বৈশাখী উৎসবে বাংলার নারী

শান্তা মারিয়া

বৈশাখী উৎসবে বাংলার নারী

ছোট্ট শিশু ঘুমে ঢুলে পড়ছে মায়ের কোলে। মা সুর করে বলছেন, ‘আয় আয় চাঁদ মামা, টিপ দিয়ে যা, চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা।’ বাংলার চিরন্তন দৃশ্য এটি। আর মায়ের মুখের এই ছড়াগানও বাংলার লোকসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। এভাবেই বাংলার লোকজ সম্পদ এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে পৌঁছে দেয় নারী।

পহেলা বৈশাখের নববর্ষ উদ্‌যাপনের উৎসব বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের অংশ। নতুন চালের ক্ষীর, মিষ্টি, নাড়ু, মোয়া, পিঠায় ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ। বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নারীর শ্রম ও সৃজনশীলতা।

বিজ্ঞাপন

যেকোনো লোকজ উৎসবে নারীর অংশগ্রহণ সেই উৎসবে সৃষ্টি করে প্রাণপ্রাচুর্য ও আনন্দের আবহ। বাংলার লোকজ খাদ্যসামগ্রী, যেমন মুড়ি, খই, পিঠা, ক্ষীর, আচার, চাটনি ইত্যাদি গ্রামবাংলার নারীরাই মূলত তৈরি করেন।

বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি অতি সমৃদ্ধ। এদেশের ছড়া, রূপকথা, উপকথা, ব্রতকথা, পাঁচালি, গীত, খনার বচন, হাসির গল্প প্রভৃতি লোকজ সাহিত্য। পাশাপাশি যাত্রা, পালাগান, গম্ভীরা, গাজন, জারি, সারি, ভাটিয়ালি ও ভাওয়াইয়া লোকজ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এছাড়া পিঠা, নাড়ু, মিষ্টি, দই, বাতাসা, মুড়ি ও চিড়া ইত্যাদি লোকজ খাদ্য। লোকজ কারুশিল্প ও কুটিরশিল্পও অতি উচ্চ শিল্পমানসম্পন্ন। এই শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে এ দেশের নারীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

বাংলার রূপকথা, ছড়া, উপকথা, ব্রতকথা, খনার বচন ও গীতগুলো টিকে আছে মূলত মা, খালা, নানি, দাদি আর ফুপুদের মুখেই। আবহমানকাল থেকে নারীরাই গৃহপ্রাঙ্গণে এঁকেছেন আলপনা। নারীরাই পালাপার্বণে বিভিন্ন ও বিচিত্র ধরনের পিঠা তৈরি করে প্রিয়জনকে আপ্যায়ন করেছেন। শুধু পিঠা কেন? তিলের নাড়ু, মুড়ির মোয়া, নলেন গুড়ের পায়েস, মুড়িভাজা, চিড়াকোটা, খুদের জাউ, আচার, আমসত্ত্ব, মোরব্বা, পাঁপড় ইত্যাদি খাদ্য পরম উৎসাহে ও মমতায় তৈরি করেন নারীরাই। এসব লোকজ খাদ্যসামগ্রী আজও বাংলার ঘরে ঘরে টিকে আছে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালির রসনাকে তৃপ্ত করছে মূলত নারীদের হাত ধরেই।

পহেলা বৈশাখ বাঙালির জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্ববাহী উৎসব। এই উৎসবে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ সারা দেশের সব মানুষ ধর্ম-জাতি নির্বিশেষে অংশ নিয়ে থাকেন। লোকজ সংস্কৃতির এই প্রধান উৎসবে বাংলার নারী অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। নববর্ষ ঘিরে প্রাচীন ও মধ্যযুগ থেকেই বাংলায় নানারকম লোকাচার প্রচলিত রয়েছে; যেমন নববর্ষের আগের দিন ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা, গরু-বাছুরকে গোসল করানো প্রভৃতি। এসব লোকরীতি মূলত নারীরাই পালন করেন। চৈত্র মাসে মেঘরাজার গান আর ব্যাঙের বিয়ের আয়োজনগুলোও মূলত নারীদের উৎসাহে হয়ে থাকে। এছাড়া চড়ক ও বৈশাখের মেলায় নারীদের অংশগ্রহণ সেই প্রাচীনকাল থেকেই তো চলছে।

শুধু পহেলা বৈশাখে নয়, বাংলার সমাজজীবনে আরো অনেক লোকজ রীতি রয়েছে, যেগুলো লোকসংস্কৃতিরই অন্তর্গত। যেমন গায়েহলুদের অনুষ্ঠান, মেহেদিবাটা ও হলুদবাটার সময় গান গাওয়া, বিয়ে ও পালাপার্বণে মেহেদির নকশা আঁকা প্রভৃতি মূলত নারীরাই উৎসাহ নিয়ে পালন করেন। বিয়েবাড়ির আলপনা আঁকাতেও নারীরাই মূল ভূমিকা পালন করেন। বিয়েতে বরের গেট ধরা, বর-বধূ বরণ, রসুমত বা শুভদৃষ্টির সময়কার আচার-অনুষ্ঠান ও হাসি-তামাশায় নারীর অংশগ্রহণই থাকে প্রধান। সন্তান জন্মের আগে ও পরের আচার-অনুষ্ঠানও নারীরাই পালন করে থাকেন। এত গেল রীতি-রেওয়াজের কথা।

বাংলার লোকশিল্পের কথায় আসি। নকশিকাঁথা আমাদের গৌরব। নকশিকাঁথা শিল্পটি বিকশিতই হয়েছে বাংলার নারীদের হাতে। নারীরাই তাদের নিজস্ব আনন্দ-বেদনার কাব্য সুঁই ও সুতায় লিখে রেখেছেন পরম মমতায়। একসময় নকশিকাঁথা তৈরি হতো শাড়ি থেকেই। এর সেলাইয়ের সুতাও নারীরাই নিজেদের শাড়ির পাড় থেকে সংগ্রহ করতেন। কাঁথার নকশার মাধ্যমে বিভিন্ন লোককাহিনিও তুলে ধরতেন নারীরা।

পাটের শিকা বানানো, মাদুর বোনা, কাপড়ের পুতুল তৈরি, কাপড়ের পাখা বানানো প্রভৃতি শিল্পে নারীদের দক্ষতা সর্বজনবিদিত। তাদের শিল্পরুচির পরিচয় পাওয়া যায় বিছানার চাদর, বালিশের ঢাকনি, টেবিলঢাকনি প্রভৃতি জিনিসে করা নানারকম নকশিকাজে। কাপড়ের হাতপাখায় নানারকম প্রবাদবাক্য ও বচন সুঁই-সুতার নকশাতেও তুলে ধরতেন নারীরা। এ ধরনের কাজ করা পাখা এখনো অনেক বাড়িতে পরিবারের দাদি-নানিদের হাতের কাজের নিদর্শন হিসেবে সংগ্রহে রয়েছে। এছাড়া কড়ির কাজ, মাছের আঁশের কাজ, ঝিনুকের কাজ এবং ধান দিয়ে নানারকম ছবি ফুটিয়ে তোলার মতো শিল্পকর্মগুলোও নারীরাই মূলত করেন।

পহেলা বৈশাখের মেলা, শোভাযাত্রা ও উৎসবে রঙিন শাড়ি পরে অংশ নেন বিপুলসংখ্যক নারী। নববর্ষের দিনটিতে উৎসাহের সঙ্গে বাড়িতে সুখাদ্যও রান্না করেন তারাই। পহেলা বৈশাখের কেনাকাটা, ফ্যাশন, উপহার আদান-প্রদানেও নারী পালন করেন অগ্রণী ভূমিকা।

আজও বাংলাদেশের নারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রাণের এই উৎসবে অংশ নেন। বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে তারা ধারণ করেন প্রাণের গভীরে। তারা এদিন অতিথি আপ্যায়ন করেন বাংলার ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসামগ্রীতে। ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও সাজসজ্জায় উৎসবকে করে তোলেন বর্ণিল।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...