মিথ্যার যুগে সত্যের প্রতি একজন সাংবাদিক

আয়েশা কবির

মিথ্যার যুগে সত্যের প্রতি একজন সাংবাদিক

পেছন ফিরে তাকালে শেখ হাসিনা ও তার আওয়ামী লীগ সরকারের পতন অবশ্যম্ভাবীই মনে হয়েছিল। কিন্তু যখন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার গোষ্ঠী ও অনুচরদের নিয়ে স্বৈরাচারী ক্ষমতার শিখরে পৌঁছেছিলেন, মনে হয়েছিল টিকে যাবেন। তাই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যখন তার সাম্রাজ্যের পতন ঘটল, তখন দেশজুড়ে স্বস্তি ও উল্লাসের ঢেউ বয়ে গেল। এটি ছিল যুব ও জনগণের এক সফল অভ্যুত্থান।

একজন বিচক্ষণ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক অবশ্যই অবগত থাকবেন যে, যেমন ‘রোম এক দিনে নির্মিত হয়নি’, তেমনি ‘রোমান সাম্রাজ্যের পতনও’ রাতারাতি ঘটেনি। আর একই কথা বাংলাদেশে হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

বিজ্ঞাপন

সাংবাদিক মো. শাখাওয়াত হোসেন তার ‘মাই জার্নালিজম আন্ডার ফ্যাসিস্ট হাসিনা’ বইটিতে ঠিক এই বিষয়টিই বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। দেশের স্বনামধন্য সাপ্তাহিক ‘হলিডে’সহ বাংলা ও ইংরেজি উভয় সংবাদমাধ্যমে কাজ করার পাশাপাশি শাখাওয়াত হোসেন ঢাকায় একটি বিদেশি কূটনৈতিক মিশনে দীর্ঘ সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সব কূটকৌশল ও কারসাজিসহ রাজনৈতিক ঘটনাবলি কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ ও বিচক্ষণতা তার ছিল।

কোনো কিছুই তার কলমকে থামাতে পারেনি, এমনকি দীর্ঘদিনের চাকরি থেকে বরখাস্তিও নয়। তিনি ছিলেন সত্যনিষ্ঠ একজন সাংবাদিক। আর এই বইটি শেখ হাসিনা ও তার আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সংঘটিত ঘটনাবলির এক বিশদ বিবরণ। বইটি চারটি প্রধান অংশে বিভক্ত—১. রাজনীতি/গণতন্ত্র/নির্বাচন; ২. আইনশৃঙ্খলা, মানবাধিকার; ৩. দুর্নীতি; এবং ৪. পররাষ্ট্রনীতি।

প্রসঙ্গক্রমে বলতে গেলে, বইটির মুখবন্ধে লেখক বেশ খোলাখুলিভাবেই বলেছেন, সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনটি সাধারণভাবে যতটা অবাধ ও সুষ্ঠু বলে মনে করা হয়, আসলে ততটা ছিল না। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার জন্যই এটি সূক্ষ্মভাবে সাজানো হয়েছিল। যদিও এ বিষয়ে অনেকের মধ্যে একটি সাধারণ ধারণা রয়েছে, তবুও বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার একটি প্রবণতাও আছে। শাখাওয়াত হোসেন এ বিষয়ে আরো বেশি স্পষ্টভাষী। তিনি তার ব্যক্তিগত দৃঢ় বিশ্বাসের কথা বলেন যে, সত্য অবশ্যই প্রকাশ করতে হবে। তিনি এ কথাও তুলে ধরতে প্রস্তুত যে, আওয়ামী লীগ সরকার ও তার নেত্রী শেখ হাসিনার পতন শুধু একটি ৩৬ দিনের আন্দোলনের ফল ছিল না, বরং বছরের পর বছর ধরে নিপীড়িত, নির্যাতিত ও দমন-পীড়নের শিকার গণতন্ত্রপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘ ও বিস্তৃত সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি ছিল।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের বিতর্কিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিয়ে শুরু করে, যে নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আবারও বিপুল ভোটে ক্ষমতায় আসে, লেখক তার এই দাবিকে সমর্থন করার জন্য বিদেশি গণমাধ্যমের উদ্ধৃতি দিয়েছেন যে, এই নির্বাচন প্রহসন ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

একটি বিদেশি গণমাধ্যমের ভাষ্যমতে, ৯৬ শতাংশ ভোটের এই বিশাল ব্যবধান উত্তর কোরিয়ার মতো দেশে প্রত্যাশিত, বাংলাদেশের মতো গণতান্ত্রিক দেশে নয়। আরেকটি গণমাধ্যম বলেছে যে, আপাতদৃষ্টিতে একদলীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিরোধী দলকে কোণঠাসা করা হয়েছে।

তিনি আল জাজিরা থেকে উদ্ধৃত করেছেন, “৩০ ডিসেম্বর যা ঘটেছে, তা পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে, বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এক অদ্ভুত ধরনের একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, অথচ ভোট সঠিকভাবে গণনা করা হয় না; যেখানে অসংখ্য বিরোধী দলকে টিকে থাকার অনুমতি দেওয়া হলেও, তাদের কার্যত শক্তিহীন করে রাখা হয় এবং ক্ষমতার নাগাল থেকে দূরে রাখা হয়; এবং যেখানে কোলাহলপূর্ণ গণমাধ্যম ‘মুক্ত’ হলেও কেবল সরকার-অনুমোদিত বয়ানগুলোর একটি স্ব-নিয়ন্ত্রিত কোলাহলই তৈরি করতে সক্ষম।”

ভয়ভীতি প্রদর্শন, বিরোধী দলের পোলিং এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া, ব্যালট বাক্স ভর্তি করা প্রভৃতি নানা ধরনের কারচুপির কথা তুলে ধরার পাশাপাশি লেখক নির্বাচনকে ঘিরে চরম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কথাও তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, প্রধান বিরোধী দলের পক্ষে ভোট দেওয়ায় এক নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) অনিয়ম শনাক্ত করলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল ইসলাম টিআইবির অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। জাতিসংঘসহ দাতা সম্প্রদায় এই নির্বাচনে সন্তুষ্ট ছিল না, গণমাধ্যম সিএনএন এই বিতর্কিত নির্বাচনকে বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এক বিপজ্জনক নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখলেও সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি।

আওয়ামী লীগ স্থিতিশীলতার শান্তি আনেনি, এনেছে শুধু উন্নয়নের এক কৃত্রিম আবরণ, যাকে বিশ্লেষকরা ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত পকেট ভরার একটি উপায় হিসেবে দেখেছেন। ২০১৫ সালের ৪ অক্টোবর শাখাওয়াত হোসেন অনলাইন ম্যাগাজিন ‘ফার্স্ট নিউজ’-এ লেখেন যে, ‘দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতির ফলে জাতিকে এক নিরাপত্তাহীনতা গ্রাস করেছে।’ তিনি হত্যাকাণ্ড, গুম, গণধর্ষণ, শিশুহত্যাসহ অন্যান্য গুরুতর অপরাধের কথা উল্লেখ করেন।

হাসিনা ও তার সরকার তাদের স্বৈরাচারী শাসনকে দায়মুক্তি দিতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের আড়াল ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিল, সূক্ষ্মভাবে (হয়তো ততটাও সূক্ষ্মভাবে নয়) গণতন্ত্রের চেয়ে উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে। কিন্তু ২০১৮ সালের ৯ মার্চ ‘উইকলি হলিডে’-তে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে শাখাওয়াত হোসেন লিখেছিলেন, কীভাবে রাজনৈতিক প্রভাবে ৯৪ বিলিয়ন টাকা মূলধন আত্মসাৎ করা হয়েছিল। এটি তো হিমশৈলের চূড়া মাত্র। তিনি লিখেছিলেন, ‘সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক এবং বেসিক ব্যাংক নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে, কারণ তাদের পরিচালনা পর্ষদ অবৈধভাবে ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে ঋণ অনুমোদন, ঋণ প্রশাসন ও ঋণ তদারকিতে স্বচ্ছতার অভাব, ঋণগ্রহীতা নির্বাচনে দুর্বলতা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ঋণ প্রদান এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় অবহেলার কারণে জনগণের অর্থ লুটপাটের সুযোগ তৈরি হয়েছে।’

‘টাইটানদের সংঘর্ষ’ অধ্যায়ে লেখক বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে ভারতের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের কথা বলেছেন, যার উদ্দেশ্য ছিল এখানে চীনের ব্যবসায়িক উদ্যোগকে ব্যাহত করা। তিনি পররাষ্ট্রবিষয়ক অন্যান্য আকর্ষণীয় কূটনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ও কৌশল নিয়েও লিখেছেন। মূল কথা হলো, এমনকি বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও হাসিনা সরকার জাতীয় লাভের চেয়ে ব্যক্তিগত লাভের দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছে; কিছু ক্ষেত্রে ছিল অধীনতামূলক এবং অন্য ক্ষেত্রে উদ্ধত।

এভাবেই বইটি একজন বিশ্লেষণধর্মী সাংবাদিক হিসেবে লেখকের দৃষ্টিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের দেশব্যাপী শাসনের পুরো চিত্র তুলে ধরেছে। বইটি পড়তে আকর্ষণীয় এবং স্মৃতিকে ঝালিয়ে নেয়, যাতে বাংলাদেশ আর কখনো অপরাধ ও দুর্নীতির সেই দুষ্টচক্রে না পড়ে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...