তাওহিদের সৌন্দর্য ও মানুষের মুক্তি

মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন

তাওহিদের সৌন্দর্য ও মানুষের মুক্তি

ইসলামের মূল ভিত্তি হলো তাওহিদ-অর্থাৎ এক আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস স্থাপন। তাওহিদ শুধু একটি ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন, যা মানুষের চিন্তা, চেতনা, আচরণ এবং সমাজব্যবস্থাকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। তাওহিদের সৌন্দর্য এমন এক আলো, যা মানুষের অন্তরকে আলোকিত করে এবং তাকে সব ধরনের দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ দেয়।

তাওহিদের মূল বক্তব্য হলো সৃষ্টিকর্তা এক, তিনি অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো শরিক নেই। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘বলুন, তিনি আল্লাহ, এক; আল্লাহ অমুখাপেক্ষী; তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি; আর তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।’ (সুরা আল-ইখলাস : ১-৪) এই সংক্ষিপ্ত সুরাটি তাওহিদের সারমর্মকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরে। এখানে আল্লাহর একত্ব, তাঁর পরিপূর্ণতা এবং সৃষ্টির থেকে তাঁর সম্পূর্ণ ভিন্নতা স্পষ্ট করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তাওহিদের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো, এটি মানুষের অন্তরকে শান্তি দেয়। যখন একজন মানুষ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, তার জীবনের সবকিছু একমাত্র আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে, তখন সে দুশ্চিন্তা, ভয় ও হতাশা থেকে মুক্ত থাকে। সে জানে, যা কিছু ঘটে, তা আল্লাহর ইচ্ছায় ঘটে এবং এতে তার জন্য কোনো না কোনো কল্যাণ রয়েছে। এই বিশ্বাস মানুষকে মানসিক প্রশান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রদান করে।

তাওহিদ মানুষের মুক্তিরও প্রধান মাধ্যম। ইতিহাসে দেখা যায়, মানুষ নানা রকম কুসংস্কার, মূর্তিপূজা এবং মানুষের বানানো মতবাদের কাছে নিজেদের সমর্পণ করেছে। ফলে তারা প্রকৃত স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু তাওহিদ মানুষকে শেখায় কাউকে নয়, শুধু আল্লাহকেই ইবাদত করতে হবে এবং তাঁর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে। এর ফলে মানুষ অন্যের গোলামি থেকে মুক্ত হয়ে প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পায়। সে আর কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা শক্তির কাছে নিজেকে নত করে না।

তাওহিদ মানুষের আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি করে। একজন তাওহিদে বিশ্বাসী ব্যক্তি জানে যে, সে আল্লাহর বান্দা এটি তার জন্য গৌরবের বিষয়। তাই সে অন্যায়, অবিচার বা অন্য কারো আধিপত্য মেনে নেয় না। সে সত্য ও ন্যায়ের পথে দৃঢ় থাকে, কারণ তার ভরসা একমাত্র আল্লাহ। এই বিশ্বাস একজন মানুষকে সাহসী, ন্যায়পরায়ণ এবং আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।

এছাড়া তাওহিদ সমাজে সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। যখন সবাই বিশ্বাস করে যে, তাদের সৃষ্টিকর্তা এক এবং তারা সবাই তাঁর বান্দা, তখন জাতি, বর্ণ, ধনী-গরিবের ভেদাভেদ কমে আসে। ইসলাম এই তাওহিদের ভিত্তিতেই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন করতে চায়, যেখানে সবাই সমান মর্যাদা পায় এবং একে অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকে। হাদিসে মহানবী (সা.) তাওহিদের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন, ‘যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (বুখারি : ১২৮) এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, তাওহিদ শুধু দুনিয়ার শান্তিই নয়, আখিরাতের মুক্তিরও চাবিকাঠি।

তাওহিদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি মানুষকে জবাবদিহির অনুভূতি দেয়। যখন কেউ বিশ্বাস করে যে, এক আল্লাহ সবকিছু দেখছেন এবং একদিন তাঁর সামনে হিসাব দিতে হবে, তখন সে নিজের কাজের ব্যাপারে সচেতন হয়। ফলে সে অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকে এবং সৎপথে চলার চেষ্টা করে।

তাওহিদ ইসলামের প্রাণ, যা মানুষের জীবনে সৌন্দর্য, শান্তি ও মুক্তির বার্তা নিয়ে আসে। এটি মানুষকে সব ধরনের শিরক, কুসংস্কার ও দাসত্ব থেকে মুক্ত করে এবং তাকে আল্লাহর নৈকট্যের দিকে নিয়ে যায়। তাই আমাদের উচিত তাওহিদের সঠিক জ্ঞান অর্জন করা, তা হৃদয়ে ধারণ করা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়ন করা। তাহলেই আমরা দুনিয়া ও আখিরাতে প্রকৃত সফলতা অর্জন করতে পারব।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...