যুদ্ধবাজ আমেরিকা (২)

কেন এত যুদ্ধব্যয়

আমীর খসরু

কেন এত যুদ্ধব্যয়
আমীর খসরু

এ কথাটা খুব জরুরি যে, যুদ্ধ অথবা সশস্ত্র সংঘাত কেন ঘটে এবং কেনইবা বৃহৎ শক্তি অথবা যুদ্ধবাজ জাতি তাতে যুক্ত থাকে, সে বিষয়গুলো লুকিয়ে রাখা হয়। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের জনইতিহাসবিদ হাওয়ার্ড জিন বলছেন, একটা দেশ বা জাতির ইতিহাস মানে ব্যক্তিবিশেষ বা বিশেষ সম্প্রদায়ের ইতিহাস নয়। দ্বন্দ্ব আর যুদ্ধের এই দুনিয়ায়, শুধু বিজয়ীদের চোখে, তথাকথিত উন্নত বা সম্ভ্রান্তদের চোখে ইতিহাসকে দেখা উচিত নয়। তাহলে অনেক অবিশ্বাস্য বিষয় সামনে আসবে। (বিস্তারিত আলোচনার জন্য হাওয়ার্ড জিন; এ পিপলস হিস্ট্রি অব দি ইউনাইটেড স্টেটস, পৃ. ৩৬)

হাওয়ার্ড জিন বলেন, পশ্চিমা সভ্যতা, নিউক্লিয়ার অস্ত্র বানানো, ভিয়েতনাম, হাঙ্গেরিসহ অনেক বিষয় অতীতে আমরা সামনে আসতে দিইনি, আড়াল করে রেখেছি, আসল বিষয় দেখতে চাইনি। এজন্যই ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারিনি। আগ্রাসন, যুদ্ধ ও গণহত্যার নাম দেওয়া হয়েছে প্রগতি। (পৃ. ৩৫)

বিজ্ঞাপন

এক্ষেত্রে হেনরি কিসিঞ্জার তার প্রথম বই ‘A World Restored’-এ লিখেছেন, ইতিহাস হলো একটা পুরো দেশের স্মৃতি, কোনো ব্যক্তিবিশেষের স্মৃতি নয়।

এ কারণে ইতিহাসবিদরা ইতিহাসকে দেখেছেন এক ভিন্ন দৃষ্টিতে। এখানে যুদ্ধ আছে, সংঘাত আছে এবং সশস্ত্র পরিস্থিতি আছে। হেনরি কিসিঞ্জার বলেন, একটা দেশের ইতিহাস মানে সেই দেশের সবার ইতিহাস; সব সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাস; আক্রমণকারী আর আক্রান্তদের ইতিহাস। দ্বন্দ্ব আর যুদ্ধের এই দুনিয়ায় শুধু বিজয়ীদের চোখে, তথাকথিত উন্নত বা সম্ভ্রান্তদের চোখে ইতিহাসকে দেখা উচিত নয়; পরাজিতদের ও আক্রান্তদের চোখেও দেখতে হবে। তাহলে অনেক অবিশ্বাস্য বিষয় সামনে চলে আসবে।

তাহলে যুদ্ধ কী?

যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাতের সঙ্গে ঔপনিবেশিকতার সংশ্লিষ্টতা ছিল এককালে। ধীরে ধীরে ঔপনিবেশিকতার ধরন পাল্টেছে; হয়েছে নয়া ঔপনিবেশিকতা এবং সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার নতুন পতন। যুদ্ধ হচ্ছে রাজনীতির এক ভিন্নরূপ।

মাও সেতুংয়ের যুদ্ধ সম্পর্কে বিশ্লেষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, ‘যুদ্ধ হচ্ছে রাজনীতির ধারাবাহিক রূপ। এই অর্থে যুদ্ধই হচ্ছে রাজনীতি এবং যুদ্ধ নিজেই রাজনৈতিক প্রকৃতির কার্যকলাপ। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে এমন একটি যুদ্ধও ঘটেনি, যার রাজনৈতিক প্রকৃতি ছিল না। যুদ্ধ হচ্ছে অন্য উপায়ে রাজনীতির ধারাবাহিক রূপ। রাজনীতি হচ্ছে রক্তপাতহীন যুদ্ধ আর যুদ্ধ হচ্ছে রক্তপাতময় রাজনীতি।’ (বিস্তারিত আলোচনার জন্য: মাও সেতুং রেড বুক, পৃ. ৬৫-৬৬)

যুদ্ধ কেন আর্থিক বিপর্যয়ের কারণ

যুদ্ধ এমন এক রক্তপাত এবং আর্থিক বিপর্যয়কর কর্মকাণ্ড, যা ব্যয়বহুল তো বটেই, মানবজাতির জন্য অকল্যাণকর। তার পরও যুদ্ধ চলমান রয়েছে যুদ্ধরাজনীতির প্রবক্তাদের কারণে।

এর পেছনে রাজনৈতিক অর্থনীতি আছে, আছে যুদ্ধের অর্থনীতি। এই অর্থনীতি নিয়ন্ত্রিত হয় যুদ্ধবাজ শিল্প এবং যুদ্ধবাজ অর্থনীতির কারণে। কয়েকটি উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে, কেন যুদ্ধ না চাইলেও যুদ্ধ আপনাকে ছাড়বে না।

যুক্তরাষ্ট্রের কথাই যদি ধরা যায়, তাহলে বোঝা যাবে কেন যুদ্ধবাজ অর্থনীতি সচল রাখা হয় এবং কেনইবা যুদ্ধশিল্প সব সময়ই সচল রাখতে ও থাকতে বাধ্য করা হয়।

উদাহরণ হিসেবে ১৯৫৪ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে দীর্ঘ সময়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধে ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও অফিশিয়াল ব্যয় ছিল কমপক্ষে ১৫০ থেকে ১৭৬ বিলিয়ন ডলার। বিশ্লেষকরা হিসাবও করে দেখিয়েছেন, ভিয়েতনাম যুদ্ধের ওয়ার ভেটেরান বা সাবেক সৈনিকদের ভাতা, যুদ্ধব্যয়ের সুদ এবং অন্যান্য খরচ বাবদ ভিয়েতনাম যুদ্ধের ব্যয় ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত ৭৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ১৯৬৮ ও ১৯৬৯ সালে ব্যয় কম করে হলেও ৫১ বিলিয়ন ডলার। ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশ নেওয়া যোদ্ধারা, যাদের War Veteran বলা হয়, তাদের ভাতা এখনো দিতে হয়।

আফগান যুদ্ধ : প্রথম দফা

১৯৭৯ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের যুদ্ধে, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন সাইক্লোন’, এতে মার্কিন যুদ্ধবাজ, এর গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং পাকিস্তান অংশ নেয়। আফগান যুদ্ধে সৌদি আরব প্রত্যক্ষ অর্থ সাহায্য দিয়েছিল। আর সৌদি আরব সাত থেকে আট বিলিয়ন ডলার যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থ দিয়ে যুদ্ধে সাহায্য করে। অর্থাৎ প্রথম দফায় আফগান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, পাকিস্তান, সিআইএসহ সব মিলিয়ে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার অর্থ ব্যয় হয়। এই অঙ্ক পুরোটা নয়, আংশিক।

এ তো গেল প্রথম দফার আফগান যুদ্ধের ব্যয়। ২০০১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তালেবানদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ করেছে, তাতে ওয়াশিংটনের ব্যয় হয়েছে ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সরাসরি সামরিক ব্যয়, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পেছনে কথিত যুক্তরাষ্ট্রের পুনর্গঠন, প্রবীণ সেনা বা ভেটেরানস বাবদ খরচ হয়েছে প্রায় ৯৫৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি হিসেবেই খরচ হয়েছে কমপক্ষে তিন ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি।

ইরাক যুদ্ধের ব্যয়

ইরাকে উইপনস অব ম্যাস ডেসট্রাকশনের নামে যুক্তরাষ্ট্রের এবং তার সহযোগীদের বিশাল এক অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয় বলে মার্কিন বিশেষজ্ঞরা বলছেন। অথচ এই যুদ্ধের আদৌ দরকার ছিল কি না, সে প্রশ্নে মতভিন্নতা রয়েছে ওই বিশেষজ্ঞদের মাঝেই। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিটজ ও অর্থনীতির অধ্যাপিকা লিন্ডা বিলমস ‘দ্য থ্রি ট্রিলিয়ন ডলার ওয়ার: দ্য ট্রু কস্ট অব ইরাক ওয়ার’ বইয়ে প্রাথমিক হিসেবে দেখিয়েছেন, ইরাক যুদ্ধে প্রাথমিক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে কমপক্ষে তিন ট্রিলিয়ন ডলার। এই হিসাব খুবই কম বা প্রান্তিক সীমার অথবা রক্ষণশীলভাবে ধরা হয়েছে।

তবে ‘দ্য কস্টস অব দ্য ইরাক ওয়ার’ প্রকল্পের মাধ্যমে যে হিসাব করা হয়েছে, তা কমপক্ষে আট ট্রিলিয়ন ডলার বলে ধারণা করা হচ্ছে। দিনে দিনে এই ব্যয় ১০ থেকে ১২ ট্রিলিয়নেও দাঁড়াতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে মনে করা হয়।

এভাবে লিবিয়াসহ দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির হত্যাকাণ্ড, তথাকথিত আরব বসন্তের নামে রেজিম চেঞ্জের নামে যেসব কর্মকাণ্ড করা হয়, তাতে বিলিয়ন থেকে ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়েছে। এই যুদ্ধবাজ দেশের ব্যয় নিয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা করার ইচ্ছা রইল।

যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধব্যয়

আগেই বলা হয়েছে, ২৫০ বছরের আমেরিকার ইতিহাসে মাত্র ১৬ বছরের সময়কালে এই দেশটি যুদ্ধ ছাড়া চুপচাপ ছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে (১৯১৭-১৯১৮) যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধব্যয় হয়েছিল তৎকালীন সময়ে ৩২ বিলিয়ন ডলার। আর এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের মোট দেশজ উৎপাদনের বা জিডিপির অর্ধেকের বেশি।

তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তুলনায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধব্যয় ছিল অনেক অনেক গুণ বেশি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-৪৫) যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়ের পরিমাণ ছিল কমপক্ষে ৩৪০ থেকে ৩৫০ বিলিয়ন ডলার। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই ব্যয় শেষ পর্যন্ত চার ট্রিলিয়নে পৌঁছায়। এই ব্যয় বৃদ্ধি ঘটতে থাকে ক্রমাগত যুদ্ধে জড়িত হয়ে পড়ায়। নতুন নতুন অস্ত্র নির্মাণ ও এর পেছনে ব্যয়, ক্রমবর্ধমান সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থায়ী ও দীর্ঘ মেয়াদে সেনা মোতায়েন এবং সেনাঘাঁটি বা স্থাপনা নির্মাণ—এসব কারণেও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এক চেহারা বা বাহ্যিক ভাবমূর্তি দেখা দেয়। আর তা হচ্ছে স্থায়ী যুদ্ধ অর্থনীতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেসরকারি যুদ্ধবাজ প্রতিরক্ষা শিল্প, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রির কলাকৌশল এবং সরকারি-বেসরকারি পার্টনারশিপ বা অংশীদারত্বমূলক প্রতিরক্ষা শিল্প।

আর যুদ্ধ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ওপরই গড়ে উঠেছে বিশ্বব্যবস্থা। এটা কি বিশ্বব্যবস্থা না বিশ্ব-অব্যবস্থা—সেটাই বড় প্রশ্ন।

লেখক : গবেষক এবং প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন