর রোদ, তুমুল বৃষ্টি—কোনো প্রতিবন্ধকতাই ভ্রমণের ইচ্ছা দমাতে পারে না।
ঈদের পরে ফিচার বিভাগের সবার একসঙ্গে খাওয়ার কথা ছিল; কিন্তু সবাইকে একসঙ্গে না পাওয়ায় তা হয়ে উঠছিল না। পরে সিদ্ধান্ত হয় আমরা কোথাও বেড়াতে গিয়েই একসঙ্গে খাব।
সেদিন ছিল শুক্রবার, এপ্রিলের ৩ তারিখ। আমাদের সুন্দর কোনো জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার কথা। এদিকে অফিসও আছে। দু-একজনের সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবার থাকলেও অন্যদের যথারীতি অফিস খোলা। যাহোক, অবশেষে আমরা সবাই মিলে সুবর্ণগ্রাম যাওয়ার জন্য মনস্থির করলাম। এজন্য সকাল ১০টায় সবার অফিসে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো যাতে সকালে অফিসে এসে সবাই মোটামুটি কাজ সেরে নিতে পারেন। একসঙ্গে বেরিয়ে পড়ার প্রস্তুতি চলছে। তবে বয়সে যিনি সবচেয়ে তরুণ, সেই ৭৪ বছর বয়সি এভারগ্রিন এনায়েত ভাই এলেন সকাল সোয়া ৯টায়। শাহীন ভাই ও মানিক ভাইও নির্ধারিত সময় ১০টার মধ্যেই অফিসে এলেন।
অফিসের কাজ গুছিয়ে সবাই দুপুর ১২টায় গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়ার উদ্দেশে রওনা হলাম। সেখানে গিয়ে টিকিট কেটে গ্লোরি বাসে উঠে গেলাম। টিকিট জনপ্রতি ৫০ টাকা। এক ঘণ্টার মধ্যেই আমরা রূপগঞ্জ গাউসিয়ায় পৌঁছে গেলাম। সেখানে নামলাম। ভ্রমণসঙ্গী সহকর্মীরা সেখানে আমাকে একটি খাবারের রেস্তোরাঁয় বসালেন। তারপর তারা পাশের একটি মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করলেন। নামাজ শেষ করে তারা সেই রেস্তোরাঁয় ফিরে এলেন।
‘সবাই কী খেতে চান,’ জানতে চাইলাম। ভাতের খোঁজ করা হলো। তেমন ভালো ব্যবস্থা না থাকায় মানিক ভাই বলল, কাচ্চি খাবে। অবশেষে এই প্রচণ্ড গরমে এনায়েত ভাই, মানিক ভাইসহ আমরা তিনজন কাচ্চি খেলাম; সঙ্গে বোরহানি। আর শাহিন ভাই তেহারি খেলেন। আমরা একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। ডেজার্ট একটু সেমাই বাসায় থেকে রান্না করে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তখন আর কেউ খেলেন না বেশি খাওয়া হয়ে গেছে বলে। বিকালের নাশতার জন্য রেখে দেওয়া হলো।

এবার গন্তব্যে যাওয়ার পালা। অটোরিকশায় করে আমরা সুবর্ণগ্রামের দিকে রওনা হলাম। সাঁই সাঁই করে দ্রুতবেগে রিকশা চলতে লাগল। মজার ব্যাপার হলো—কিছুদূর গিয়ে বাতাসে শাহীন ভাই আর মানিক ভাইয়ের ক্যাপ উড়ে পড়ে যায়! এ সুযোগে তাদের ছোট্ট টাক দেখতে পেয়ে আমি আর এনায়েত ভাই অনেক আনন্দ পেয়েছি। এমন দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে না পেরে আমার খুব আফসোস হলো। যাহোক, কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমরা গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম।
জনপ্রতি ৩০০ টাকা করে টিকিট কেটে আমরা ভেতরে প্রবেশ করলাম।
দুপুরের কড়া রোদ। ভেতরে ঢোকার পরে কয়েক পা হাঁটতেই সামনে একটি সুন্দর গাছ। আমরা গাছের ছায়ায় বসে কিছুক্ষণ আড্ডা দিলাম। গাছের নিচে বসে এবং দাঁড়িয়ে আমরা বেশকিছু ছবিও তুললাম।
তারপর শাহীন ভাই বললেন, ‘আপা, জায়গাটি বেশ বড়। এখানে বেশিক্ষণ থাকলে সবকিছু দেখে শেষ করতে পারবেন না।’ আমরা চারজন উঠে আস্তে আস্তে হাঁটতে থাকলাম। সুন্দর কোনো দৃশ্য দেখলেই থেমে যাচ্ছি; ছবি তুলে আবার হাঁটছি।
আরো কিছুক্ষণ হাঁটার পরে সামনে একটি দোলনা দেখতে পেলাম। মানিক ভাই কালক্ষেপণ না করে দোলনায় বসে দোলতে লাগলেন। তিনি আবার সঙ্গে করে ভিডিওগ্রাফারের মতো ট্রাইপড নিয়ে গেছেন। সেটা সেট করে নিয়ে নিজের ও প্রকৃতির ভিডিও করছেন, ছবি তুলছেন। দোলনায় বসে মানিক ভাই নিজেই নিজের ছবি তুলেছেন আর ভিডিও করছেন।
তিনি আমাদের সবাইকেই দোলনায় উঠে বসার আমন্ত্রণ জানালেন। আমরাও সবাই উঠে বসলাম। বয়সের ভেদাভেদ ভুলে আমরা সবাই দোলনায় দুলতে দুলতে কিছুক্ষণের জন্য কৈশোরে ফিরে গেলাম। হাসি-ঠাট্টায় চমৎকার সময় কাটল। আমরা সবাই দোলনা থেকে নামলেও মানিক ভাই দুলতেই থাকলেন। তাকে বারবার ডেকে নামানো হয়।
সবসময় ভাবতাম, আমিই বেশি ছবি তুলি; কারণে-অকারণে ভিডিও করি। এক্ষেত্রে আমার ধারণা সম্পূর্ণ মিথ্যে করে দিয়ে মানিক ভাই কয়েক ধাপ এগিয়ে রইলেন। আরো কিছুক্ষণ হাঁটার পরে দেখলাম, তার গায়ের বসনও বদলে গেছে। সবাই হাসাহাসি করলাম। তিনি এসবের ভ্রুক্ষেপ না করে তার শুটিং অব্যাহত রাখলেন।
লেক পাড়ে গিয়ে মানিক ভাই নায়কসুলভ আচরণ করছিলেন। ট্রাইপড ঠিকমতো সেট করে খুব ভাব নিয়ে বিভিন্ন স্টাইলে একাই ভিন্ন ভিন্ন অভিব্যক্তি দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। দেখে বেশ মজাই পাচ্ছিলাম। আমিও অনেক ছবি তুললাম, ভিডিও করলাম। গ্রুপ ছবিও তুললাম। তারপর একজায়গায় বসে বিকালের নাশতা করলাম। আইসক্রিম ও টুকটাক অনেক কিছু খেলাম; সেইসঙ্গে সেমাই খাওয়া হলো। চোখজুড়ানো সবুজ কুঞ্জছায়ায় এমন সুন্দর কৃত্রিম লেকের পাশে বসে খাওয়া আর গল্প-আড্ডার তুলনা হয় না। অসাধারণ সময় কেটেছে।
থেমে থেমে ছবি তুলতে পারব না বলে শুরুতে তখন আর রিকশা নেওয়া হয়নি। কিছুক্ষণ হেঁটে দেখার পরে আমরা রিকশা নিয়ে পুরোটা ঘুরে দেখব বলে ঠিক হয়। তা-ই হলো। আমরা লেক পাড় থেকে বেরিয়ে অটোরিকশায় পুরো জায়গাটি ঘুরে দেখতে অন্যদিকে চলে গেলাম। এরই মধ্যে একটু হাঁটতেই সবুজ মাঠ নজরে এলো। সেখানে কখনো বসে কখনো দাঁড়িয়ে ফটোসেশন শেষ হলো। আরো দুটি দোলনার দেখা মিলল। মানিক ভাই তা দেখেই উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠলেন, ‘দেখছেন বিউটি আপা! এখানেও দুটি দোলনা আছে।’ তার যে আবার দোলনায় ওঠার লোভ হচ্ছে, এটা বুঝতে সমস্যা হলো না; বললাম, ‘আগেরটায় অনেকক্ষণ দুলেছেন, এখন আর নাইবা উঠলেন! এখনো আরেকটি সাইড দেখা বাকি আছে।’
এবার অটোরিকশায় করে পুরো এলাকাটি ঘুরে দেখার পালা। জনপ্রতি ৫০ টাকা করে টিকিট কেটে আমরা চারজন অটোরিকশায় উঠে বসলাম। জায়গাটি বেশ বিস্তৃত। দর্শনার্থীদের আকর্ষণ বাড়াতে এর পরিধি আরো বাড়ানো হচ্ছে এবং রাইডের সংখ্যা বাড়াতে নতুন করে কাজ চলছে।
অটোরিকশায় করে আমরা পুরো জায়গাটা ঘুরে দেখলাম। আমরা চারজনই আনন্দময় সময় কাটিয়েছি। আমাদের অন্য সহকর্মী যারা যেতে পারেননি তাদের অনেক মিস করেছি। আগামীতে আশা করি এমন ভ্রমণে তারাও অংশগ্রহণ করে আনন্দ দ্বিগুণ করবেন।
এবার ফেরার পালা। সন্ধ্যা নামার আগেই আমরা বেরিয়ে গেলাম। একইভাবে আবার অফিসে ফিরে এলাম। সবাই এই ঘুরাঘুরি দারুণ উপভোগ করেছি। স্মৃতির পাতায় দিনটি অম্লান হয়ে থাকবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

