কর্ম এবং শিক্ষার জগৎ ক্রমবর্ধমানভাবে বিশ্বজুড়ে মিলে যাচ্ছে। শিক্ষাকে শুধু জ্ঞান সংগ্রহের মাধ্যম হিসেবে চিন্তা না করে বরং আমাদের সাধারণ শিক্ষা ও কর্মমুখী শিক্ষার সমন্বিত পদ্ধতির দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। একজন গ্র্যাজুয়েটের দেশ ও বিদেশে চাকরি বা উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনা যদি ১৯ শতাংশ হয়, তবে সেটি ৯১ শতাংশ হবে ডিগ্রির সঙ্গে দুটি করে কারিগরি দক্ষতা ও ভাষা জ্ঞান যোগ করতে পারলে। ফলে তারা দেশে কাজ শুরু করতে পারবে আর বিদেশে পাঠাতে পারলে নিজের, পরিবারের এবং সর্বোপরি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
যদি উন্নত দেশের সঙ্গে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি পার্থক্য বলতে হয়, তবে সেটি অবশ্যই আমাদের দেরিতে চাকরির কথা চিন্তা করা। আমরা স্নাতক বা স্নাতকোত্তর না করে চাকরির চিন্তা করি না বা আমরা সেটার সুযোগ তৈরি করতে পারিনি। আর উন্নত দেশে ছেলেমেয়েরা হাইস্কুলে ৮-১২ শ্রেণিতে থাকতেই নিয়মিত কোর্সের সঙ্গে দু-তিনটি বৃত্তিমূলক দক্ষতাসম্পন্ন করে যেমন চিকিৎসা সহকারী, অটোমোবাইল, কার্পেন্টিং, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বিং, নার্সিং বা অন্যকিছু। আমরা যদি দেশে এভাবে চিন্তা করি, তাহলে আমাদের একদিকে যেমন রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের কর্মদক্ষতাও বেতন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি দেশে বিরাট দক্ষ জনশক্তি তৈরি হবে। যে বয়সে কাজ করার সময় সেটি না করে বেশি বয়সে করলে, গড়ে জনপ্রতি ৫-১০ বছরের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়।
আমাদের এখন সাধারণ (জেনারেল—জেন) ও কারিগরি (টেকনিক্যাল—টেক) শিক্ষার সমন্বিত পদ্ধতি ‘জেনটেক’ মডেল গ্রহণ করা উচিত। এই মডেলটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে শিক্ষার প্রভাব বা অবদানকে নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করার জন্য ন্যাশনাল ইনটেলিজেন্স ফর স্কিলস, এডুকেশন, এমপ্লয়মেন্ট, অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ (নাইস-৩) সিস্টেমের সঙ্গে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রবাসী মন্ত্রণালয় এবং বিদেশে আমাদের দূতাবাসগুলোকে সংযুক্ত করবে এবং নিয়মিত বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশ করবে।
জেনটেক মডেলের শুরুটা হতে হবে হাইস্কুল থেকে। মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে দুটি ভাষা ও কারিগরি কাজে একটি দক্ষতা অর্জন করতে হবে। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে আরো একটি দক্ষতা অর্জন করতে হবে। দক্ষতা শুধু লোহালক্কড় নিয়ে কাজ—এটা ঠিক নয়, ডিজিটাল ফিল্ডেও হতে পারে। তবে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ভাষা এবং কাজে দক্ষতা বেসিক ও মধ্যম লেভেলের হতে পারে, স্নাতকপর্যায়ে অ্যাডভ্যান্সড লেভেল অর্জন করতে হবে।
এখন জেনটেক মডেলের মূল দিকগুলো দেখে নেওয়া যাক—
এটি কী—সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষার সমন্বিত পদ্ধতি : শিক্ষার্থীদের ভালো ভাষা জ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গে দুটি স্বীকৃত দক্ষতায় সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম সম্পূর্ণ করতে হবে, যার ফাউন্ডেশনটা তৈরি হবে মাধ্যমিক পর্যায় থেকে। দুটি প্রাসঙ্গিক বা ভিন্ন খাতের সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম যথাক্রমে প্রথম এবং দ্বিতীয় বছরে সম্পন্ন করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র অটোমোবাইল এবং ড্রাইভিংয়ের ওপর দুটি ট্রেড কোর্স সম্পন্ন করতে পারে, একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র বৈদ্যুতিক ওয়্যারিং এবং প্লাম্বিংয়ের দুটি ট্রেড কোর্স সম্পন্ন করতে পারে। একজন সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র গ্রাফিকস, অ্যানিমেশন ও ভিডিও এডিটিং এবং কার্পেনট্রিংয়ের ওপর দুটি কোর্স সম্পূর্ণ করতে পারে। তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষে শিক্ষার্থীরা দুটি ভাষায় যেমন ইংরেজি, আরবি, ফ্রেঞ্চ, জার্মান, জাপানিজ, চায়নিজ ইত্যাদিতে সার্টিফায়েড হতে পারেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যার বেসিক কোর্স সম্পন্ন হবে মাধ্যমিক পর্যায়ে। শিক্ষার্থীরা ভাষা ও ট্রেড কোর্সে সার্টিফিকেশনের জন্য অনেকগুলো কোর্সের পুল থেকে বেছে নিতে পারবে, তবে অর্জিত দক্ষতা স্নাতকপর্যায়ে অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে।
এটি কোথায় কাজ করে : প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত বা অধিভুক্ত পলিটেকনিক ও ভালো ইন্ডাস্ট্রি সংযোগ থাকা উচিত। মাধমিকপর্যায়ে নিকটস্থ কারিগরি ও ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সঙ্গে সরকারি এবং বেসরকারিপর্যায়ে পার্টনারশিপের মাধ্যমে কাজ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, অস্ট্রেলিয়ায় ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটিতে ভিক্টোরিয়া পলিটেকনিক আছে, আরএমআইটিতে আছে আরএমআইটি টেইফ, সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটিতে আছে সুইনবার্ন টেইফ এবং ফেডারেশন ইউনিভার্সিটিতে ফেডারেশন টেইফ আছে ইত্যাদি, যেখানে টেইফ অনেকটা বাংলাদেশের পলিটেকনিকের মতো কারিগরি এবং চলমান শিক্ষার প্রতিষ্ঠান। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার জন্য তাদের অধিভুক্ত কমিউনিটি কলেজ রয়েছে। এই পলিটেকনিক, টেইফ বা কমিউনিটি কলেজগুলো থেকে যে কেউ দক্ষতা উন্নয়নের জন্য যেকোনো সময় কোর্স করতে পারেন। হার্ভার্ড বা অক্সফোর্ডের মতো বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুমোদিত পলিটেকনিক নাও থাকতে পারে, তবে তাদের শক্তিশালী ইন্ডাস্ট্রি নেটওয়ার্ক রয়েছে। তাই স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার ভিত্তিতে চাকরির জন্য প্রস্তুত গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এ বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
এটি কীভাবে কাজ করে—ফ্লেক্সিবল ব্লক ও কর্মমুখী শিক্ষাক্রম প্রণয়নের মাধ্যমে : শিক্ষাক্রম ফ্লেক্সিবল, প্রয়োজনভিত্তিক এবং সময়োপযোগী হওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ব্যাচেলর ডিগ্রির তৃতীয় বর্ষ এবং মাস্টার্সের শুরু থেকে ফ্লেক্সিবল ব্লক মোড প্রবর্তন করা যেতে পারে, যেখানে শিক্ষার্থীরা আট সপ্তাহে (অনার্স) দুটি কোর্স বা আট সপ্তাহে (মাস্টার্স) একটি কোর্স করতে পারে। এ ধরনের ফ্লেক্সিবিলিটি শিক্ষার্থীদের অধ্যয়ন করার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ করতে সক্ষম করে—এমনটি উন্নত বিশ্বে বেশ প্রচলিত। এটি অভিজ্ঞতা অর্জন এবং স্নাতক শেষ করার পর কর্মক্ষেত্রে আরো ভালো করতে সাহায্য করে। আজকাল আপনি উন্নত বিশ্বে খুব বেশি বিশ্ববিদ্যালয় খুঁজে পাবেন না, যারা মাস্টার্স বাই রিসার্চ অফার করে। এর পরিবর্তে তারা মাস্টার্স বাই কোর্সওয়ার্ক এবং গবেষণা শুধু পিএইচডিতে করে। লাখ লাখ স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এই ফ্লেক্সিবল মাস্টার্স প্রোগ্রামে আকৃষ্ট হয়, যা মূলত চাকরির জন্য প্রস্তুত গ্র্যাজুয়েট তৈরি করে। ব্যাচেলর প্রোগ্রামের মতো এই মাস্টার্স প্রোগ্রামগুলো এখন তাদের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। একাডেমিক ব্যাংক অব ক্রেডিটস (এবিসি) স্কিমের অধীনে প্রাসঙ্গিক সার্টিফিকেশনপ্রাপ্ত হলে কিছু কোর্স মওকুফ করা যেতে পারে, উদাহরণস্বরূপ—সিসকো সার্টিফাইড নেটওয়ার্ক অ্যাসোসিয়েটের জন্য একটি মৌলিক কম্পিউটার নেটওয়ার্কিং কোর্স বা বেসিক ডেটাবেস কোর্সের জন্য ওরাকল সার্টিফিকেশন ইত্যাদি।
এটির অর্থায়ন কীভাবে হবে : অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা বা যুক্তরাষ্ট্রে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যাচেলর প্রোগ্রামের গড় টিউশন ফি বাংলাদেশি টাকায় ২-৩ কোটি, প্রকৌশল এবং আইটিতে ১.৫-২.০ কোটি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ১ কোটির কম নয়। মাস্টার্স প্রোগ্রাম ০.৫-১.০ কোটির মধ্যে। সাবজেক্ট এরিয়াবিষয়ক টিউশন ফির জন্য ব্যান্ড নির্ধারণ করা হয় সেখানে। দেশের প্রেক্ষাপটে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউশনাল র্যাংকিং ফ্রেমওয়ার্কের (এনআইআরএফ) আলোকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তিন-চার ক্যাটাগরিতে শ্রেণিবদ্ধ করে, তারপরে পাঁচ-সাতটি সাবজেক্ট ব্যান্ডের ওপর ভিত্তি করে সরকারি ভর্তুকি এবং পূর্ণ-ফির অপশনগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ ধরুন, বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য টিউশন ফি হলো ১৫ লাখ টাকা, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জন্য ১০ লাখ এবং অন্য স্নাতকদের জন্য ৫ লাখ। শিক্ষার্থীরা যথারীতি তাদের বর্তমান টিউশন ফি দেওয়া চালিয়ে যাবে এবং অবশিষ্ট পরিমাণ তাদের ইউনিক আইডি অ্যাকাউন্টে রেকর্ড করা থাকবে। স্নাতক শেষ করার পর যখন তারা চাকরি পাবে এবং তাদের আয় দেশের গড় বেতনের চেয়ে বেশি হবে, তখন ওই বাকি টিউশন ফি কিস্তিতে ফেরত দিতে হবে। এটা ঋণ নয়, দেশ ও প্রতিষ্ঠানের জন্য অবদান। সংগৃহীত অর্থ গবেষণা ও প্রকল্প, কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন, ইন্টার্নশিপ, উচ্চশিক্ষার সুযোগ, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংয়ে ব্যয় হবে। মাধ্যমিক ও উচমাধ্যমিক পর্যায়ে অবদান প্রকল্পের প্রয়োজন হবে না, সরকারি বরাদ্দে চলবে।
জেনটেক মডেলের সফল বাস্তবায়ন আগামী ১০ বছরে রেমিট্যান্সপ্রবাহ ৮-১০ গুণ বৃদ্ধি করতে পারে। ৫-১০ বছরের মধ্যে মডেলটি উচ্চশিক্ষার জন্যে পরিপক্ব হলে বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য আয় আসতে শুরু করবে। ততদিনে আমাদের অন্তত ক্যাটাগরি-১ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের উচ্চমানের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানের অবস্থানে থাকবে, বিশেষ করে এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় অনলাইন এবং ব্লেন্ডেড পদ্ধতিতে। আর নতুন পাবলিক এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, যাদের সীমিত আয় ও অবদান রয়েছে, তারা পার্টনারশিপে দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরি এবং অর্থনীতিতে ভালো অবদান রাখতে পারে। ২০৫০ সালে বাংলাদেশ একটি ভালো অবস্থানে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে; কিন্তু ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকলে তা কখনোই টেকসই হবে না। তাই নীতিনির্ধারকরা যদি জেনটেকের মতো একটি কার্যকর মডেল বিবেচনা করেন, তাহলে একদিকে আমাদের রেমিট্যান্স যেমন বাড়বে, অন্যদিকে অন্তত ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয় ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে পারবে। বিশ্বে ‘এডুকেশন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডিং করা তখন অসম্ভব হবে না।
লেখক : কারিগরি শিক্ষা, ডিজিটাল লার্নিং ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

