প্রাচীন মসজিদের শহর মোহাম্মদাবাদ

আরিফুল আবেদীন টিটো ও টিপু সুলতান

প্রাচীন মসজিদের শহর মোহাম্মদাবাদ

মোহাম্মদাবাদ—ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ শহর থেকে কিছুটা দক্ষিণে অবস্থিত এক প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী জনপদ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর ঐতিহাসিক মসজিদে বেষ্টিত এই অঞ্চল বর্তমানে বারোবাজার নামে পরিচিত। এই শহরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য এখনো অমলিন।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, পঞ্চদশ শতাব্দীতে হজরত খানজাহান আলী (রহ.) ১২ জন সহচরসহ এই এলাকায় এসেছিলেন। তাদের আগমনের পর থেকেই স্থানটির নাম হয় ‘বারোবাজার’। পরবর্তীকালে ১৯৯৩ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে এখানে ১৯টি প্রাচীন মসজিদের নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়। ফলে এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে নতুনভাবে সবার সামনে আসে।

বিজ্ঞাপন

১৯৯৩ সালে স্থানীয় জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এ অঞ্চলের প্রাচীন নিদর্শনগুলো উদ্ধারের লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক খনন কার্যক্রম শুরু করে। এই অনুসন্ধানের ফলে উন্মোচিত হয় এক বিস্ময়কর ঐতিহাসিক পরিসর—মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসে একাধিক প্রাচীন মসজিদের ধ্বংসাবশেষ, সেনা ছাউনির চিহ্ন, সুগঠিত সিঁড়ি, কবরস্থান এবং একটি নদীবন্দর বা জাহাজঘাটের নিদর্শন।

বারোবাজারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হলো, সুলতানি আমলের মসজিদগুলো।

সাতগাছিয়া মসজিদ : বারোবাজারের সাতগাছিয়ায় এই মসজিদটি অবস্থিত। বড় একটি পুকুরের দক্ষিণ পাশে এই মসজিদের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। বর্তমানে শুধু এর দেয়াল ও নিচের অংশই অবশিষ্ট আছে। স্থানীয় লোকজন সর্বপ্রথম মাটিচাপা পড়ে থাকা এই মসজিদটি উদ্ধার করেন । মসজিদটির আয়তন লম্বায় ৭৭ ফুট ও চওড়ায় ৫৫ ফুট। ভেতরে রয়েছে ৪৮টি পিলার। এটি ৩৫টি গম্বুজের মসজিদ। পশ্চিম দেয়ালে লতাপাতার নকশাসমৃদ্ধ তিনটি মেহরাব রয়েছে। স্থানীয় সূত্র থেকে জানা যায়, এটি ১৯৯২ সালের দিকে আংশিক সংস্কার করা হয়েছিল।

গলাকাটা মসজিদ : বারোবাজারের গলাকাটা নামক স্থানে আবিষ্কৃত এই মসজিদটি ১৯৯৪ সালে খননের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়। প্রায় ২১ ফুট লম্বা ও ১৮ ফুট চওড়া এ মসজিদটি ছয় গম্বুজের। পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে তিনটি মেহরাব আর মজবুত দেয়ালগুলোর প্রস্থ প্রায় পাঁচ ফুট। মসজিদের ভেতরে মাঝখানে দুটি লম্বা কালো পাথর বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, একসময় এখানে এক অত্যাচারী রাজা ছিল, যে নানা অজুহাতে প্রজাদের শিরশ্ছেদ করে তাদের দেহ মসজিদের সামনের দিঘিতে নিক্ষেপ করত। এই গল্পের সূত্র ধরেই মসজিদটির নাম হয় ‘গলাকাটা মসজিদ’।

নুনগোলা মসজিদ : বারোবাজারের হাসিলবাগ গ্রামে বড় দিঘির পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত এক গম্বুজের নুনগোলা মসজিদটি স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। বর্গাকৃতির এই মসজিদে রয়েছে তিনটি অর্ধবৃত্তাকার মেহরাব, যেগুলোতে ছোট ছোট বর্গের মধ্যে সূক্ষ্ম জ্যামিতিক নকশাখচিত।

মসজিদের বাইরের দেয়ালে খাড়া চাল ও খাঁজের ধারাবাহিক বিন্যাসে দিগন্তরেখার মতো নকশা ফুটে উঠেছে। এটি এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় এক গম্বুজের মসজিদ। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘লবণগোলা মসজিদ’ নামেও পরিচিত, যদিও নামকরণের কারণ স্পষ্ট নয়।

হাসিলবাগ মসজিদ : নুনগোলা মসজিদের সামান্য পশ্চিমে অবস্থিত এক গম্বুজের মসজিদটি ‘শুকুর মল্লিক মসজিদ’ নামেও পরিচিত। পোড়ামাটির তৈরি এই মসজিদটি এ অঞ্চলের সবচেয়ে ছোট এক গম্বুজের স্থাপনা হিসেবে উল্লেখযোগ্য।

হাসিলবাগ এলাকায় প্রাচীনকালে দমদম জাহাজঘাটা, সেনানিবাস ও নদীবন্দরের অস্তিত্ব ছিল বলে জানা যায়। মসজিদটির উভয় পাশে একটি করে বন্ধ মেহরাব এবং পশ্চিম দেয়ালে একটি অর্ধবৃত্তাকার মেহরাব রয়েছে।

পাঠাগার মসজিদ : ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়কের পশ্চিম পাশে, কালীগঞ্জের বেলাট দৌলতপুর এলাকায় মসজিদটি অবস্থিত। এটি এক গম্বুজের ছোট মসজিদ। লাল ইটের তৈরি এই মসজিদটি দীর্ঘদিন মাটির নিচে চাপা ছিল। ২০০৭ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটি আবিষ্কার ও সংস্কার করে।

জনশ্রুতি আছে, সুলতানি আমলে এই মসজিদকে কেন্দ্র করে একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার গড়ে উঠেছিল, যার সূত্র ধরেই এর নামকরণ করা হয়েছে। মসজিদের পাশেই পিঠেগড়া পুকুর নামে বড় একটি দিঘি রয়েছে।

পীর পুকুর মসজিদ : পাঠাগার মসজিদের পশ্চিম পাশের সড়ক ধরে দুটি বাঁক পেরোলেই দেখা মেলে একটি বিশাল পীর পুকুরের। এই পুকুরের পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত বড় আকৃতির একটি ঐতিহাসিক মসজিদ, যা ১৯৯৪ সালে খননের মাধ্যমে মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়।

লাল ইটের তৈরি এই মসজিদটির বর্তমানে কোনো ছাদ নেই—শুধু দেয়ালগুলো দেখা যায়। এই স্থাপনাটি মূলত ছিল ১৬ গম্বুজের।

গোড়ার মসজিদ : পীর পুকুর মসজিদের পাশ দিয়ে তাহেরপুর সড়ক ধরে একটু পশ্চিমে গেলে বাঁ পাশে দেখা যায় প্রাচীন গোড়ার মসজিদ। চার গম্বুজের এই মসজিদের মেহরাব ও দেয়ালে পোড়ামাটির ফুল, লতাপাতা ও ফলের সুন্দর নকশা রয়েছে। বাইরের দেয়ালও লাল ইটে নির্মিত।

এই মসজিদটি খানজাহান আলী নির্মাণ করেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে। ১৯৮৩ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটি আবিষ্কার করে। খননের সময় পাশেই গোড়াই নামে এক দরবেশের কবর পাওয়া যায়, যার নাম থেকেই মসজিদটির নাম হয়েছে গোড়ার মসজিদ।

জোড় বাংলা মসজিদ : জোড় বাংলা মসজিদটি ১৯৯৩ সালে সংস্কার করা হয়। খননের সময় সেখানে একটি ইট পাওয়া যায়। তাতে আরবি অক্ষরে লেখা ছিল ‘শাহ সুলতান মাহমুদ ইবনে হুসাইন, ৮০০ হিজরি’। ফলে ধারণা করা হয়, ৮০০ হিজরির দিকে সুলতান মাহমুদ এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। ছোট ছোট পাতলা ইটে গাঁথা এই মসজিদ ১১ ফুট উঁচু একটি প্ল্যাটফর্মের ওপর স্থাপিত। জনশ্রুতি আছে, মসজিদের পাশে জোড়া কুঁড়েঘর ছিল বলেই এর নাম হয়েছে জোড় বাংলা মসজিদ।

মনোহর মসজিদ : বারোবাজারে খননকার্য পরিচালনার সময় মনোহর ঢিবি নামক স্থানে একটি প্রাচীন মসজিদের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়। মসজিদটির উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে লম্বালম্বিভাবে নির্মিত। অভ্যন্তরের আয়তন ২২ দশমিক ৬৭ ও ২২ দশমিক ৬৭ ফুট এবং মসজিদের দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় পাঁচ ফুট। ধ্বংসাবশেষ দেখে ধারণা পাওয়া যায়, মসজিদের মাথায় ৩৫টি গম্বুজ ও চারটি মিনার ছিল। খননের পর দুটি মিনারের পাঁচ ফুট পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...