প্লাস্টিকদূষণের কবলে বাংলাদেশ

ড. শাহরিয়ার হোসেন

প্লাস্টিকদূষণের কবলে বাংলাদেশ

বাংলাদেশে বিপজ্জনক রূপ নিয়েছে প্লাস্টিক দূষণ। প্রতি বছর প্রায় ৩ দশমিক ৯ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য দেশের জলাশয়, বনভূমি ও কৃষিজমি দূষিত করছে। বাংলাদেশে উৎপাদিত প্লাস্টিক বর্জ্যের মাত্র ১৯ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়; বাকি ৮১ শতাংশ শেষ পর্যন্ত ল্যান্ডফিল, নদী বা খালে জমা হয়ে পরিবেশকে বিপর্যস্ত করে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের সহজলভ্যতা ও ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে এই সংকট আরো তীব্র হয়েছে। এসব প্লাস্টিক দীর্ঘ সময় ধরে অবিকৃত থেকে মাটি ও পানিতে বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য ছড়ায়।

ঢাকা ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যতম দূষিত শহর হিসেবে পরিচিত। পোড়ানো প্লাস্টিক থেকে নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া বাতাসকে আরো বিপজ্জনক করে তুলছে, যা শিশু ও বয়স্কসহ শ্বাসকষ্টজনিত রোগীদের জন্য হুমকি। শুধু দৃশ্যমান দূষণই নয়, অদৃশ্য মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন খাদ্যশৃঙ্খলেও প্রবেশ করেছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন—এগুলো হরমোনজনিত সমস্যা থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি অনেক জটিল রোগের কারণ হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, আজ প্লাস্টিক দূষণের এক প্রতীক হয়ে উঠেছে। দূষিত সৈকত ও সমুদ্রতল সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে। এই সংকটের আরেকটি দিক হলো দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি। অনেকে জীবিকার তাগিদে প্লাস্টিক পুড়িয়ে পুনর্ব্যবহারের উপযোগী উপাদান সংগ্রহ করেন, যা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ফলে এটি শুধু পরিবেশ নয়, একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকটেও রূপ নিয়েছে।

আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের পরিবেশের অবনতি প্রত্যক্ষ করছি। তাই সরকার, নাগরিক সমাজ, এনজিও ও বেসরকারি খাত—সবার সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। বর্জ্য পৃথকীকরণ, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধকরণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পুনর্ব্যবহারকে উৎসাহিত করা—এসব পদক্ষেপ জরুরি।

প্লাস্টিক দূষণ আজ আমাদের পরিবেশে এক অনিবার্য অনুপ্রবেশকারী শক্তি। প্রতি বছর প্রায় ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক উৎপাদনের পর তার প্রায় ৮০ শতাংশ সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায় না। এর ফলাফল দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর।

নদীদূষণের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে যায়। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মতো নদীগুলো প্লাস্টিক বর্জ্যে ভরে উঠছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব নদীর মাছের মধ্যে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।

সমুদ্র ও উপকূলীয় পরিবেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রায় ১০০ প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণী প্লাস্টিক দূষণের কারণে বিপন্ন। সামুদ্রিক কচ্ছপ প্রায়ই প্লাস্টিক ব্যাগকে খাদ্য ভেবে খেয়ে ফেলে, যা তাদের মৃত্যুর কারণ হয়। ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ভেসে আসা একটি তিমির পেটে ১৬ কেজি প্লাস্টিক পাওয়া যায়, যা বৈশ্বিক দূষণের এক মর্মান্তিক চিত্র।

প্লাস্টিক মাটির গুণগত মানও নষ্ট করছে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক মাটিতে মিশে বিষাক্ত পদার্থ ছড়ায়, ফলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। কৃষিনির্ভর দেশের জন্য এটি বড় হুমকি। গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের মাটির প্রায় ৩০ শতাংশ নমুনায় উচ্চমাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। সমুদ্র ও পরিবেশে প্লাস্টিকের প্রবাহ অব্যাহত থাকায় জীববৈচিত্র্য দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। বাস্তুতন্ত্রের এই পরিবর্তন মানুষের জন্য পরিষ্কার পানি, বায়ু ও জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের মতো মৌলিক সুবিধাগুলো হুমকির মুখে ফেলছে।

এটি কেবল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট নয়, এটি এক বিশাল পরিবেশগত বিপর্যয়। প্লাস্টিক দূষণ আমাদের অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাই এখনই সময় এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার। বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ শহরে পানির উৎস প্লাস্টিক দূষণে আক্রান্ত। দূষণের কারণে স্বাস্থ্যব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। শহুরে হাসপাতালে অন্ত্রজনিত রোগের হার গত পাঁচ বছরে প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। দূষণজনিত রোগে দেশের জিডিপির প্রায় তিন শতাংশ ব্যয় হচ্ছে, যা দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আরো দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে, প্লাস্টিক উৎপাদন কমানো এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। রুয়ান্ডার মতো দেশে প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি ইতিবাচক ফল দিয়েছে। বাংলাদেশও এ ধরনের উদ্যোগ নিতে পারে।

পাট, বাঁশসহ প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি বিকল্প পণ্য কেবল প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর একটি উপায় নয়, এটি একটি নতুন অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত পাট, বাঁশ, পাটখড়ি বা শণভিত্তিক পণ্যগুলোকে যদি আধুনিক নকশা, প্রযুক্তি ও বাজারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তবে এগুলো প্লাস্টিকের কার্যকর বিকল্পে পরিণত হতে পারে। এশিয়ার কোনো কোনো দেশে কলাগাছের আঁশ থেকে উৎকৃষ্ট মানের সুতা, কাপড়সহ বিভিন্ন ধরনের পরিবেশসম্মত পণ্য প্রস্তুত করেছে। বাংলাদেশেও এর অমিত সম্ভাবনা রয়েছে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে গ্রামীণ কারিগর, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও নারীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তাই এটি কেবল ‘বিকল্প পণ্য’ নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক সবুজ অর্থনীতির ভিত্তি।

তবে কেবল বিকল্প পণ্যই যথেষ্ট নয়; আমাদের লক্ষ্য হতে হবে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘জিরো-ওয়েস্ট’ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এর অর্থ হলো—বর্জ্য সৃষ্টি কমানো, উৎসেই বর্জ্য পৃথক্‌করণ নিশ্চিত করা, পুনর্ব্যবহার ও পুনর্ব্যবহারকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে ল্যান্ডফিলে পাঠানোর মতো বর্জ্য প্রায় শূন্যে নেমে আসে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য শহর ও গ্রাম উভয় পর্যায়েই দরজাভিত্তিক বর্জ্য সংগ্রহ, কমিউনিটি কমপোস্টিং, বর্জ্য থেকে সম্পদ (waste-to-resource) উদ্যোগ এবং অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রাহকদের (waste pickers) মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।

উন্নত পুনর্ব্যবহার অবকাঠামো গড়ে তোলা এই রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বর্তমানে বাংলাদেশে যে সীমিত পুনর্ব্যবহার কার্যক্রম রয়েছে, তা মূলত অনানুষ্ঠানিক খাতে নির্ভরশীল। এটিকে আধুনিক প্রযুক্তি, নীতিগত সহায়তা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে শক্তিশালী করতে হবে। উৎসে বর্জ্য পৃথক্‌করণ—জৈব, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও অবশিষ্ট—এই তিন ভাগে ভাগ করা বাধ্যতামূলক করতে পারলে পুনর্ব্যবহার ও কমপোস্টিং উভয়ই কার্যকর হবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।

সুইডেনের মতো দেশে ৯৯ শতাংশ বর্জ্য পুনর্ব্যবহার বা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, কারণ তারা বর্জ্যকে সমস্যা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখেছে। বাংলাদেশও যদি একই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে—যেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি অর্থনৈতিক খাতে রূপ নেয়, তা শুধু পরিবেশ রক্ষায়ই ভূমিকা রাখবে না, বরং নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান এবং উদ্ভাবনের ক্ষেত্রও তৈরি করবে।

সচেতনতা এখানে একটি নির্ধারক ভূমিকা পালন করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ধর্মীয় ও সামাজিক প্ল্যাটফর্ম—সব জায়গায় বর্জ্য হ্রাস ও দায়িত্বশীল ভোগব্যবস্থার বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা দেখায়, নাগরিকদের আচরণগত পরিবর্তন আনতে পারলে প্লাস্টিক ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বাংলাদেশেও এই পরিবর্তন আনতে হলে সচেতনতা প্রচারকে এককালীন কর্মসূচি নয়, বরং একটি ধারাবাহিক সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে।

একই সঙ্গে সরকার, শিল্প খাত ও জনগণের মধ্যে একটি কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তোলা জরুরি। উৎপাদকদের জন্য ‘এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপনসিবিলিটি’ (EPR) নীতি চালু করে তাদের পণ্যের জীবনচক্রের পুরো দায়িত্ব নিতে বাধ্য করতে হবে। নেদারল্যান্ডসের সার্কুলার অর্থনীতির মডেল দেখায়, কীভাবে উৎপাদন, ব্যবহার ও পুনর্ব্যবহারের একটি বন্ধ চক্র তৈরি করে বর্জ্যকে প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা যায়। বাংলাদেশেও এই মডেল অনুসরণ করে একটি টেকসই রোডম্যাপ তৈরি করা সম্ভব।

২০০২ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার বাংলাদেশে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করার একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়। এটি ছিল বিশ্বের প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলার প্রথম বড় উদ্যোগ। এই পদক্ষেপটি দেখিয়েছে, যখন সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকে, তখন বড় পরিবেশগত সমস্যার বিরুদ্ধেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।

সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বিশ্বাস করি, বর্তমান প্লাস্টিক দূষণ সংকট মোকাবিলায়ও শক্তিশালী ও দৃঢ় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি অত্যন্ত জরুরি। এটি নীতি বাস্তবায়নকে দ্রুততর করতে পারে, বিকল্প ব্যবস্থার প্রসার ঘটাতে পারে এবং সামগ্রিকভাবে দেশের পরিবেশ সুরক্ষায় বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।

সবশেষে, আমাদের উপলব্ধি করতে হবে—এই সংকট কেবল পরিবেশের নয়, আমাদের অস্তিত্বের। ‘জিরো-ওয়েস্ট’ কোনো বিলাসিতা নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অপরিহার্য অঙ্গীকার। প্রতিটি প্লাস্টিক ব্যাগ এড়িয়ে চলা, প্রতিটি বর্জ্য সঠিকভাবে পৃথক করা, প্রতিটি বিকল্প পণ্যের ব্যবহার—এসব ছোট ছোট পদক্ষেপই একসঙ্গে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

এখন আর সময় নেওয়ার সুযোগ নেই। সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি বর্জ্যের নিচে চাপা পড়া একটি সমাজ হব, নাকি বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাব? সঠিক নীতি, সচেতনতা ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু এই সংকট মোকাবিলা করতে পারবে না, বরং বিশ্বকে দেখাতে পারবে—কীভাবে একটি দেশ ‘জিরো-ওয়েস্ট’ ভবিষ্যতের পথে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে পারে।

লেখক : পরিবেশবিজ্ঞানী ও সিনিয়র সাংবাদিক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন