চব্বিশের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী জুলাই বিপ্লব ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব বাঁকবদল। দেড় দশকেরও বেশি সময়ের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পর রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছিল, তার দালিলিক ও আইনি রূপরেখা ছিল ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। এই সনদটি শুধু একটি রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর কর্মসূচি ছিল না, বরং এটি ছিল একটি নতুন সামাজিক চুক্তির (Social Contract) প্রতিফলন, যা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বৈরাচারমুক্ত করার এবং ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার শপথ নিয়ে গঠিত হয়েছিল।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের যে ধরনের ‘গড়িমসি’ বা দীর্ঘসূত্রতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা এক গভীর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে । নির্বাচিত সরকারের পক্ষ থেকে এই সনদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে প্রচলিত সংবিধানের গণ্ডিতে আটকে রাখার চেষ্টা বিপ্লবের মূল আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
২০২৪ সালের ৫ জুন থেকে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন দ্রুতই একটি গণবিপ্লবে রূপ নিয়েছিল। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মাধ্যমে যা চূড়ান্ত রূপ পায়। এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল জেনারেশন জি (Gen-Z), যারা শুধু সরকার পরিবর্তন নয়; বরং রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল সংস্কার চেয়েছিল। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার ও জুলাইয়ে গণহত্যাকারী সরকারের পতন হলে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয় । এই সরকারের প্রধান অঙ্গীকার ছিল তিনটি—বিচার, সংস্কার এবং নির্বাচন। সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এই সুপারিশগুলোর ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা শুরু হয়।
রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রায়ই ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’—এ দুটি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলা হয়, কিন্তু এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। জুলাই ঘোষণাপত্র হলো মূলত ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের একটি ঐতিহাসিক স্বীকৃতিমূলক দলিল, যার মাধ্যমে জুলাই বিপ্লবকে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, জুলাই জাতীয় সনদ হলো সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের একটি রূপরেখা, যা আগামী দিনের সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো কেমন হবে, তার দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং ২৫টি রাজনৈতিক দল আনুষ্ঠানিকভাবে এই সনদে স্বাক্ষর করে। এই সনদে ২৮টি সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি এবং ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়া।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সংবিধান, বিচার বিভাগ, নির্বাচনি ব্যবস্থা, পুলিশ, জনপ্রশাসন এবং দুর্নীতি দমন—এই ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রাথমিক সংস্কার কমিশন গঠন করে । পরে এর পরিধি বেড়ে ১১টি কমিশনে উন্নীত হয় । এই কমিশনগুলো দীর্ঘ সময় ধরে সাধারণ নাগরিক, বিশেষজ্ঞ এবং স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনার পর তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।
সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ (এনসিসি) গঠিত হয় । এই কমিশন ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে ৭২ দিনব্যাপী আলোচনার পর ১৬৬টি প্রস্তাব থেকে ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্য অর্জন করতে সক্ষম হয়। এই ঐক্যবদ্ধ প্রস্তাবনাগুলোই ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

জুলাই জাতীয় সনদের প্রধান প্রস্তাবনাগুলো
জুলাই সনদ মূলত একটি রূপান্তরমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার ব্লু-প্রিন্ট হিসেবে কাজ করে। এর প্রস্তাবনাগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো এককেন্দ্রিক ক্ষমতার উত্থান সম্ভব না হয়।
নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ
সনদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল প্রধানমন্ত্রীর একক ও অসীম ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরা। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ১০ বছরের বেশি (দুই মেয়াদের বেশি নয়) প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন থাকতে পারবেন না। একই সঙ্গে, যিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন, তিনি রাজনৈতিক দলের প্রধান হতে পারবেন না। এটি ক্ষমতার পৃথককরণ এবং দলের ভেতর গণতন্ত্রচর্চার এক নতুন পথ উন্মোচন করে।
সংসদীয় ও নির্বাচনি সংস্কার
সংসদকে অধিকতর প্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক করার জন্য জুলাই সনদে বিদ্যমান এককক্ষের সংসদের পরিবর্তে দ্বিকক্ষের সংসদ গঠনের প্রস্তাব করা হয়। উচ্চকক্ষটি ১০০ সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত হবে এবং এখানে পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হয়েছে। নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation) পদ্ধতি প্রবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রতিটি ভোটের প্রতিফলন সংসদে থাকে।
বিচার বিভাগ ও মৌলিক অধিকার
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বতন্ত্র ‘জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কমিশন’ (জেএসি) গঠনের প্রস্তাব করা হয়। এছাড়া, উচ্চ আদালতের বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে প্রতিটি বিভাগে হাইকোর্ট বেঞ্চ গঠনের কথা বলা হয়েছে। নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের পরিধি বাড়াতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যদিও রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমতের কারণে কিছু বিষয়ে অস্পষ্টতা থেকে গেছে।
জাতীয় পরিচয় ও ভাষার স্বীকৃতি
সংবিধানের ৬(২) অনুচ্ছেদ সংশোধনের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে ‘বাঙালি’র পরিবর্তে ‘বাংলাদেশি’ পরিচয় ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মূলত একটি জাতিগত পরিচয়ের পরিবর্তে নাগরিক (Civic) পরিচয়কে প্রাধান্য দেয়। ভাষার ক্ষেত্রে বাংলা রাষ্ট্রভাষা থাকলেও দেশের অন্যান্য নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
জুলাই বাস্তবায়ন আদেশ ও আইনি বিতর্ক
জুলাই সনদ শুধু একটি কাগুজে সমঝোতা না রাখার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করে। এই আদেশের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি একটি বিশেষ ক্ষমতা বলে সংস্কার প্রক্রিয়ার আইনি ভিত্তি স্থাপন করেন।
গণভোটের ম্যান্ডেট
বাস্তবায়ন আদেশের অন্যতম শর্ত ছিল ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে জুলাই সনদের ওপর একটি গণভোট অনুষ্ঠান। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত এই গণভোটে ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল তারা জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাবগুলো সমর্থন করেন কি না। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারী জনগণের প্রায় ৬৮ দশমিক ৮ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে এই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে রায় দিয়েছেন। এটি ছিল মূলত একটি বিপ্লব-পরবর্তী নতুন সংবিধান রচনার পক্ষে গণম্যান্ডেট।
বাস্তবায়ন আদেশের বৈধতা নিয়ে দ্বন্দ্ব
নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর এই বাস্তবায়ন আদেশের বৈধতা নিয়েই সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করেছে। সরকার দাবি করছে, বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির এমন আদেশ জারির কোনো ক্ষমতা নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে অভিযোগ করেছেন, এই আদেশটি একটি ‘প্রতারণার দলিল’ এবং এটি সংসদীয় সার্বভৌমত্বকে খর্ব করার একটি ব্যর্থ চেষ্টা ।

২০২৬-এর নির্বাচন এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক দৃশ্যপট
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ক্ষমতায় ফিরে আসে। এই বিজয় মূলত আওয়ামী লীগহীন একটি নির্বাচনি ময়দানে বিএনপির দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ক্ষমতা পুনরুদ্ধার হিসেবে দেখা হয়। তবে এই জয় একই সঙ্গে জুলাই সনদের ভাগ্যকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিএনপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করলেও তা করেছিল ‘অসন্তোষজনকভাবে’ বা ‘ডিস্যাপ্রুভিংলি’। দলটির নেতারা দাবি করছেন, তারা শুধু জনগণের ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন করবেন এবং সেই ম্যান্ডেট হলো তাদের নির্বাচনি ইশতেহার, জুলাই সনদ নয়। অথচ গণভোটের রায় অনুযায়ী জনগণ জুলাই সনদকেই তাদের ম্যান্ডেট হিসেবে বেছে নিয়েছিল। এই স্ববিরোধিতা থেকেই বাস্তবায়নে ‘গড়িমসি’ শুরু হয়েছে।
নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে সংসদে ও রাজপথে সোচ্চার রয়েছে। অন্যদিকে, ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (NCP) মাত্র ছয়টি আসনে জিতলেও তারা নৈতিকভাবে জুলাই সনদের অন্যতম রক্ষক হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করছে। তাদের মতে, বিএনপি পুরোনো ‘উইনার-টেকস-অল’ রাজনীতিতে ফিরে যেতে চাইছে, যা জুলাই বিপ্লবের চেতনার পরিপন্থী।
বাস্তবায়নে গড়িমসি ও সরকারের দায়
সরকারের পক্ষ থেকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনীহা শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং এটি একটি সুশৃঙ্খল আইনি কৌশলের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এই গড়িমসির প্রধান দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনে অস্বীকৃতি
জুলাই বাস্তবায়ন আদেশের ১০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা ছিল। এই পরিষদের কাজ ছিল ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করা। কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সদস্যরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন এবং সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকার করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, নির্বাচন কমিশন শুধু সংসদ নির্বাচনের জন্য ব্যালট দিয়েছিল, কোনো পরিষদের সদস্য হওয়ার জন্য নয়। এই আইনি মারপ্যাঁচে সংস্কার পরিষদ গঠন প্রক্রিয়াটি বর্তমানে হিমাগারে চলে গেছে।
আইনি ও বিচারিক জটিলতা তৈরি
সরকারপন্থি হিসেবে পরিচিত কয়েকজন আইনজীবীর মাধ্যমে জুলাই বাস্তবায়ন আদেশ এবং গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই রিটগুলো সরকারের ইন্ধনেই করা হয়েছে, যাতে আদালত থেকে একটি স্থগিতাদেশ নিয়ে সংস্কার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করা যায়। আইনমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, বিষয়টি বর্তমানে ‘সাব-জুডিস’ বা বিচারাধীন, তাই এ নিয়ে সংসদীয় পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন। এটি মূলত একটি সুপরিকল্পিত বিলম্ব কৌশল ।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আইনি জটিলতা। সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবীর করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, গণভোট অধ্যাদেশ এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ গ্রহণের বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেছেন।
আদালতের এই রুলে চার সপ্তাহের মধ্যে আইন সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জাতীয় সংসদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, নির্বাচন কমিশন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে জবাব দিতে বলা হয়েছে। এই রুল সংস্কার প্রক্রিয়াকে কার্যত স্থগিত অবস্থায় রেখেছে।
আইনবিদরা বলছেন, এই জটিলতার উৎস হলো জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিয়ে দ্বিধা। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়ার মতে, ‘বিদ্যমান সংবিধানের আলোকে চিন্তা করলে জুলাই সনদকে বোঝা সম্ভব নয়। কারণ, জুলাই বিপ্লবের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বে যে উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়েছিল, সংবিধানে তার কোনো উল্লেখ ছিল না।’
তিনি আরো বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, বিপ্লব কখনো সংবিধান মেনে হয় না; বরং সংবিধানের গণ্ডি ভেঙে বা বাইরে গিয়েই বিপ্লব ঘটে’ এই ‘সংবিধানের ঊর্ধ্বে জনগণের সার্বভৌম কর্তৃত্বের’ ভিত্তিতে সরকার গঠনের যুক্তি যেমন রয়েছে, তেমনি প্রচলিত সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষার দাবিও সমান জোরালো।
আইনবিদরা মনে করছেন, বর্তমান জটিলতা কাটানোর একমাত্র পথ হলো জুলাই সনদের বিশেষ আইনি প্রকৃতি বোঝা। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, ‘আমাদের বারবার মনে রাখতে হবে, এই গণভোট রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ এটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে নাগরিকদের সরাসরি অভিপ্রায় ব্যক্ত করার সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক সুযোগ।’
জুলাই সনদ ও গণভোট বাস্তবায়নের প্রশ্নে বিএনপি এখন যেভাবে সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে, তা ঐতিহাসিকভাবে সাংঘর্ষিক। কারণ, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানই দেশে প্রথম প্রচলিত সংবিধানের ঊর্ধ্বে গিয়ে গণভোটের প্রবর্তন করেছিলেন। তাছাড়া জনগণের এই সার্বভৌম ম্যান্ডেটের ফলে সরকার কিছু অনন্য ক্ষমতা লাভ করেছে। যার মূল লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র, গণপ্রজাতন্ত্র এবং নাগরিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র সংস্কারের দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সময়মতো এই সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে না পারলে দেশ এক ভয়াবহ শাসনতান্ত্রিক শূন্যতায় পড়তে পারে, যা প্রকারান্তরে বিপ্লবের অর্জনকেই ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার এবং জুলাই সনদের সংস্কার প্রস্তাবগুলোর মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। বিশেষ করে, দ্বিকক্ষের সংসদের গঠন পদ্ধতি এবং বিচারিক নিয়োগের স্বাধীনতার বিষয়ে বিএনপির নিজস্ব পরিকল্পনা সনদের তুলনায় অনেক বেশি দলীয় প্রভাবাধীন। সরকার এখন দাবি করছে, তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তারা নিজেদের মতো করে সংবিধান সংশোধন করবে, জুলাই সনদের বাধ্যবাধকতা মানতে তারা বাধ্য নয়।
৩১ মার্চ ও ১ এপ্রিল ২০২৬-এর সংসদ অধিবেশনে জুলাই সনদ নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয় । বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই সংসদটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আসেনি বরং এটি একটি বৈপ্লবিক ম্যান্ডেট নিয়ে গঠিত হয়েছে । এর জবাবে সরকার একটি ‘বিশেষ সংসদীয় কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব দেয়, যা মূলত ১৮০ দিনের বাধ্যবাধকতা থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ। বিরোধী দল শর্ত দিয়েছে, এই কমিটিতে সরকার ও বিরোধী দলের সমানসংখ্যক সদস্য থাকতে হবে, অন্যথায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার শুধু নিজেদের খেয়ালখুশিমতো পরিবর্তন আনবে এবং হয়েছেও তা-ই।
জুলাই সনদ ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের গতিপথ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘উইনার-টেকস-অল’ বা বিজয়ী পক্ষই সব ক্ষমতার মালিক—এই ধারাটি পরিবর্তনের শেষ সুযোগ ছিল জুলাই সনদ। কিন্তু বর্তমান সরকারের কার্যকলাপে মনে হচ্ছে তারা সেই পুরোনো ধারারই অনুসারী। জ্যেষ্ঠ আইনবিদ ড. শরীফ ভূঁইয়া সতর্ক করেছেন, যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হয়, তবে দেশ এক ভয়াবহ শাসনতান্ত্রিক শূন্যতায় পড়বে, যা প্রকারান্তরে ২০২৪-এর বিপ্লবের অর্জনকেই ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ব্যর্থতার সম্ভাব্য পরিণতি
যদি সরকার জুলাই সনদকে আইনি মারপ্যাঁচে আটকে রাখে বা এর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো বাদ দিয়ে শুধু নামকাওয়াস্তে কিছু সংশোধন আনে, তবে এর ফল হতে পারে সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘ মেয়াদে বেশ ক্ষতিকর।

১. বৈধতার সংকট : গণভোটে ৬৮ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ যে সনদের পক্ষে রায় দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন না করলে সরকারের নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে । ২. আবার গণআন্দোলন : তরুণ প্রজন্ম এবং জেনারেশন-জি যদি মনে করে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে, তবে তারা আবার রাজপথে নেমে আসতে পারে। ৩. কর্তৃত্ববাদের পুনরাবৃত্তি : ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এবং প্রধানমন্ত্রীর একক কর্তৃত্ব বজায় থাকলে ভবিষ্যতে আবার একই ধরনের স্বৈরাচারী ব্যবস্থা ফিরে আসার পথ উন্মুক্ত থাকবে। ৪. রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা : জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপির মতো দলগুলো যদি সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে থাকে, তবে দেশে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের এই গড়িমসি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় এক বিশাল অন্তরায়। এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
প্রথমত, সরকারকে জুলাই বাস্তবায়ন আদেশের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করতে হবে অথবা এমন একটি সর্বদলীয় কমিটি গঠন করতে হবে, যেখানে জুলাই সনদের ৮৪টি প্রস্তাবনার ওপর সুনির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজ করার বাধ্যবাধকতা থাকবে। দ্বিতীয়ত, গণভোটের রায়কে উপেক্ষা না করে সেই ম্যান্ডেটকে সংবিধানের মূল কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। তৃতীয়ত, বিচার বিভাগীয় ও নির্বাচনি সংস্কারগুলো দ্রুত সম্পন্ন করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের মানুষকে এক নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছিল। সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন শুধু একটি রাজনৈতিক দলের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। এটি ১৬ বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে জন্ম নেওয়া এক নতুন সামাজিক চুক্তির প্রতিফলন, যা রক্ষা করা নির্বাচিত সরকারের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য। সরকারের দায় হলো এই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে আর কোনো স্বৈরাচার মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের গড়িমসি শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি জুলাইয়ের বিপ্লবী চেতনা ও নতুন সামাজিক চুক্তির ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের রায় স্পষ্ট হলেও তার বাস্তবায়ন আটকে আছে আইনি জটিলতা ও রাজনৈতিক অনৈক্যের দোলাচলে।
আইনি বিশেষজ্ঞরা যেমন বলছেন, বিপ্লবের পরবর্তী সংস্কার প্রক্রিয়ায় শুধু সংবিধানের ফ্রেমওয়ার্কে বিচার করলে মূল চেতনা অধরাই থেকে যায়। অন্যদিকে সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষার দাবিও উপেক্ষার নয়।
জনগণের রায় ও প্রচলিত আইনের মধ্যে এই দ্বন্দ্বের মীমাংসা এখন সময়ের দাবি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা না হলে এবং সংস্কার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছ রূপরেখা না এলে জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ যেমন অনিশ্চিত, তেমনি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও ঝুঁকির মুখে পড়বে, যা বিপ্লবের অর্জনকেই প্রশ্নের সম্মুখীন করতে পারে।
লেখক : সহসভাপতি (ভিপি) , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

