পাঁচ জেনারেল ও বাংলার ট্র্যাজেডি

কমডোর জসীম উদ্দীন ভূঁইয়া (অব.)

পাঁচ জেনারেল ও বাংলার ট্র্যাজেডি

(দ্বিতীয় পর্ব)

ইতিহাসের অভিশপ্ত আবর্তন : বাংলার রাজনৈতিক আকাশে বিশ্বাসঘাতকতার মেঘ নতুন কিছু নয়। ইতিহাসের চাকা ঘুরতে ঘুরতে বারবার আমাদের এমন এক মোহনায় এনে দাঁড় করায়, যেখানে দেশপ্রেমের ছদ্মবেশে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা জাতীয় ভাগ্যকে অন্ধকারের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করে। এই নিবন্ধের প্রথম খণ্ডে (প্রকাশিত : ১৩ এপ্রিল ২৬) আমরা পলাশীর আম্রকানন থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলাদেশের মীরজাফর, ইস্কান্দার মির্জা এবং জেনারেল মঞ্জুর ও জেনারেল এরশাদের বিশ্বাসঘাতকতার আখ্যান আলোচনা করেছি। আমরা দেখেছি কীভাবে ব্যক্তিগত স্বার্থ আর ভিনদেশি ইন্ধন একটি জাতির গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে গলা টিপে হত্যা করে।

বিজ্ঞাপন

আজ আমরা আলোচনা করব ইতিহাসের সেই দুই ‘ম’-কে নিয়ে, যারা ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি (নির্ধারিত নির্বাচনের মাত্র ১১ দিন আগে গভীর ষড়যন্ত্র ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার অজুহাতে নির্বাচন দুই বছর পিছিয়ে দিয়ে), বাংলাদেশের গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকেছিলেন। তারা হলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ এবং নবম পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। এই দুই জেনারেলের উত্থান, ষড়যন্ত্র এবং বর্তমান পরিণতি শুধু রাজনৈতিক ইতিহাস নয়, বরং এটি ক্ষমতার লোভ ও নৈতিক স্খলনের এক জীবন্ত দলিল।

চতুর্থ ‘ম’—জেনারেল মইন ইউ আহমেদ : নিয়োগের নেপথ্য ও ওয়ান-ইলেভেনের নীলনকশা

বাংলার দীর্ঘ বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাসে চতুর্থ ‘ম’ হিসেবে আবির্ভূত হন জেনারেল মইন ইউ আহমেদ। ২০০৫ সালে পরবর্তী সেনাপ্রধান নির্বাচনের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নাটকীয় প্রক্রিয়াটি কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ আমার হয়েছিল, যখন এনএসআইতে কর্মরত ছিলাম। উল্লেখ্য যে, সেই সময় এনএসআই এবং তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরো (অ্যান্টি-করাপশন ব্যুরো) একই ভবনে আলাদাভাবে তাদের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করত। সেই সুবাদে বিভিন্ন সংস্থার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত পেশাদার বিনিময়ের মাধ্যমে পর্দার অন্তরালের অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য জানার সুযোগ হতো।

তৎকালীন এনএসআই এবং ডিজিএফআই উভয় সংস্থাই পেশাদারিত্বের মাপকাঠিতে সম্ভাব্য সেনাপ্রধান হিসেবে মে. জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার, মে. জেনারেল জামিল ডি আহসান এবং মে. জেনারেল মইন ইউ আহমেদসহ কয়েকজনের ওপর প্রতিবেদন পেশ করেছিল। কিন্তু মইনের সামরিক জীবনের শুরুর ইতিহাস ছিল বেশ বিতর্কিত। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে একজন ফ্লাইট ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন এবং উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য রাশিয়ায় যান। কিন্তু সেখানে ‘শারীরিক অযোগ্যতা’ (Unfitness to fly) প্রদর্শিত হওয়ায় বিমানবাহিনী থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরে তিনি সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন।

সেনাপ্রধান হওয়ার দৌড়ে তৎকালীন সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ ও পেশাদার অফিসার হিসেবে মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবরের নাম ছিল অগ্রগণ্য। তিনি তখন সুদানে জাতিসংঘের ফোর্স কমান্ডার (UNMIS) হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় ছিলেন। তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরোর ডিজি মে. জেনারেল মতিন বিষয়টি আঁচ করতে পেরে দু-দুবার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করেছিলেন—ফজলে এলাহী আকবরকে যেন সুদানে না পাঠিয়ে দেশেই রাখা হয়। জেনারেল মতিনের যুক্তি ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী; তৎকালীন সেনাপ্রধান লে. জেনারেল হাসান মশহুদ চৌধুরীর মেয়াদ শেষে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পরবর্তী সেনাপ্রধান পদের জন্য ফজলে এলাহী আকবরই ছিলেন সবচেয়ে যোগ্য দাবিদার।

কিন্তু রাষ্ট্রের পেশাদারিত্বের সমস্ত সমীকরণ পাল্টে যায় ব্যক্তিগত সম্পর্কের চোরাবালিতে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ছোট ভাই মেজর (অব.) সাঈদ এস্কান্দার ছিলেন মইনের কোর্সমেট। এই নিয়োগের ক্রান্তিলগ্নে একটি চাঞ্চল্যকর গোয়েন্দা তথ্য আমাদের নজরে আসে : সাঈদ এস্কান্দারের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে মইন অত্যন্ত গোপনে ব্যক্তিগত পরিবহনে ফেনী সফর করেন। মূলত সাঈদ এস্কান্দারের ব্যক্তিগত তদবির ও সুপারিশে জ্যেষ্ঠ ও দক্ষ অফিসারদের ডিঙিয়ে (Supersede) মইন ইউ আহমেদকে ২০০৫ সালের ১৬ জুন সেনাপ্রধান করা হয়।

ইতিহাস সাক্ষী, একটি রাষ্ট্র যখন জাতীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে সেনাপতি নিয়োগ দেয়, তখন তার চরম মাশুল পুরো জাতিকে দিতে হয়। ভারতও একইভাবে যুদ্ধের ময়দানে অযোগ্য মে. জেনারেল বিএম কাউলকে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দিয়ে ১৯৬২ সালের যুদ্ধে চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছিল, যা আমি আগে আমার ‘পেশাদার জেনারেল বনাম অনুগত সৈনিক : রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার চড়া মূল্য’ নিবন্ধে আলোচনা করেছি। মইন সেনাপ্রধান হওয়ার পর তার প্রথম অঘোষিত মিশন ছিল সেনাবাহিনী থেকে পেশাদার কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিয়ে নিজের একক বলয় তৈরি করা। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির পটপরিবর্তন ছিল সেই গোপন উচ্চাকাঙ্ক্ষারই চূড়ান্ত রূপ।

মইন পরে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ‘অপারেশনাল ফোর-স্টার জেনারেল’ পদবি গ্রহণ করেন। ক্ষমতার লোভে ২০০৮ সালের জুনে তার স্বাভাবিক অবসরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, তিনি অবৈধভাবে আরো এক বছরের জন্য চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে নেন; যা না ঘটলে হয়তো বাংলাদেশের সমকালীন ইতিহাস ভিন্নভাবে রচিত হতো। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি তার ‘দ্য কোয়ালিশন ইয়ারস’ গ্রন্থেও এই সত্যটি স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, মইন নিজের পদ ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে প্রতিবেশী দেশের সরাসরি দ্বারস্থ হয়েছিলেন এবং বিনিময়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় বসানোর নীলনকশা বাস্তবায়িত করেছিলেন।

আজ বিবর্তিত ইতিহাসে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ করা যায়। মইনেরই মেধাবী কোর্সমেট মে. জেনারেল জহুরুল আলম পরে লে. জেনারেল পদে উন্নীত হন এবং পূর্ণমর্যাদার সঙ্গে চাকরি জীবন শেষ করেন। অন্যদিকে, মইন ইউ আহমেদ আজ দেশ ছেড়ে বিদেশের মাটিতে একাকী ও দুর্বিষহ নির্বাসিত জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত মইন আক্ষেপ করে স্বীকার করেছেন, ব্রিগেডিয়ার আমিনের কুপরামর্শেই তিনি জীবনের অনেক বড় ভুলগুলো করেছিলেন। সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের মতো বিদেশের মাটিতে নিঃসঙ্গ মৃত্যুই যেন আজ তার নিয়তি। তবে ইতিহাসের বিচার বড়ই বিচিত্র, ২০০৬ সালে মইনের চক্রান্তে অকালে বিদায় নিতে বাধ্য হওয়া সেই মে. জেনারেল ফজলে এলাহী আকবরই ৫ আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লবের চূড়ান্ত মুহূর্তে জাতির এক অতন্দ্র সমন্বয়ক হিসেবে আবির্ভূত হন। ৪ আগস্ট গভীর রাতে সেনাপ্রধানের জরুরি ফোন পেয়ে তিনি পরদিন সকালে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সেনাবাহিনীর একটি কার্যকর সেতুবন্ধ তৈরি করেন, যা দেশকে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও চরম অস্থিতিশীলতা থেকে রক্ষা করে। মইন ইউ আহমেদরা আজ ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হলেও ফজলে এলাহী আকবরদের মতো পেশাদার সৈনিকরা বারবার ফিরে আসেন জাতির ক্রান্তিলগ্নে আলোকবর্তিকা হয়ে।

পঞ্চম ‘ম’—লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী : রক্ষীবাহিনী থেকে রিমান্ডের কাঠগড়ায়

বাংলার বিশ্বাসঘাতকতার আধুনিক ইতিহাসে পঞ্চম ‘ম’ হলেন লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। স্বাধীনতার পর ‘রক্ষীবাহিনী’ থেকে আত্তীকৃত হয়েও তিনি অবিশ্বাস্যভাবে লে. জেনারেল পদ পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন, তবে তা পেশাদার যোগ্যতার ভিত্তিতে ছিল না। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার সময় মাসুদ ছিলেন একজন কর্নেল। ওপেন হার্ট সার্জারি হওয়ায় তিনি উচ্চপদের জন্য চিকিৎসাগতভাবে ‘আনফিট’ ছিলেন। কিন্তু সাঈদ এস্কান্দারের আপন ভায়রা ভাই হওয়ার সুবাদে তিনি শুধু দ্রুত পদোন্নতিই পাননি, বরং ডিজিএফআইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ডিরেক্টরেট সিআইবির ডিরেক্টর নিযুক্ত হন।

২০০৪ সালে কুমিল্লার স্কুল অব মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সে (এসএমআই) লেকচার দিতে গিয়ে তৎকালীন জিওসি মাসুদের সম্পর্কে প্রথম নেতিবাচক ধারণা পাই আমার ডিজির কাছ থেকে। সেই কৌতূহল মেটানোর সুযোগ আসে ২০০৬ সালে, যখন আমি নিজে এনডিসি কোর্স করছিলাম। কাকতালীয়ভাবে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন এবং লে. জেনারেল মাসুদও তখন আমাদের সমান্তরালে ‘করেসপন্ডেন্স এনডিসি কোর্স’ সম্পন্ন করছিলেন। সেই সুবাদে তাদের দুজনের সঙ্গেই আমার সরাসরি মেলামেশার সুযোগ হয়।

পেশাদার সেনা কর্মকর্তাদের মতে, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত চতুর; অন্যদিকে জেনারেল মইন ইউ আহমেদ সম্পর্কে সবার ধারণা ছিল একদম বিপরীত। মইনের চারিত্রিক ভীরুতা এবং মাসুদের উচ্চাভিলাষী চতুরতা : এই দুয়ের সংমিশ্রণই ওয়ান-ইলেভেনের ষড়যন্ত্রকে পূর্ণতা দিয়েছিল। স্মৃতির পাতায় সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে ২০০৬ সালের শেষের দিকে, যখন এনডিসি কোর্সের অংশ হিসেবে আমরা রাশিয়ায় শিক্ষাসফরে গিয়েছিলাম। মস্কোর একটি হোটেলের নিভৃত পরিবেশে কোর্সমেট জেনারেল মাসুদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ একান্ত আলাপচারিতার সুযোগ হয়েছিল। একজন স্পাইমাস্টার হিসেবে আমি সূক্ষ্মভাবে তার মনোভাব বোঝার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তখন পর্যন্ত তার কথাবার্তায় আসন্ন কোনো ঝড়ের ইঙ্গিত বা বিশেষ পরিকল্পনার সামান্যতম আভাসও তিনি দেননি। সম্ভবত ওয়ান-ইলেভেনের নীলনকশাটি তখনো পুরোপুরি পরিপক্ব হয়নি, কিংবা ধূর্ত মাসুদ তখন পর্যন্ত তার ভবিষ্যতের ‘মাস্টার কার্ড’টি বুকের গহিনে সযত্নে লুকিয়ে রেখেছিলেন। ইতিহাসের কী নিষ্ঠুর পরিহাস, মস্কোর সেই নিভৃত আলাপের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরই এই জেনারেলের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে ওয়ান-ইলেভেনের সেই নাটকীয় পটপরিবর্তন ঘটেছিল, যা গোটা জাতির ভাগ্যলিপি চিরতরে বদলে দেয়।

মইন-ইউ-আহমেদ-মাসুদ-উদ্দিন-চৌধুরী

সাভারের নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে আস্থার সুযোগ নিয়ে তিনি বিশ্বাসঘাতকতার চূড়ান্ত নীলনকশাটি বাস্তবায়ন করেন। এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে ধূর্ত ভূমিকা পালন করেন তৎকালীন সিটিআইবি প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এটিএম আমিন। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পথ নিষ্কণ্টক করতে ডিজিএফআইয়ের পেশাদার কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার বারিকে সুকৌশলে সরিয়ে দেওয়া হয়। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ১/১১ সরকারের ‘জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র প্রধান হিসেবে যৌথ বাহিনীর বিতর্কিত অভিযানের মূল কারিগর ছিলেন। পুরস্কারস্বরূপ শেখ হাসিনা সরকার তাকে অস্ট্রেলিয়ায় হাইকমিশনার নিয়োগ দেয় এবং পরেও তার চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হয়। তবে ইতিহাস বিশ্বাসঘাতকদের ক্ষমা করে না। ২০২৬ সালের ২৪ মার্চ ‘মানব পাচার’ ও ‘মানি লন্ডারিং’-এর অভিযোগে বারিধারার নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয় ডিবি পুলিশ।

নির্বাচনি ইঞ্জিনিয়ারিং ও ব্যক্তিগত আতঙ্ক : নৈতিক স্খলনের এক অদৃশ্য অধ্যায়

জেনারেল মইন ও মাসুদদের ভূমিকা শুধু রাষ্ট্রক্ষমতার পটপরিবর্তনেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল এক সুপরিকল্পিত নির্বাচনি কৌশলের নীলনকশা। ২০০৬ সালে মস্কোর সেই নিভৃত আলাপচারিতায় আমি কল্পনাও করতে পারিনি যে, ব্যক্তি-স্বার্থ রক্ষায় তারা কতটা কৌশলী হতে পারেন। আজ মনে হয়, তারা তাদের ভবিষ্যতের পরিকল্পনাগুলো অত্যন্ত সযত্নে বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিলেন।

মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, তৎকালীন সময়ে একটি রাজনৈতিক দলের জয়ের সম্ভাবনা থাকলেও মইন-মাসুদ জুটি নিজস্ব সমীকরণে আসন বিন্যাসের এক কৃত্রিম ছক তৈরি করেছিলেন। গোয়েন্দা সংস্থার কাঠামোর অপব্যবহার করে অতিরিক্ত ব্যালট পেপার ছাপানোর যে প্রক্রিয়া তখন চলেছিল, তা ছিল মূলত তাদের ব্যক্তিগত অস্তিত্ব রক্ষার এক মরিয়া চেষ্টা। তারা জানতেন, অসাংবিধানিক পথে ক্ষমতা দখল এবং ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র মতো পদক্ষেপ নেওয়ার পর পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে তাদের কঠোর জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।

এই ষড়যন্ত্রের গভীরতা ছিল আরো ভয়াবহ। ব্রিগেডিয়ার এটিএম আমিন অত্যন্ত গোপনে বেগম জিয়াকে পাশ কাটিয়ে শেখ হাসিনাকে মইন ইউ আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দেন এবং ভারতের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী চুক্তির পথ তৈরি করেন। এই প্রক্রিয়ায় ‘র’ (RAW) এজেন্ট গওহর রিজভীকে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ করে দেওয়া হয়, যা পরে সিভিলিয়ান ডিজিএফআই কর্মকর্তা মশিউর রহমানের মাধ্যমে ফাঁস হয়ে যায়।

মইন ও মাসুদের প্রেরিত দূতেরা যখন খালেদা জিয়ার কাছে ওয়ান-ইলেভেনের কর্মকাণ্ড রেটিফাই করার প্রস্তাব দেন এবং বিনিময়ে ‘সেফ এক্সিট’ চান, তখন এই নেত্রী ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করেন। ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পুষেছি!’ তিনি আপসহীন থাকলেও শেখ হাসিনা তাদের শর্তে রাজি হন। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী পুলিশকে জানিয়েছেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগেই তাদের ভবিষ্যৎ পুনর্বাসনের বিষয়টি শেখ হাসিনার সঙ্গে ফয়সালা হয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশ সেদিন এক কঠিন ফাঁদে পড়েছিল কয়েকজন লোভী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী সেনা কর্মকর্তার হঠকারিতার জন্য।

ভবিষ্যৎ মীরজাফর প্রতিরোধ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার

ভবিষ্যতের মীরজাফররা চাটুকারিতার ছদ্মবেশে ফিরে আসে। স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলো দক্ষদের সাইডলাইন করে নৈতিকভাবে দুর্বল কর্মকর্তাদের বেছে নেয় এবং তাদের ‘ফ্রাংকেনস্টাইনে’ পরিণত করে। মইন, মাসুদ কিংবা ব্রিগেডিয়ার আমিনের মতো চরিত্ররা যখন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ বড় করে দেখে, তখন তারা আর বাহিনীর সম্পদ থাকে না। সংকটের সময় এই ফ্রাংকেনস্টাইনরাই সবার আগে পলায়ন করে।

এই বিপর্যয় রোধে সামরিক বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন বা এসিআরে ‘আনুগত্য’ (Loyalty) কলামটি এমনভাবে সংস্কার করা প্রয়োজন, যাতে এটি কোনো ব্যক্তির সন্তুষ্টির বদলে সংবিধান ও পেশাদারিত্বের প্রতি দায়বদ্ধতাকে নিশ্চিত করে; একই সঙ্গে সেখানে মীরজাফরি বা চাটুকারিতার নেতিবাচক প্রবণতা প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ থাকে। মনে রাখতে হবে, বড় কর্মকর্তাদের অপরাধের চেয়েও ভয়ংকর হলো অধস্তনদের নীরবতা। যখন পেশাদারিত্বের চেয়ে ব্যক্তিগত সুপারিশ বা অবৈধ আনুগত্য প্রাধান্য পায়, তখন সশস্ত্র বাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে।

ইতিহাসের শিক্ষা ও আগামীর বাংলাদেশ

বাংলার ৩০০ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেনাপতিদের ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্রের শীর্ষপদে ভুল নিয়োগ একটি জাতিকে বারবার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের উপহার দিয়েছিল ২০০ বছরের ব্রিটিশ গোলামি। পাকিস্তানের সেই সংকটময় দিনগুলোয় যখন জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিল বাঙালি এবং তিনজন বাঙালি প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করছিলেন, এমনকি প্রেসিডেন্ট পদেও ছিলেন ইস্কান্দার মির্জার মতো একজন বাঙালি; তখন তিনি যদি স্বজাতির স্বার্থ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সম্মান জানাতেন, তবে ইতিহাসের গতিপথ ভিন্ন হতে পারত। ইস্কান্দার মির্জার বিশ্বাসঘাতকতা না থাকলে বাঙালির নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের সেই শক্তিশালী সরকারই হয়তো পশ্চিম পাকিস্তানের ওপর শাসন কায়েম রাখত অথবা পশ্চিম পাকিস্তানই বাঙালিদের শাসন থেকে মুক্তি খুঁজত।

এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিকে তাকালেও আমরা দেখি, প্রধানমন্ত্রী নেহরু তার আত্মীয় হওয়ার সুবাদে অযোগ্য জেনারেল বিএম কাউলকে নিয়োগ করার ফলে ১৯৬২ সালের যুদ্ধে চীন ৩৮,০০০ বর্গকিলোমিটার ভূমি দখল করে নেয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই ধারা আরো নির্মমভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। জেনারেল মঞ্জুর ও জেনারেল এরশাদের ষড়যন্ত্র আমাদের হারিয়েছে একজন নির্ভীক ও দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানকে। একইভাবে জেনারেল মইন ও মাসুদের ওয়ান-ইলেভেন অধ্যায় গণতন্ত্রকে হত্যা করে সার্বভৌমত্বকে ভিনদেশি প্রেসক্রিপশনের কাছে বন্ধক রেখেছে।

এই দীর্ঘ ট্র্যাজেডি আমাদের একটি রূঢ় সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায় : ‘আনুগত্য’ বা ‘আত্মীয়তার’ দোহাই দিয়ে অযোগ্য ব্যক্তিদের সশস্ত্র বাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার মাশুল পুরো জাতিকে যুগ যুগ ধরে দিতে হয়। তাই সার্ভিস চিফ এবং গোয়েন্দা প্রধানদের নিয়োগ কোনো ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে নয়, বরং একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ বোর্ডের মাধ্যমে পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে হওয়া জরুরি।

ওপরে আলোচিত এই বিশ্লেষণগুলো একান্তই আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ এবং দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতালব্ধ উপলব্ধি। আমি বিশ্বাস করি, এ তথ্যগুলো সঠিক, তবে ইতিহাসের প্রবাহে তা শতভাগ নির্ভুল নাও হতে পারে : সেই দায়ভারও আমার। মীরজাফরদের বিনাশ হোক, প্রাতিষ্ঠানিক পেশাদারিত্ব ও দেশপ্রেমের শক্তিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ।

লেখক : সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান ও উপ-উপাচার্য বিইউপি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন