ভারতের সংসদে নারী সংরক্ষণ ও লোকসভায় আসন বৃদ্ধিসংক্রান্ত ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল লোকসভায় ভোটাভুটিতে পাস করাতে পারল না প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার। যদিও তারা প্রবল উৎসাহে নারী আসন সংরক্ষণের বিল এনেছিল। গতকাল শুক্রবার বিকেলে বিল নিয়ে ভোটাভুটি হয়। বিলের পক্ষে ভোট পড়ে ২৯৮টি আর বিপক্ষে ২৩০টি। মোট ৫২৮ জন সংসদ সদস্য ভোটাভুটিতে অংশ নেন। সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিল পাসের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ব্যর্থ হয়েছে মোদি সরকার।
বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া সংসদের বিশেষ অধিবেশনে তিনটি বিল পাস করাতে চেয়েছিল কেন্দ্র সরকার। কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রীর পেশ করা তিনটি বিলের প্রথমটি—লোকসভা এবং বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভায় নারীদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল, দ্বিতীয়টি—লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস (ডিলিমিটেশন) সংক্রান্ত বিল। তৃতীয়টি—কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল আইন সংশোধনী বিল । প্রথম বিলটি পাস না হওয়ায় পরের দুটি নিয়ে ভোটাভুটির পথে হাঁটেনি কেন্দ্র সরকার।
বিরোধী ইন্ডিয়া জোট শুরু থেকেই বিজেপির এই বিলের বিরোধিতা করে আসছে। দুই দিনের বিতর্কে বিরোধীরা বারবার সরকারকে বলেছে, তারা নারীদের ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের পক্ষে, যার কারণে ২০২৩ সালে নারী সংরক্ষণ বিল পাস হয়েছিল। তবে এবার বিরোধিতা করার কারণ ভিন্ন। কেননা, কেন্দ্র সরকার নারী সংরক্ষণের নাম করে সংসদের আসন বাড়িয়ে নিজেদের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চায়।
বিরোধী দলগুলোর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, লোকসভায় আসনসংখ্যা বাড়ানো হলেও দক্ষিণের রাজ্যগুলোর প্রতি কোনো অবিচার হবে না—এ ব্যাপারে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নিশ্চয়তা দিচ্ছেন। তিনি বলেন, নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ, এ সুযোগ যেন আমরা হাতছাড়া না করি। আমি আপনাদের কাছে আবেদন করতে এসেছি, এটিকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবেন না, এটি জাতীয় স্বার্থের বিষয়।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও সংসদ সদস্যদের আশ্বস্ত করে বলেন, লোকসভায় বর্তমানে ৫৪৩টি আসন বাড়িয়ে প্রায় ৮১৬টি করা হলে দক্ষিণের রাজ্যগুলোর বর্তমান প্রতিনিধিত্ব বজায় থাকবে বা সামান্য বাড়বে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ দুজনই কংগ্রেসসহ অন্যান্য বিরোধী দলকে ভারতে সংসদীয় আসন পুর্নবিন্যাসকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বিভিন্ন ইস্যু তৈরি করে বিলটির বিরোধিতা করছে এবং নারীদের সংরক্ষণ থেকে বঞ্চিত করছে। বিজেপি নেতাদের মতে, বিলটি আটকে দেওয়ার জন্য এসব দলকে নির্বাচনে চড়া মূল্য দিতে হবে।
বিরোধীদের অভিযোগ, নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণসংক্রান্ত বিল ব্যবহার করে বিজেপি আসলে লোকসভার আসন বাড়াতে সক্রিয় । লোকসভায় দুই দিনের বিতর্কে বিরোধীরা অভিযোগ তুলেছিলেন, জনগণনার আগেই সুবিধামতো আসন পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর প্রভাব কমিয়ে উত্তর ভারতে আসনের অনুপাত বাড়িয়ে নেওয়াই উদ্দেশ্য, যেখানে বিজেপির প্রভাব অনেক বেশি। কেননা, উত্তরের হিন্দি বলয় দখল করলেই ২০২৯ সালেও দিল্লি দখল নিশ্চিত। সে কারণেই সংবিধান সংশোধনী বিলে লোকসভার আসন বৃদ্ধির সঙ্গে নারী সংরক্ষণকে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
তৃণমূলের সংসদ সদস্য কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, শুধু নারী সংরক্ষণ বিল সমর্থনে আমরা রাজি। কিন্তু লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাসসহ এই বিল আমরা সমর্থন করব না। প্রধানমন্ত্রী ভয় পাচ্ছেন, পরেরবার আর জিততে পারবেন না। তাই এ কলকাঠি নাড়ছেন। ডিএমকে সাংসদ কণিমোঝি বিলের বিরোধিতা করে বলেন, বিজেপি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসেছে। আমরা কতবার বলেছি, নারী বিল পাসের কথা। সরকার নীরব ছিল। এখন আচমকা কয়েকটি রাজ্যে ভোটপর্ব চলার মাঝে তড়িঘড়ি এই বিল আনার উদ্দেশ্য ভিন্ন।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’ বিল পাস হয়েছিল লোকসভা ও রাজ্যসভায়। নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের সেই বিলে বলা হয়, জনগণনার পর আসন পুনর্বিন্যাস করা হবে। কিন্তু মোদি সরকার জনগণনা পর্যন্ত অপেক্ষা না করে দুটি পৃথক বিষয়কে একসঙ্গে জুড়ে দেওয়ার যে চেষ্টা করেছিল, তা শুক্রবার ব্যর্থ হয়েছে লোকসভায়।
এমবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

