পর্ব-১
স্থানীয় অধিবাসীদের ধর্মান্তরিত হওয়ার দৃষ্টান্তের চেয়ে বহিরাগত মুসলমানদের বাংলায় আগমন এবং এ দেশে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপনের ঘটনা—যে দৃষ্টিকোণ থেকেই বিচার করা হোক না কেন—অনেক বেশি ব্যাপক ও সুস্পষ্ট। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ভারত তথা বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পেছনে অন্যতম অনুঘটক ছিল মঙ্গোল আগ্রাসন এবং সে কারণে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোয় সৃষ্ট হয়েছিল চরম রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও নৈরাজ্য। এমন টালমাটাল পরিস্থিতিতে সেসব অঞ্চল থেকে অসংখ্য রাজপুত্র, সেনাপতি, ভাগ্যান্বেষী যোদ্ধা ও তাদের বিশাল অনুচররা বাধ্য হয়ে দেশত্যাগ করেন এবং এই ভূখণ্ডে এসে আশ্রয় নেন। বঙ্গে মুসলিম আধিপত্যের রূপকার ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজিও বস্তুত এমনই এক সুবিশাল ভাগ্যান্বেষী বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে এ দেশে প্রবেশ করেছিলেন।
ঐতিহাসিক মিনহাজ সিরাজের বর্ণনানুসারে, বিহারে বখতিয়ার খলজির অভাবনীয় সামরিক সাফল্যের সংবাদ পেয়ে খলজি উপজাতির বহু মানুষ দলে দলে তার পতাকাতলে সমবেত হয়। (তাবাকাতে নাসিরী (অনুবাদ: র্যাভার্টি), খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৫৫১)। অনুগামীদের আগমনের ক্রমবর্ধমান ধারাবাহিকতাই তাকে বাংলায় আধিপত্য বিস্তারে উদ্দীপিত করেছিল। মিনহাজের অপর একটি তথ্য থেকে তার অনুচরবাহিনীর ব্যাপকতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। মিনহাজ বলছেন, তিব্বত অভিযানে বখতিয়ার খলজির সঙ্গী হয়েছিল প্রায় ১০ হাজার বাছাইকৃত সৈন্য। (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৫৬০)। যদিও সেই অভিযান চরম ব্যর্থ হয়েছিল এবং বাহিনীর বড় একটি অংশ সেখানে প্রাণ হারিয়েছিল, তারপরও যারা কোনো রকমে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন, তারা দেবকোটে (দেওকোট) রেখে যাওয়া পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার উদ্দেশ্যে ফিরে এসেছিলেন।
অধিকন্তু নবপ্রতিষ্ঠিত মুসলিম রাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিম, পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রশাসন এবং প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ছিল বখতিয়ার খলজির তিন প্রধান সেনাপতি মুহম্মদ শিরান, হুসামুদ্দীন ইওয়াজ ও আলী মর্দানের ওপর। এই গুরুদায়িত্ব পালনার্থে তাদের অধীনে পর্যাপ্ত সৈন্যবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। কালক্রমে, এই বিপুলসংখ্যক সৈন্য ও তাদের অনুগামীরা এই বঙ্গভূমিতেই স্থায়ীভাবে নিজেদের আবাস গড়ে তোলে।
মঙ্গোল আক্রমণ ও বাংলায় তার প্রভাব
মঙ্গোলদের অবর্ণনীয় ধ্বংসলীলায় ইরান ও মধ্য এশিয়া যখন আক্ষরিক অর্থেই বিপর্যস্ত, ঠিক সেই ক্রান্তিলগ্নে প্রাচ্যে নবপ্রতিষ্ঠিত মুসলিম শাসনাঞ্চল বাস্তুচ্যুত বহু পরিবার, বণিক, পণ্ডিত, কারিগর ও শিল্পীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। বিপৎসংকুল ভূমি ত্যাগ করে উত্তর ভারত ও বাংলায় বসতি স্থাপনের অভাবনীয় সুযোগ তারা পেয়েছিলেন। ঐতিহাসিক মিনহাজ সিরাজ এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘স্রষ্টার অমোঘ বিধানে ইরান ও তুরানের রাজপাটের পর সার্বভৌমের অধিকার যখন অভিশপ্ত চেঙ্গিস খান ও তার বংশধরদের হস্তগত হয়েছিল, তখন পরম করুণাময়ের কৃপায় এই হিন্দুস্তান রাজ্যই ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কেন্দ্রবিন্দু এবং পুণ্যবানদের বিচরণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল।’ (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৮৬৯-৮৭৮)
ফলত বখতিয়ার খলজির বিজয়ের অব্যবহিত পরেই কেবল সামরিক ভাগ্যান্বেষী বা সৈন্য-সামন্তরাই নন, বরং বহু শান্তিকামী পেশাজীবী, পণ্ডিত ও সুফি-দরবেশ এ দেশে পাড়ি জমাতে শুরু করেন।
মিনহাজের ভাষ্যে আরো জানা যায়, ‘মুহম্মদে বখতিয়ারের অধীনে ফারগানা থেকে আগত দুই শিক্ষিত ভ্রাতা কর্মরত ছিলেন; তাদের একজনের নাম নিজামুদ্দিন এবং অপরজন সামসামুদ্দিন। এই গ্রন্থের রচয়িতা ৬৪১ হিজরিতে লখনৌতিতে সামসামুদ্দিনের সাক্ষাৎ লাভ করেন এবং এই বিবরণটি মূলত তার কাছ থেকেই প্রাপ্ত।’ (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৫৫২)
বখতিয়ার-পরবর্তী বাংলায় মুসলিম অভিবাসন
বঙ্গবিজেতা বখতিয়ার খলজির প্রাথমিক প্রশাসনিক ও জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপগুলোর অন্যতম ছিল মসজিদ নির্মাণ এবং পণ্ডিত ও সুফি সাধকদের জন্য উপযুক্ত আবাসস্থল প্রতিষ্ঠা করা। নবাগত এই মুসলিম সম্প্রদায় কতটা নিবিড়ভাবে এ ভূখণ্ডকে আপন করে নিয়েছিলেন, তা একটি ঐতিহাসিক ঘটনা থেকেই সুস্পষ্ট হয়। ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে বখতিয়ার খলজির মৃত্যুর পর তার পূর্বোক্ত তিন প্রধান সেনাপতি দেশত্যাগ করেননি; বরং এখানকার সর্বোচ্চ ক্ষমতা দখলের আশায় তারা নিজেদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এই আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে তাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান সুসংহত করার লক্ষ্যে বহিরাগত আরো বহু মানুষকে নিজেদের দলে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই ক্ষমতার লড়াইয়ে পরাজিত হয়েও কোনো প্রতিযোগী এ দেশ ছেড়ে যাননি; বরং তারা নিজ অনুসারীদের নিয়ে এই ভূখণ্ডেরই অপেক্ষাকৃত দুর্গম ও নিরাপদ অঞ্চলে পশ্চাদপসরণ করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, মুহম্মদ শিরান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অনুগামীদের নিয়ে বগুড়ার সন্তোষ অঞ্চলের দিকে সরে আসেন এবং সেখানেই স্থায়ী বসতি স্থাপন করেন। মুহম্মদ শিরানের সমাধিও এই সন্তোষেই অবস্থিত। অন্যদিকে আলী মর্দান খলজি, যিনি সাময়িকভাবে কুতুবুদ্দিন আইবেকের সাহায্য প্রার্থনায় দিল্লিতে গমন করেছিলেন, তিনিও ফিরে এসেছিলেন। জনৈক ঐতিহাসিকের ভাষায়—‘তুর্কি অভিবাসনের দ্বিতীয় ও অধিকতর শক্তিশালী স্রোতের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে।’ (হিস্ট্রি অব বেঙ্গল (History of Bengal), খণ্ড : ২)
তবে আলী মর্দানের এই ক্ষমতাগ্রহণ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; অনতিবিলম্বেই তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন এবং তার স্থলাভিষিক্ত হন হুসামুদ্দিন ইওয়াজ। তিনি ‘সুলতান গিয়াসুদ্দিন ইওয়াজ খলজি’ উপাধি ধারণ করে সুদীর্ঘ ১৪ বছর সগৌরবে শাসন করেন। তার শাসনকালে বঙ্গে মুসলিম আধিপত্যের অভূতপূর্ব বিস্তার ও সুসংহতকরণ সাধিত হয়। (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৮৪-৮৯)
গিয়াসুদ্দিন ইওয়াজ খলজির শাসনকালে স্থিতিশীল এই রাজনৈতিক পরিবেশ আরো বহু বহিরাগত মুসলমানকে এ দেশে আকৃষ্ট করে। সুলতান তাদের সাদরে অভ্যর্থনা জানান এবং এ দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের সব ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করেন।
গিয়াসুদ্দিন ইওয়াজ খলজির পৃষ্ঠপোষকতা
গিয়াসুদ্দিন ইওয়াজ খলজির রাজত্বকাল এবং দিল্লিতে সুলতান ইলতুৎমিশের শাসনকাল ছিল সমসাময়িক; আর সেই সময়েই পারস্য, আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় আছড়ে পড়ে চেঙ্গিস খানের ভয়াল আগ্রাসন। মঙ্গোলদের সেই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে প্রাণ বাঁচাতে বহু অভিজাত রাজপরিবার এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ভারতে এসে আশ্রয় নেন। সেইসব বাস্তুচ্যুত ও ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষের একটি অংশ কালক্রমে বঙ্গেও পাড়ি জমান। ঐতিহাসিক মিনহাজ গিয়াসুদ্দিন ইওয়াজের বদান্যতা ও উদার পৃষ্ঠপোষকতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। দরবারে সমবেত উলামা মাশায়েখ, সৈয়দ (নবী-বংশধর) এবং অন্যান্য গুণিজনদের তিনি যেভাবে অকাতরে আর্থিক অনুদান ও ভাতা প্রদান করতেন, মিনহাজের বর্ণনায় তা অত্যন্ত সাবলীলভাবে ফুটে উঠেছে। [তাবাকাত-ই-নাসিরি (অনুবাদ: র্যাভার্টি), খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৫৮৩]
৬২৪ হিজরিতে (১২২৭ খ্রি.) গিয়াসুদ্দিন ইওয়াজ খলজির ইন্তেকাল থেকে শুরু করে ৬৯৮ হিজরিতে (১২৯০ খ্রি.) দিল্লিতে খলজি রাজবংশের প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত দীর্ঘ সময়কালে লখনৌতি অঞ্চলটি মূলত দিল্লির সুলতান কর্তৃক নিযুক্ত কিংবা তার প্রতি অনুগত শাসনকর্তাদের দ্বারাই পরিচালিত হতো। এই প্রশাসনিক বিন্যাস বাংলায় মুসলিম রাজকর্মকর্তা ও তাদের বিশাল অনুচরবাহিনীর আগমনের পথকে আরো অবারিত করেছিল।
সে সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দুটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। প্রথমত, বাংলার শাসনকর্তা হিসেবে যারা নিযুক্ত হয়ে আসতেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা অনুসারীদের নিয়ে এই ভূখণ্ডেই স্থায়ী আবাস গড়ে তুলতেন; দ্বিতীয়ত, উত্তর ভারতে নিযুক্ত দিল্লির অন্যান্য শাসনকর্তারা সুযোগ পেলেই নিজেদের পূর্বতন অধিকার ত্যাগ করে বাংলার দিকে ধাবিত হতেন এবং এখানে স্বীয় আধিপত্য বিস্তারে সচেষ্ট হতেন। উদাহরণস্বরূপ, ৬৩৩ হিজরিতে (১২৩৬ খ্রি.) বিহারের শাসনকর্তা তুগরল তুঘান খান কর্তৃক বাংলার শাসনভার দখল, ৬৪২ হিজরিতে (১২৪৫ খ্রি.) অযোধ্যার (Oudh) শাসনকর্তা তমর খানের অনুরূপ পদক্ষেপ এবং ৬৫৭ হিজরিতে (১২৫৪ খ্রি.) কারার (এলাহাবাদ) শাসনকর্তা মালিক তাজুদ্দিন আরসলান খান কর্তৃক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছিল। বস্তুত সুজলা-সুফলা বাংলার দুর্নিবার মোহ থেকে দিল্লির রাজপুত্ররাও মুক্ত ছিলেন না। সুলতান ইলতুৎমিশের পুত্র রাজপুত্র নাসিরুদ্দিন বাংলায় রাজত্ব করেছিলেন এবং এই মাটিতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন; তার বংশধর ও অন্যান্য অনুগামীরাও এই ভূখণ্ডেই স্থায়ী হয়েছিলেন। এমনকি সুলতান বলবনের পুত্র রাজপুত্র বুগরা খান, যিনি ৬৮০ থেকে ৬৯০ হিজরি (১২৮১-১২৯০ খ্রি.) পর্যন্ত বাংলা শাসন করেছিলেন, তিনি দিল্লির সিংহাসনের চেয়ে লখনৌতির সিংহাসনকেই অধিক শ্রেয় জ্ঞান করেছিলেন। পরে খলজিরা যখন দিল্লির ক্ষমতা দখল করে, তখন তিনি এই লখনৌতিতেই স্বাধীন রাজবংশের গোড়াপত্তন করেন।
নবাগতদের কাছে বাংলার এই দুর্নিবার আকর্ষণের পশ্চাতে নিঃসন্দেহে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এর অঢেল সম্পদ ও প্রাচুর্য। তৎকালীন স্বল্প জনবসতির কারণে নতুন করে বসতি স্থাপনের জন্য এখানে যেমন প্রচুর অনাবাদি ভূমি ছিল; তেমনি এর ভৌগোলিক অবস্থানও অতুলনীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রদান করেছিল। উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে মঙ্গোলদের অবিরাম হুমকি এবং দিল্লির সংঘাতমুখর রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে যোজন যোজন দূরে থাকার সুবাদেই বাংলার পক্ষে এমন নিরাপদ অভয়ারণ্য হয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছিল। বস্তুত, সেই সময়ে লখনৌতি রাজ্যটি সমৃদ্ধি ও জাঁকজমকের নিরিখে খোদ দিল্লি সালতানাতের সমকক্ষ হয়ে উঠেছিল। লখনৌতির দুজন শাসক—রাজপুত্র নাসিরুদ্দিন ও মালিক জালালুদ্দিন মাসুদ জানি সগর্বে ‘মালিকুশ শারক’ বা ‘প্রাচ্যের অধিপতি’ উপাধি ধারণ করেছিলেন। অন্যদিকে যখন আমরা মধ্য এশিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত অসংখ্য রাজপুত্র ও অভিজাতদের বাংলায় এসে আশ্রয় গ্রহণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেবো, তখন তুগরল তুঘান খান কর্তৃক ‘মুগিসুল মুলক ওয়াস সালাতিন’ (রাজা ও সুলতানদের ত্রাণকর্তা) উপাধি গ্রহণের তাৎপর্যটি উপলব্ধি করা সম্ভব হবে। (৬৪০ হিজরির বিহার শিলালিপি, জেএএসবি, ১৮৭৩, পৃষ্ঠা ২৪৫-২৪৬। আরো দেখুন পূর্বে, পৃষ্ঠা ৯৪)
পরবর্তী সময়ে দিল্লিতে খলজি বিপ্লবের (৬৯০ হি./১২৯০ খ্রি.) ফলে ক্ষমতাচ্যুত ইলবারি তুর্কি অভিজাতদের আরো একটি বিশাল জনস্রোত দেশান্তরী হয়ে বাংলায় চলে আসে। সেই সময়ে বাংলায় বুগরা খান (বলবনের পুত্র) এবং তার বংশধরেরা স্বাধীনভাবে রাজত্ব করছিলেন। নিজেদের সিংহাসন নিষ্কণ্টক করার স্বার্থে খলজি শাসকেরাও অবশিষ্ট বলবনি অভিজাত এবং তাদের সমর্থকদের বাংলায় নির্বাসনে পাঠাতেন। সুলতান জালালুদ্দিন ফিরোজ খলজি কর্তৃক নৌকা বোঝাই করে এমন অবাঞ্ছিত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বাংলায় নির্বাসন দেওয়ার ঐতিহাসিক বিবরণটি সর্বজনবিদিত; কথিত আছে, এক দফাতেই প্রায় এক হাজার জন লোককে বঙ্গে নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল। (জিয়াউদ্দীন বরনি, তারিখ-ই-ফিরুজশাহী, পৃষ্ঠা ১৪১)
ঐতিহাসিকদের একাংশের মতে, এই সময়ে অসংখ্য সুফি সাধক, শায়খ ও গাজি মুসলিম বাংলার সীমানা সম্প্রসারণে যে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছিলেন, তার মূলে ছিল বহিরাগত মুসলমানদের এই নতুন জনস্রোত। যৌক্তিকভাবেই এই ধারণা পোষণ করা যায়, বাংলার সুলতানদের জন্য এত বিপুলসংখ্যক নির্বাসিত মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার সবচেয়ে কার্যকর ও সহজ উপায়টি ছিল তাদের একটি বিশেষ ‘বিদেশি বাহিনী’ বা ‘ফরেন লিজিয়ন (Foreign Legion)’-এ তালিকাভুক্ত করে সামরিক ও রাজ্য বিস্তারমূলক কার্যক্রমে বাংলার সীমান্তে নিয়োজিত করা। (স্টেপলটন, জেএএসবি, এনএস, খণ্ড ১৮, ১৯২২, পৃষ্ঠা ৪১, ৪১৪, ৪১৫। আরো দেখুন পূর্বে, পৃষ্ঠা ১০৩-১০৪)। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত উদ্বাস্তু রাজপুত্র ও উচ্চাভিলাষী অভিজাতদের বাংলায় এই সরব উপস্থিতিই হয়তো সুলতান কায়কাউসকে (৬৮৯-৭০১ হি./১২৯০-১৩০১ খ্রি.) ‘তুর্ক ও পারস্যের শাহজাদাদের অধিপতি’—এমন জাঁকজমকপূর্ণ উপাধি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছিল। (কায়কাউসের লখিসরাই শিলালিপি, জেএএসবি, ১৮৭৩, পৃষ্ঠা ২৪৭-২৪৮; ইআইএম, ১৯১৭-১৯১৮, পৃষ্ঠা ১০-১১)
৭২০ হিজরি, ১৩২০ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লিতে খলজি শাসনের অবসান ঘটিয়ে তুঘলক রাজবংশ আসীন হলে ক্ষমতার পালাবদলে বিচ্যুত অভিজাতদের আরেকটি ঢেউ দেশান্তরী হয়ে বাংলায় আশ্রয় নেয়। এমনকি তুঘলকদের অভ্যন্তরীণ কলহ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বও অনেক ক্ষেত্রে একই পরিণতির পথ প্রশস্ত করেছিল। ইবনে বতুতার বিবরণী থেকে জানা যায়, পিতা গিয়াসুদ্দিন তুঘলকের বিরুদ্ধে জুনা খানের ব্যর্থ বিদ্রোহের পর যখন দমন-পীড়ন শুরু হয়, তখন রাজরোষ থেকে বাঁচতে অনেক আমির বাংলায় পলায়ন করেন। তারা সুলতান গিয়াসুদ্দিন বলবনের পুত্র সুলতান নাসিরুদ্দিনের (বুগরা খান) উত্তরসূরি সুলতান শামসুদ্দিনের লখনৌতি দরবারে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং সেখানেই নিজেদের অবস্থান সুসংহত করেন। (ইবনে বতুতা, রিহলা, বৈরুত মুদ্রণ, ১৯৬৪, পৃষ্ঠা)
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

