ধীরগতিতে তদন্ত চলছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর। অভ্যুত্থানের ঘটনায় ঢাকাসহ সারা দেশে মোট ১ হাজার ৮৪১টি মামলা হয়। তদন্ত শেষে ১৪৭টির অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। অর্থাৎ এখনো ১ হাজার ৬৯৪টি মামলা তদন্তাধীন। কবে তদন্ত শেষ হবে বলতে পারেনি পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলাগুলো খুবই জটিল। তার ওপর সে সময় অনেকেই ভুয়া মামলা করেছে। অনেককে ফাঁসানোর জন্য আসামি করা হয়েছে। আবার একটি ঘটনায় একাধিক থানায় মামলা হয়েছে। সব মিলিয়ে মামলাগুলো যাচাই-বাছাই করছে পুলিশ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সহিংসতা ও হত্যা মামলা বেশি। মামলাগুলোতে বেশিরভাগই রাস্তায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু এবং লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে হত্যার অভিযোগ করা হয়েছে।
ভিডিও ফুটেজ, কল রেকর্ড, ফরেনসিক পরীক্ষার পাশাপাশি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত করছে পুলিশ। মামলাগুলোর তদন্ত যাতে নির্মোহ হয় সেজন্য পুলিশ মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। এছাড়া কোনো মামলায় নিরীহ ব্যক্তিকে ফাঁসানো হয়েছে কি না সে বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে। বিশেষ করে, ওইসব ব্যক্তির আবেদন পর্যালোচনা ও মাঠপর্যায়ে তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, শেরপুর, ফেনী, চাঁদপুর, কুমিল্লা, ঢাকা, কুড়িগ্রাম, রাজশাহী, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নওগাঁ, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামে সংঘটিত হত্যা মামলাগুলোর অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। কিছু জেলার মামলার অভিযোগপত্র তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে।
গণঅভ্যুত্থানের মামলাগুলোর তদন্ত কী পর্যায়ে আছে তা জানতে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাড়া দেননি।
সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা বলেন, মামলার তদন্ত একটি জটিল কাজ। তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার আগে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই জরুরি। এখানে হেরফের হলে নিরীহ মানুষ ফেঁসে যাবে।
পুলিশ জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর ঢাকাসহ সারা দেশে ১ হাজার ৮৪১টি মামলা হয়েছে। মামলায় আসামি করা হয়েছে কয়েক হাজার মানুষকে। প্রায় প্রতিটি মামলায় গণঅভ্যুত্থানের মুখে ভারতে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও তার দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ অন্যান্য নেতাকে আসামি করা হয়েছে।
আসামি করা হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের এমপি ও মন্ত্রীদের। মামলাগুলোতে ৯৫২ জন পুলিশ সদস্যকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে দুই আইজিপি ও ডিএমপির সাবেক এক কমিশনারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলায় ৭৬৭টি খুনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা মহানগরীতে মামলা হয়েছে ৭৫৮টি।
এর মধ্যে হত্যা মামলা ৪৬৮টি। ডিএমপির ১৫৩টি মামলা তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআই ছাড়াও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও সিআইডি অন্যান্য মামলা তদন্ত করছে।
সূত্র জানায়, জুলাই আন্দোলনে নিরীহ লোকজনের ওপর হামলার অভিযোগে কারাবন্দি সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে ১৫৯টি, ঢাকা মহানগর ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধে ১৭৫টি, সাবেক আইজিপি কারাবন্দি একেএম শহিদুল হকের বিরুদ্ধে ২৪টি, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি বিপ্লব কুমার সরকারের বিরুদ্ধে ১২৯টি, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ১১৮টি, সাবেক এসবিপ্রধান পলাতক মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ৪৮টি, অতিরিক্ত ডিআইজি এসএম মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে ৩৩টি, ডিএমপি ওয়ারীর ডিসি ইকবাল হোসাইনের বিরুদ্ধে ২৭টি, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি চৌধুরী মঞ্জুরুল করিমের বিরুদ্ধে ২০টি ও সাবেক ডিআইজি মো. আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে ১৮টি মামলা হয়েছে।
জানা গেছে, জুলাই বিপ্লবের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ৩৭২ জনকে অব্যাহতি দিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে হবিগঞ্জ, জয়পুরহাট, মানিকগঞ্জ ও গাজীপুর জেলায় একজন করে, খুলনায় দুজন, সিলেটে ৩৯ জন, ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) ১২ জন, ঢাকা জেলায় ২৫ জন এবং কুড়িগ্রামের ১৮ জনসহ বিভিন্ন জেলার মানুষ রয়েছে।
শহীদ নামে ধানমন্ডির এক ব্যবসায়ী আমার দেশকে বলেন, তিনি চিনি ব্যবসায়ী। থাকেন ধানমন্ডিতে। জুলাই অভ্যুত্থানে যাত্রাবাড়ী থানার মামলায় তাকে ফাঁসানো হয়েছে। পুলিশ বাসায় এসেছে। বিষয়টি জানার পর তিনি আতঙ্কিত হয়ে যান। পরে মামলা থেকে অব্যাহতি পেতে পুলিশের কাছে দরখাস্ত করেন। বিভিন্ন স্থানে ধরনা দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমাকে ফাঁসানো হয়েছে।’
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

