চাকরিজীবনের শেষে প্রভিডেন্ট ফান্ড (পিএফ) প্রত্যেক কর্মজীবী মানুষের জন্য একটি বড় আশ্রয়। অবসরের পর এই সঞ্চিত অর্থ দিয়ে স্বপ্নপূরণ কিংবা নিরাপদ বিনিয়োগে বাকি জীবন কাটানোর আশা থাকে সবার। কিন্তু বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত চা-শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের বাস্তবতা ভিন্ন। সারা জীবন কঠোর পরিশ্রম করেও তারা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হন। জীবিকার তাগিদে সামান্য আয়ে সংসারের টানাপোড়েন সামলাতে হয় তাদের। এর মধ্যেই নতুন করে যোগ হয়েছে নিজেদের প্রাপ্য পিএফের অর্থ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
নিয়ম অনুযায়ী এই তহবিলে শ্রমিকদের অর্থ নিয়মিত জমা হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সেখানে জমেছে বিশাল অঙ্কের বকেয়া। ফলে যে ফান্ডটি হওয়ার কথা ছিল তাদের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা, সেটিই এখন হয়ে উঠেছে দুশ্চিন্তার আরেকটি কারণ। তাই আজ দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই খাতের শ্রমিকেরা নিজেদের সঞ্চিত অর্থ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের বেতনের একটি অংশ কেটে এই তহবিলে জমা রাখার কথা থাকলেও অভিযোগ উঠেছে, ৫৮টি চা-বাগানের মালিক এই ফান্ডের বিপুল অঙ্কের অর্থ জমা দেননি। ফলে অবসরের পর কিংবা জরুরি প্রয়োজনে নিজেদের সঞ্চিত অর্থ পাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন চা-শ্রমিকেরা।
শ্রমিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হলেও কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি। অনেক শ্রমিক অবসরের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন, কিন্তু সঞ্চিত অর্থ হাতে পাবেন কি না— এই শঙ্কায় দিন কাটছে তাদের।
চা-শ্রমিক ভবিষ্য তহবিল নিয়ন্ত্রকের দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নিয়ম অনুযায়ী চা-শ্রমিকদের বেতনের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কেটে রাখা হয়। এর সঙ্গে বাগান কর্তৃপক্ষ আরও ৭ দশমিক ৫ শতাংশ যোগ করে মোট ১৫ শতাংশ অর্থ তহবিলে জমা দেওয়ার কথা। শ্রমিক ও মালিক পক্ষের এই ১৫ শতাংশ জমার ওপর আরও ১৫ শতাংশ অর্থ প্রশাসনিক ব্যয় হিসেবে বাগান কর্তৃপক্ষকে একত্রে জমা দিতে হয়।
শ্রম অধিদপ্তরের অতিরিক্ত সচিবকে চেয়ারম্যান করে গঠিত একটি ট্রাস্টি বোর্ড এই ভবিষ্য তহবিল পরিচালনা করে। এই বোর্ডে চা-বাগান মালিক পক্ষের তিনজন, চা স্টাফ অ্যাসোসিয়েশন থেকে একজন, চা-শ্রমিক ইউনিয়ন থেকে দুজন প্রতিনিধি এবং চা-শিল্পের বাইরে থেকে দুজন স্বতন্ত্র বিশিষ্ট ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। শ্রমসচিব ভবিষ্য তহবিল নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করেন। নিয়ন্ত্রকের দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বোর্ড শ্রমিকদের পক্ষে অনাদায়ী বকেয়া আদায়ে বাগান মালিকদের সঙ্গে আলোচনা, মামলা বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে।
ভবিষ্য তহবিল নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের ২৮ ফেব্রুয়ারির হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ৫৮টি চা-বাগানের শ্রমিকদের পিএফের অর্থ বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে ইমাম-বাওয়ানী চা-বাগানের ৬৯ মাসের ৮৯ লাখ ৭৩ হাজার ৫১৩ টাকা, লোবাছড়া চা-বাগানের ২৬ মাসের ২১ লাখ ১৩ হাজার ৯৬৩ টাকা, হোসেনাবাদ চা-বাগানের ২৬ মাসের ৩১ লাখ ২৪ হাজার ৬৮০ টাকা, দলই চা-বাগানের ২১ মাসের ১ কোটি ৩০ লাখ ৩৭ হাজার ৯৮১ টাকা, রাজনগর চা-বাগানের ২১ মাসের ২ কোটি ১৯ লাখ ১৬ হাজার ৪৯৩ টাকা এবং মুরইছড়া চা-বাগানের ২২ মাসের ৩৫ লাখ ৩৭ হাজার ৪০৮ টাকা বকেয়া আদায়ে শ্রম আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। এসব মামলার মোট পরিমাণ ৫ কোটি ২৭ লাখ ৪ হাজার ৩৮ টাকা। বাকি ৫২টি চা-বাগানের বকেয়া আদায়ে কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এই ৫২টি বাগানের মোট বকেয়ার পরিমাণ জানাতে পারেনি তহবিল নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়। শ্রমিক ইউনিয়ন ও চা-বাগান স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সূত্রে জানা গেছে, এই বকেয়ার পরিমাণ শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
চা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কিছু বাগানে আর্থিক সংকটের কারণে পিএফের অর্থ সময়মতো জমা হয়নি। আবার কোথাও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও তদারকির অভাবও দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে।
চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি পঙ্কজ কুন্দ বলেন, চা-শ্রমিকদের আয় এমনিতেই কম। তার মধ্যেও সামান্য অর্থ প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমা রাখা হয়; সেটিও যদি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে শ্রমিকদের জীবনে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হবে। এ বিষয়ে আমরা মালিকপক্ষ ও তহবিল নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি।
বকেয়া তালিকায় থাকা সাতগাঁও চা-বাগানের ব্যবস্থাপক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, নানা কারণে দীর্ঘদিন ধরে বাগানে লোকসান হচ্ছে। উৎপাদন খরচের তুলনায় চায়ের দাম কম। তবে শিগগিরই শ্রমিকদের পিএফের বকেয়া জমা দিতে আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভবিষ্য তহবিল নিয়ন্ত্রক মহব্বত হোসাইন বলেন, ৫ ও ৭ জুলাই ট্রাস্টি বোর্ডের ৪৪০তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অনাদায়ি অর্থ আদায়ে তাগিদপত্র পাঠানো এবং বাগানের আর্থিক অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছিল। এর ফলে সর্বশেষ ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনাদায়ী ১০ কোটি টাকা আদায় সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কিছু বাগান লোকসানের মুখে রয়েছে, অন্যদিকে শ্রমিকদের স্বার্থও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। সবকিছু মাথায় রেখে অনাদায়ি অর্থ আদায়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


পুলিশের গুলিতে নিহত হারুনুর রশিদের পরিবারকে নতুন বাড়ি দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী
সিডিএফ বন্ধ, চিকিৎসাবঞ্চিত ৩৬ বাগানের চা-শ্রমিক