উত্তরের ছয় জেলা দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রমত্তা তিস্তা এখন পানিশূন্য। নদীতে চলে না পালতোলা নৌকা, ট্রলার। জেলেদের নেই মাছ শিকারের ব্যস্ততা। চিরচেনা যৌবন হারিয়ে ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বছরের পর বছর সেই বিস্তীর্ণ বালুচর এখন আর দেখা যায় না। দু’চোখ যে দিকে যায় নজরে আসে সবুজের সমারোহ। নদী পাড়ের মানুষ হাজার হাজার হেক্টর চরে রবিশস্যসহ নানা ফসল চাষাবাদ করে তাদের ভাগ্য বদলাচ্ছেন। প্রাণহীন তিস্তার বুকে এখন ফলে মিষ্টি কুমড়া, লাউ, বাদাম, ভুট্টা, তিল, তিসি, গম, কাউন, কলাই, সরিষা, রসুন, ধান, পেঁয়াজ, মরিচসহ বিভিন্ন সবজি ও ফসল। মৌসুমে শতকোটি টাকার সবজি বিক্রি করে কিষান-কিষানিরা।
রংপুরের গঙ্গাচড়া এবং লালমনিরহাটের কালিগঞ্জ ও আদিতমারীর তিস্তার চর এলাকার স্থানীয় কৃষকরা জানান, বন্যার সময় এ তিস্তা আমাদের সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। অনেক কষ্টে পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানেই বসবাস করি। ওই সময় সরকারি অনুদান ছাড়া অন্যকিছু পাওয়ার উপায় থাকে না। তবে যারা কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত। যাদের জমি রয়েছে তারা তিস্তা নদীতে ভেসে ওঠা চরে এখন গম ভুট্টা-আলুসহ নানা ধরনের সবজি চাষাবাদ করছে। কৃষি অফিস থেকেও নানা ধরনের প্রণোদনা দিয়ে আমাদের সহযোগিতা করছে। এ কারণে সব ধরনের ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। তবে বর্তমান যে মূল্য পাচ্ছি তাতে আমাদের মুনাফা কম হচ্ছে। তারপরও এই অঞ্চলের কৃষকরা এক সিজনের ফসল দিয়ে পুরো বছর পার করেন।
তারা জানান, তবে ফসল পরিবহনে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। বালুচরে কোনো রকমে ঘোড়ার গাড়িযোগে উৎপাদিত ফসল পরিবহন করতে হয়। তবে উৎপাদিত সবজিগুলো পরিবহনের যদি সরকারের পক্ষে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো সে ক্ষেত্রে আমরা আরো ভালো দামে ফসলগুলো বিক্রি করতে পারতাম।
তারা আরো জানান, চরাঞ্চলের হাজার হাজার হেক্টর বালুমাটি ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন হওয়ায় আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন কৃষকরা। তবে, আমাদের উৎপাদিত পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাঠ থেকে সরাসরি পাঠানোর ব্যবস্থা করা যেত তাহলে আমরা লাভবান হতাম।
ইছলার চরের কৃষক হামিদুল হক ও মুসলিম উদ্দিন জানান, এ বছর আমরা তিস্তার চরে পিঁয়াজ রসুন থেকে শুরু করে ভুট্টা আলু বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করেছি। পাশাপাশি অনেক জমিতে বাদাম চাষ করা হয়েছে। প্রতিটি জমিতে আমাদের যা খরচ করেছি তার তিনগুণ দামে উৎপাদিত ফসলগুলো বিক্রি করা সম্ভব। এই উৎপাদিত ফসলগুলো দিয়েই আমরা পুরো বছর পার করে থাকি।
তারা জানান, বন্যার সময় আমাদের বাড়ি-ঘরেও পানি ওঠে। অনেক সময় অন্যত্র আশ্রয় গিয়ে আমাদের জীবনযাপন করতে হয়। বন্যার সময় অনেক কষ্ট করতে হয় আমাদের। আবার পানি শুকিয়ে গেলে তিস্তার বালুচর ছাড়া চোখে কোনো কিছু পড়ত না। এখন আর তিস্তার বুকে বালুচর নেই যেদিকেই তাকাই সবুজে ঘেরা। তবে কৃষকদের যদি সরকারিভাবে আরো সহায়তা করা হতো তাহলে আমরা এই উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে আরো বেশি লাভবান হতাম।
কাউনিয়া তিস্তা চরের মোসলেম উদ্দিন বলেন, আমার তিন ছেলে-মেয়েকে পড়ালেখা করাই। শুধু তিস্তার চরে এই সময়ে গম ভুট্টা আলু বাদামসহ নানা ফসলের ওপর নির্ভর করে। তবে অসময়ে যদি তিস্তার বুকে ভারত পানি ছেড়ে দেয় তাহলে আবারও আমাদের নিঃস্ব হয়ে থাকতে হয়। অনেক সময় অনেক এনজিও থেকে কিস্তিতে টাকা নিয়ে তা পরিশোধ করতে পারি না। কিন্তু এবার তিস্তার চরে যেভাবে আমরা চাষাবাদ করতে পেরেছি সে ক্ষেত্রে আমাদের এক বছর আর কোনো চিন্তা করতে হবে না।
তিনি আরো জানান, যদি তিস্তার ন্যায্যহিস্যা আদায় করে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয় সেক্ষেত্রে নদী পাড়ের মানুষ স্বাবলম্বী হয়ে উন্নত জীবনযাপন করতে পারবে।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, তিস্তার ছয় জেলার মধ্যে বিশেষ করে নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুরের বেশ কয়েকটি উপজেলার বালুচরগুলোতে শীতকালীন নানা ফসলের পাশাপাশি ইরি-বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়ে থাকে। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এখন দেশের খাদ্য উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের উৎসাহিত করতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা শুরুতে কৃষকদের সহায়তার পাশাপাশি নানা ধরনের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। এই চরে অল্প সময়ে কোনো ফসল উৎপাদন করলে বেশি লাভবান হবে কৃষকরা সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়ে থাকে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

