পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল—চরকাজল ও চরবিশ্বাস ইউনিয়নের হাজারো প্রসূতি মায়ের কাছে এখন আস্থার নাম ডিপ্লোমা চিকিৎসক ফাতিমা আক্তার রিমা। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা ও চিকিৎসা সংকটের মধ্যেও তিনি দুই বছরে ২৪৩টি নিরাপদ নরমাল ডেলিভারি সম্পন্ন করে স্থানীয় মানুষের কাছে মানবিক সেবার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন নিবেদিতপ্রাণ নারী চিকিৎসক ফাতিমা আক্তার রিমা। অনেকের কাছে মনে হয়, তার হাতেই যেন একধরনের জাদু রয়েছে। দরিদ্র পরিবারের প্রসূতি নারীদের সিজারিয়ান অপারেশনের বাড়তি খরচ ও শারীরিক ধকল থেকে রক্ষা করতে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে ভরসা হয়ে উঠেছেন রিমা আক্তার।
দুই বছর ধরে তিনি দিন-রাতের হিসাব না কষে গ্রামের কাঁচা মেঠোপথ পাড়ি দিয়ে ছুটে যাচ্ছেন প্রসব বেদনায় কাতর নারীদের কাছে। কখনো গভীর রাত, কখনো ঝড়-বৃষ্টি—যখনই আহ্বান, তখনই ছুটে চলা। খবর পেলেই পৌঁছে যান প্রসূতির বাড়িতে। তার সেবায় ইতোমধ্যে অসংখ্য মা নিরাপদে সন্তান জন্ম দিয়েছেন।
গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চরকাজল ও চরবিশ্বাস ইউনিয়নের দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার, যার মধ্যে প্রায় আট কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দিতে হয়। ট্রলার বা লঞ্চে যেতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে এবং বিকেল ৫টার পর নৌযান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ঝড়-বৃষ্টির সময় উত্তাল নদী পার হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। চরাঞ্চলের এসব ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ভালো মানের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অভাব রয়েছে। দু-তিনজন স্বাস্থ্যকর্মী থাকলেও নারী চিকিৎসকের অভাব প্রকট। ফলে জরুরি প্রসবসেবার ক্ষেত্রে দুই ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকেন। অনেক সময় হাসপাতাল পৌঁছানোর আগেই মা ও নবজাতকের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে।
এই বাস্তবতায় গত এক বছরে ডিপ্লোমা চিকিৎসক ফাতিমা আক্তার রিমা যেসব বাড়িতে নরমাল ডেলিভারি করিয়েছেন, সেসব ক্ষেত্রে কোনো মা বা নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। নামমাত্র খরচে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা ফোন পেলেই তিনি ছুটে যান। মানবিক এই সেবাকে তিনি নিজের দায়িত্ব ও পেশা হিসেবে নিয়েছেন।
উপকূলের দুর্গম চরাঞ্চলে অসহায় প্রসূতি মায়েদের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক সেবার যে নজির স্থাপন করেছেন ডা. ফাতিমা আক্তার রিমা, তা স্থানীয় মানুষের কাছে এক অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে। নরমাল ডেলিভারিকে গুরুত্ব দিয়ে তার এই মানবিক উদ্যোগ শুধু স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জন করেনি, বরং প্রত্যন্ত অঞ্চলের গণ্ডি পেরিয়ে তার কাজের গল্প দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন অনেকের কাছেই তিনি হয়ে উঠেছেন নিরাপদ মাতৃত্বের এক নির্ভরতার নাম।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

